বর্তমান তালেবান শাসনে আফগান নারীদের চরম অবমাননাকর ও সুরক্ষাহীন পরিস্থিতির চিত্র তুলে ধরেছেন আফগানিস্তানের সংসদের প্রথম নারী ডেপুটি স্পিকার ও অধিকারকর্মী ফাওজিয়া কুফি।
বুধবার (৩ জুন) ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ানে - এ তার তার একটি মতামত ছাপা হয়েছে। এখানে আইনি ও সামাজিক বৈষম্যের তথ্যপ্রমাণ দিয়ে তিনি দাবি করেন, আফগানিস্তানে তালেবান শাসনের আওতায় নারীরা পাখির চেয়েও কম সুরক্ষা পাচ্ছেন।
তালেবানের নতুন দণ্ডবিধির দুটি ধারা বিশ্লেষণ করে এই চরম আইনি বৈষম্য দেখান ফাওজিয়া কুফি। আইন অনুযায়ী, ৩২ নম্বর ধারায় কোনো স্বামী যদি স্ত্রীকে মারধর করে হাড় ভেঙে ফেলেন বা শরীরে ক্ষত তৈরি করেন এবং স্ত্রী তা আদালতে প্রমাণ করতে পারলেও স্বামীর শাস্তি হবে মাত্র ১৫ দিনের কারাদণ্ড। অথচ ৭০ নম্বর ধারায় স্পষ্ট বলা হয়েছে, কোনো ব্যক্তি যদি একটি পাখি বা অন্য কোনো প্রাণীর ক্ষতি করে, তবে তার সাজা হতে পারে পাঁচ মাস পর্যন্ত কারাদণ্ড। এই আইনি বৈষম্যই প্রমাণ করে সেখানে নারীর চেয়ে পাখির মূল্য বেশি।
নতুন ফৌজদারি বিধিমালায় স্বামী বা পুরুষ অভিভাবককে নারীর ওপর অবাধ নিয়ন্ত্রণ ও শাস্তি দেওয়ার ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে, যা নারীকে কার্যত একটি ‘সম্পত্তি’র স্তরে নামিয়ে এনে প্রাতিষ্ঠানিক দাসত্বের রূপ দিয়েছে। এর পাশাপাশি বিবাহ বিচ্ছেদসংক্রান্ত নতুন বিধির বিভিন্ন ধারার মাধ্যমে দেশটিতে বাল্যবিবাহকে আইনি বৈধতা দেওয়া হয়েছে, যার জন্য শাসকগোষ্ঠীর কোনো জবাবদিহিতা নেই।
তালেবান ক্ষমতা দখলের পর গত পাঁচ বছরে আফগান নারীদের মৌলিক অধিকারগুলো পুরোপুরি কেড়ে নেওয়া হয়েছে। ষষ্ঠ শ্রেণির পর মেয়েদের সব ধরনের আনুষ্ঠানিক শিক্ষা নিষিদ্ধ করে শুধু ধর্মীয় মাদ্রাসায় যাওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়েছে। এছাড়া নারীদের উচ্চ চিকিৎসাশিক্ষায় নিষেধাজ্ঞা দেওয়ায় দেশটিতে মাতৃ ও শিশুমৃত্যুর হার আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। কর্মক্ষেত্র থেকে নারীদের পুরোপুরি বাদ দেওয়ার ফলে বহু নারী বর্তমানে বেঁচে থাকার তাগিদে ভিক্ষাবৃত্তিতে বাধ্য হচ্ছেন।
দেশটিতে বর্তমানে কোনো নারী বিচারক বা প্রসিকিউটর নেই এবং নারীদের সুরক্ষা দেওয়ার মতো আগের আইনগুলোও বাতিল করা হয়েছে। চলতি বছরের ৪ জানুয়ারি তালেবান প্রধানের সই করা নতুন ফৌজদারি আদালত-সংক্রান্ত বিধিমালা নারীদের স্বাধীনতার কফিনে শেষ পেরেক ঠুকে দিয়েছে। এই বিধিমালায় সমাজকে চার শ্রেণিতে ভাগ করে শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে, যেখানে নারীদের আইনি সুরক্ষার কোনো সুযোগ রাখা হয়নি।
ফাওজিয়া কুফি আফগানিস্তানের এই সামগ্রিক পরিস্থিতিকে ‘জেন্ডার অ্যাপারথাইড’ বা লিঙ্গভিত্তিক বর্ণবাদ আখ্যা দিয়েছেন এবং একে আন্তর্জাতিক অপরাধ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার দাবি জানান। একইসঙ্গে আফগান নারীদের অধিকারের প্রশ্নে আপস করে ইউরোপীয় ইউনিয়ন কর্তৃক তালেবান প্রতিনিধিদের ব্রাসেলসে আমন্ত্রণ জানানোর তীব্র সমালোচনা করে একে আফগান নারী ও মেয়েদের আন্দোলনের প্রতি একটি গভীর ‘বিশ্বাসঘাতকতা’ ও চপেটাঘাত বলে উল্লেখ করেন তিনি।



বাল্যবিবাহকে আইনি স্বীকৃতি দিতে যাচ্ছে আফগান সরকার