Thursday, June 04, 2026

সেকশন

English
Dhaka Tribune

যেকারণে আফগানরা তাদের সন্তানদের বিক্রি করে দিচ্ছেন

আন্তর্জাতিক সংবাদ মাধ্যম বিবিসির এক বিশেষ প্রতিবেদনে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে

আপডেট : ২৯ মে ২০২৬, ০৩:১০ পিএম

আফগানিস্তানের ঘোর প্রদেশের রাজধানী চাঘচারানে প্রতিদিন ভোর হতেই ধুলোময় এক চত্বরে শত শত মানুষ কাজের আশায় জড়ো হন। কেউ কাজ দিলে সেদিন পরিবারের খাবার জুটবে, না হলে অনাহারেই কাটবে দিন। ভয়াবহ খাদ্যসংকট ও বেকারত্বের কারণে দেশটির বহু পরিবার এখন মানবিক বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে। এমন পরিস্থিতিতে অনেক অভিভাবক বাধ্য হয়ে সন্তান বিক্রির মতো কঠিন সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন।

চাঘচারানের বাসিন্দা ৪৫ বছর বয়সী জুমা খান জানান, গত ছয় সপ্তাহে মাত্র তিন দিন কাজ পেয়েছেন তিনি। প্রতিদিনের মজুরি ১৫০ থেকে ২০০ আফগানি, যা মার্কিন মুদ্রায় আড়াই থেকে তিন ডলারের কিছু বেশি।

তিনি বলেন, “আমার সন্তানেরা টানা তিন রাত না খেয়ে ঘুমিয়েছে। স্ত্রী কাঁদছিল, সন্তানেরাও কাঁদছিল। গমের আটা কেনার জন্য প্রতিবেশীর কাছে টাকা ধার চেয়েছিলাম। সব সময় ভয় হয়, না খেতে পেয়ে সন্তানরা মারা যায় কি না।”

জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে আফগানিস্তানে প্রতি চারজনের তিনজনই মৌলিক চাহিদা পূরণে অক্ষম। বেকারত্ব, স্বাস্থ্যসেবার সংকট এবং বৈদেশিক সহায়তা কমে যাওয়ায় পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে উঠেছে।

খাদ্যসংকটের তীব্রতায় বর্তমানে প্রায় ৪৭ লাখ মানুষ দুর্ভিক্ষের দ্বারপ্রান্তে রয়েছে, যা দেশটির মোট জনসংখ্যার ১০ শতাংশের বেশি।

চাঘচারানের আরেক বাসিন্দা রব্বানি বলেন, “একদিন ফোন করে জানানো হয়, আমার সন্তানেরা দুই দিন ধরে না খেয়ে আছে। তখন মনে হয়েছিল, নিজেকে মেরে ফেলি। পরে ভাবলাম, এতে পরিবারের কী উপকার হবে? তাই কাজ খুঁজতে এখানে আসি।”

স্থানীয় একটি বেকারিতে আগের দিনের বাসি রুটি বিতরণের সময় মানুষের হুড়োহুড়ির দৃশ্য এখন নিয়মিত। অনেকেই সামান্য খাবারের জন্য একে অপরের সঙ্গে লড়াই করছেন।

বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কয়েক ঘণ্টা অপেক্ষার পরও সেদিন মাত্র তিনজন শ্রমিক কাজ পেয়েছিলেন।

এদিকে ভয়াবহ দারিদ্র্যের কারণে অনেকে মেয়েশিশু বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন। সামাজিকভাবে ছেলেদের ভবিষ্যৎ উপার্জনকারী হিসেবে দেখা হয় এবং তালেবান সরকারের নারী শিক্ষা ও কর্মসংস্থানে বিধিনিষেধের ফলে মেয়েদের অবস্থান আরও দুর্বল হয়েছে।

ঘোর প্রদেশের বাসিন্দা আবদুল রশিদ আজিমি তাঁর সাত বছর বয়সী যমজ সন্তান রোকিয়া ও রোহিলাকে দেখিয়ে বলেন, “আমি আমার মেয়েদের বিক্রি করতেও রাজি। আমি দরিদ্র, ঋণগ্রস্ত ও অসহায়।”

তিনি আরও বলেন, “কাজ শেষে বাড়ি ফিরি ক্ষুধার্ত, তৃষ্ণার্ত ও দিশাহারা অবস্থায়। সন্তানেরা এসে বলে, ‘বাবা, আমাদের কিছু রুটি দাও।’ কিন্তু আমি কী দেব?”

আজিমি জানান, একটি মেয়ে বিক্রি করতে পারলে অন্তত চার বছর পরিবারের অন্য সদস্যদের খাবার জোগানো সম্ভব হবে।

তার স্ত্রী কায়হান বলেন, “আমাদের খাবার বলতে শুধু রুটি আর গরম পানি। চা পর্যন্ত জোটে না।”

পরিবারটির দুই কিশোর ছেলে শহরে জুতা পালিশ করে এবং আরেক ছেলে আবর্জনা কুড়িয়ে আনে। সেই আবর্জনাই জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করেন কায়হান।

আরেক ব্যক্তি সাইদ আহমদ জানান, মেয়ের চিকিৎসার খরচ জোগাতে তিনি তার পাঁচ বছর বয়সী মেয়ে শাইকাকে আত্মীয়ের কাছে বিক্রি করতে বাধ্য হয়েছেন। শাইকার অ্যাপেন্ডিসাইটিস ও লিভারে সিস্ট ধরা পড়ার পর অস্ত্রোপচারের অর্থ জোগাড় করতে এ সিদ্ধান্ত নেন তিনি।

সাইদ বলেন, “আমার কাছে চিকিৎসার টাকা ছিল না। তাই মেয়েকে বিক্রি করেছি। যদি অপারেশন না করাতাম, সে হয়তো মারা যেত।”

তিনি জানান, শাইকার জন্য দুই লাখ আফগানিতে চুক্তি হয়েছে। তবে পুরো টাকা একসঙ্গে নেননি। পরবর্তী পাঁচ বছরে ধাপে ধাপে টাকা দেওয়া হবে এবং তখন মেয়েটিকে ওই আত্মীয়ের বাড়িতে পাঠিয়ে বিয়ে দেওয়া হবে।

সাইদ বলেন, “এত অল্প বয়সে মেয়েকে বিয়ে দেওয়া উদ্বেগের বিষয়। কিন্তু অন্তত সে বেঁচে থাকবে, এই ভেবেই সিদ্ধান্ত নিয়েছি।”

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মাত্র দুই বছর আগেও আফগান পরিবারগুলো খাদ্যসহায়তা পেত। গমের আটা, রান্নার তেল, ডাল ও শিশুদের পুষ্টিকর খাদ্য সরবরাহ করা হতো। কিন্তু আন্তর্জাতিক সহায়তা কমে যাওয়ায় সেই সহায়তার বড় অংশ এখন বন্ধ হয়ে গেছে।

   

About

Popular Links

x