সাইবার হামলার ঝুঁকি এড়াতে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সরকারি সংস্থা ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান তাদের ওয়েবসাইট সাময়িকভাবে বন্ধ রেখেছে। ওয়েবসাইট তৈরি ও পরিচালনায় বহুল ব্যবহৃত প্রোগ্রামিং ভাষা পিএইচপিতে দুটি গুরুতর নিরাপত্তা ত্রুটি শনাক্ত হওয়ার পর এ সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন, এসব ত্রুটি কাজে লাগিয়ে সাইবার হামলাকারীরা পাসওয়ার্ড ছাড়াই সার্ভারে প্রবেশ করে এর নিয়ন্ত্রণ নিতে পারে।
বুধবার (২১ অক্টোবর) পিএইচপি প্রকল্পের ডেভেলপাররা ত্রুটি দুটি সংশোধনে নিরাপত্তা আপডেট প্রকাশ করেছেন। ব্যবহারকারীদের দ্রুত এই আপডেট ইনস্টল করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। পিএইচপি ব্যবহার করে বহু জনপ্রিয় ওয়েবসাইট ও ওয়েবডিজাইন প্ল্যাটফর্ম পরিচালিত হয়। ফলে এ ত্রুটির কারণে অনলাইন মার্কেটপ্লেস, সংবাদমাধ্যম ও সরকারি সেবাসহ বিভিন্ন ধরনের ওয়েবসাইট ঝুঁকিতে পড়তে পারে।
সাইবার নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠান উইজও ত্রুটি দুটি শনাক্ত করেছে। প্রতিষ্ঠানটির হিসাবে, বিশ্বের প্রায় ৭০% ওয়েবসাইটে পিএইচপি ব্যবহৃত হয়। উইজের ভাষ্য, পিএইচপিতে শনাক্ত হওয়া সবচেয়ে গুরুতর নিরাপত্তা ত্রুটিগুলোর অন্যতম এটি। এমনকি সফটওয়্যারের ইতিহাসেও একে অন্যতম বড় দুর্বলতা হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তা সংস্থা (এনএসএ) সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে দ্রুত নিরাপত্তা আপডেট ইনস্টল করার পরামর্শ দিয়েছে। অবিলম্বে আপডেট করা সম্ভব না হলে ঝুঁকিপূর্ণ সিস্টেমের ইন্টারনেট সংযোগ বিচ্ছিন্ন রাখার সুপারিশ করেছে সংস্থাটি।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক বিবৃতিতে এনএসএ জানিয়েছে, এসব ত্রুটি কাজে লাগিয়ে হামলাকারীরা সরাসরি সার্ভারের ফাইল ও ডেটাবেজে প্রবেশ করতে পারে। এমনকি কোনো পাসওয়ার্ড ছাড়াই সার্ভারের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার সুযোগও তৈরি হতে পারে।
পিএইচপি ফাউন্ডেশনের নিরাপত্তা প্রকৌশলী ভলকার ডুশ ওয়াল স্ট্রিট জার্নালকে বলেন, গত এক দশকের বেশি সময়ের মধ্যে পিএইচপি এবারই সবচেয়ে গুরুতর নিরাপত্তা সমস্যার মুখে পড়েছে। তিনি এ ঘটনার সঙ্গে ২০১৪ সালে আলোচিত ‘হার্টব্লিড’ নিরাপত্তা ত্রুটির তুলনা করেছেন। ওই সময়ও বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন সফটওয়্যার দ্রুত আপডেট করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল।
সাইবার নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠান ক্যালিফ গত আগস্টে ওপেনএআইয়ের তৈরি ‘জিপিটি-৫.৬ সল’ মডেল ব্যবহার করে ত্রুটি দুটি শনাক্ত করে। ওপেনএআইয়ের অর্থায়নে পিএইচপির কোড পর্যালোচনার সময় প্রতিষ্ঠানটি এসব দুর্বলতা খুঁজে পায়।
গুগলের মালিকানাধীন সাইবার নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠান উইজ জানিয়েছে, কয়েক সপ্তাহ পর তারাও নিজস্ব উদ্যোগে ত্রুটি দুটি শনাক্ত করে। এ কাজে তারা গুগলের ‘জেমিনি ৪ আর্গন’ ও ‘জিপিটি-৫.৬ সল’ মডেলের সহায়তা নিয়েছিল।
ওপেনএআই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে জানিয়েছে, তারা এ ঘটনাকে সাম্প্রতিক সময়ের সবচেয়ে বড় নিরাপত্তা ত্রুটিগুলোর অন্যতম হিসেবে বিবেচনা করছে। প্রতিষ্ঠানটির ভাষ্য, এর মধ্য দিয়ে প্রযুক্তির ক্ষেত্রে নতুন একটি ধাপ উন্মোচিত হয়েছে। এখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এমন বড় নিরাপত্তা ত্রুটিও শনাক্ত করতে পারছে, যা পুরো ইন্টারনেটকে প্রভাবিত করতে পারে।
ত্রুটি সংশোধনের জন্য বুধবার পিএইচপি প্রকল্পের ডেভেলপাররা নিরাপত্তা আপডেট প্রকাশ করেন। পিএইচপি ডেভেলপারদের অর্থায়নকারী প্রতিষ্ঠান পিএইচপি ফাউন্ডেশন এক ব্লগ পোস্টে বলেছে, “আপনারা পিএইচপি ব্যবহার করলে এখনই আপডেট করা জরুরি।”
এদিকে, ফ্রান্সের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, দেশটির জাতীয় সাইবার নিরাপত্তা সংস্থার অনুরোধে বুধবার বিকেল থেকে স্থানীয় প্রশাসনের ওয়েবসাইটগুলো বন্ধ রাখা হয়েছে। বন্ধ রাখা ওয়েবসাইটের মধ্যে প্যারিস পুলিশের ওয়েবসাইটও রয়েছে।
নেদারল্যান্ডসের জাতীয় সম্প্রচারমাধ্যম এনওএস জানিয়েছে, সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে দেশটির ডিজিটাল পরিচয় যাচাই সেবা ‘ডিজিডি’, প্রতিনিধি পরিষদের ওয়েবসাইট এবং জাতীয় সাইবার নিরাপত্তা কেন্দ্রের ওয়েবসাইট অফলাইনে রাখা হয়েছে।
বেলজিয়ামের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও সতর্কতার অংশ হিসেবে সাময়িকভাবে তাদের ওয়েবসাইট বন্ধ রাখার কথা এক্সে জানিয়েছে। তবে দেশটির জাতীয় সাইবার নিরাপত্তা কেন্দ্র জানিয়েছে, তখন পর্যন্ত বেলজিয়ামের কোনো ওয়েবসাইটে হামলার তথ্য নথিভুক্ত হয়নি।
অস্ট্রেলিয়ার জাতীয় সম্প্রচারমাধ্যম এবিসি জানিয়েছে, পিএইচপির ত্রুটিতে ঝুঁকির মুখে পড়া ওয়েবসাইটগুলোর মধ্যে দেশটির সাইবার নিরাপত্তা সংস্থা অস্ট্রেলিয়ান সিগন্যালস ডিরেক্টরেটের নিজস্ব ওয়েবসাইট ‘সাইবার ডট গভ ডট এইউ’ রয়েছে।



