Saturday, May 25, 2024

সেকশন

English
Dhaka Tribune

রাম মন্দিরের উদ্বোধন ভারতের রাজনীতিতে কতটা প্রভাব ফেলবে?

রাম মন্দিরে 'প্রাণ প্রতিষ্ঠা' অনুষ্ঠানে ফোকাসে ছিলেন শুধুই মোদি

আপডেট : ২৪ জানুয়ারি ২০২৪, ০৬:৫৪ পিএম

ভারতের উত্তরপ্রদেশের অযোধ্যায় হিন্দু সম্প্রদায়ের বহুল প্রতীক্ষিত রাম মন্দিরের দরজা খুলেছে। সোমবার (২২ জানুয়ারি) জমকালো এক অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে এই মন্দিরের উদ্বোধন করেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি।

যে স্থানটিতে মন্দিরটি নির্মাণ করা হয়েছে সেখানে রামের জন্ম হয়েছিল বলে হিন্দু ধর্মাবলম্বী লাখ লাখ মানুষ বিশ্বাস করে।

এক সময় এই স্থানটিতে একটি মসজিদ ছিল। ১৬ শতকে নির্মিত মসজিদটির নাম ছিল বাবরি মসজিদ। ১৯৯২ সালে কট্টরপন্থি হিন্দু জনতা মসজিদটি গুড়িয়ে দেওয়ার পর সৃষ্ট দাঙ্গায় প্রায় ২০০০ মানুষ নিহত হয়েছিল। রাম যেখানে জন্মেছিলেন ঠিক সেই জায়গায় এই হিন্দু দেবতার একটি মন্দিরের ধ্বংসাবশেষের ওপরে মুসলিম “আক্রমণকারীরা” মসজিটটি নির্মাণ করেছিল বলে দাবি তাদের।

এই মন্দির নির্মাণ মোদীর হিন্দু জাতীয়তাবাদী ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) একটি কেন্দ্রীয় প্রতিশ্রুতি। ৩৫ বছরের পুরনো এই বিতর্কিত রাজনৈতিক ইস্যুতে ভর করেই বিজেপি প্রাধান্য বিস্তার করেছে ও ক্ষমতায় এসেছে, জানিয়েছে রয়টার্স।

কিন্তু মন্দির উদ্বোধনের এই বিশাল আয়োজন থেকে নিজেদের দূরে সরিয়ে রেখেছেন ভারতের কিছু হিন্দু ধর্মগুরু ও অধিকাংশ বিরোধীদল। রাজনৈতিক লাভের জন্য মোদী এই মন্দির নির্মাণ ও এর উদ্বোধনকে ব্যবহার করছেন বলে মত তাদের।

অনেক আগে থেকেই ভারতের রাজনৈতিক মহলে আলোচনা ছিল যে, মন্দিরটির উদ্বোধনের দিন এমনভাবে নির্ধারণ করা হবে, যা থেকে আসন্ন লোকসভা নির্বাচনে রাজনৈতিকভাবে লাভবান হতে পারে ক্ষমতাসীন দল বিজেপি।

যুক্তরাজ্যভিত্তিক সংবাদমাধ্যম বিবিসি বাংলা এক প্রতিবদেনে জানিয়েছে, অযোধ্যায় রাম মন্দিরে“প্রাণ প্রতিষ্ঠা” অনুষ্ঠানের পরিকল্পনাও করা হয়েছিল এমনভাবে যাতে নরন্দ্রে মোদির একার ওপরেই সম্পূর্ণ ফোকাসটা থাকে।

অযোধ্যায় ওই অনুষ্ঠানের সংবাদ সংগ্রহে যাওয়া সাংবাদিকদের বরাত দিয়ে বিবিসি বলছে, মন্দিরের উদ্বোধন উপলক্ষে শহর মুড়ে ফেলা হয়েছিল রামচন্দ্রের কাটআউট দিয়ে। তবে সংখ্যায় গুণলে তার প্রায় সমসংখ্যক কাট আউট লাগানো হয়েছিলে নরেন্দ্র মোদির।

অনুষ্ঠানে রাষ্ট্রপতি, উপরাষ্ট্রপতি বা সরকারের বর্ষীয়ান নেতা-নেত্রী, দলের প্রেসিডেন্ট উপস্থিত থাকলেও মোদির ওপর থেকে ফোকাস সামান্যও সরে না যায়, তাই মোদি একাই করেছেন মূল আনুষ্ঠানিকতার কাজ।

উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে দেওয়া ভাষণে মোদি সরাসরি ভোটের কথা না বললেও গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক বার্তা দিয়েছেন। আর এসব মিলিয়েই বিশ্লেষকরা বলছেন ভোটের আগে রাজনৈতিক লাভ যে ঘরে তুলতেই এই অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছিল তাতে কোনো সন্দেহই নেই।

রাম-রথ থেকে রাম মন্দির

গত শতাব্দীর আটের দশকে বিজেপি গঠিত হওয়ার পর থেকেই দলটি তাদের এজেণ্ডায় অযোধ্যায় রামমন্দির গড়ার প্রতিশ্রুতি রেখেছে। তবে বিষয়টি নিয়ে তারা সক্রিয় হয় ১৯৮৯ সালের পর থেকে। লাল কৃষ্ণ আদভানির নেতৃত্বে রথযাত্রা শুরু হয় ১৯৯০ সালে। বিশ্ব হিন্দু পরিষদ অবশ্য আরও কিছুদিন আগে থেকেই রাম মন্দির নিয়ে সরব হচ্ছিল।

দীর্ঘ ৩৪ বছর ধরে যে রাজনৈতিক দলটি এই ইস্যুতে সরব হয়ে থেকেছে, শেষমেশ যখন তা অর্জন করা গেল, তা থেকে রাজনৈতিক দল হিসেবে লাভ যদি ঘরে আসে, তাতে সমস্যার কিছু দেখছেন না বিজেপি নেতারা।

ভারতীয় সাংবাদিক অমল সরকার বিবিসিকে বাংলাকে বলেন, "রাম মন্দির ইস্যু থেকে বিজেপি তো রাজনৈতিকভাবে লাভবান হবেই। তাদের যে মূল প্রতিশ্রুতিগুলো ছিল, কাশ্মীর থেকে ৩৭০ ধারা বিলোপ, তিন তালাক প্রথার বিলোপ, রাম মন্দির নির্মাণ আর অভিন্ন দেওয়ানি বিধি নিয়ে আসা - এর মধ্যে প্রায় সবগুলোই তো তারা পূরণ করে দিল। তাই তাদের রাজনীতিতে এগুলোকে তো তারা ব্যবহার করবে।"

বিজেপি নেতা অধ্যাপক বিমল শঙ্কর নন্দ বলেন, "যে আন্দোলনের পুরোভাগে লাল কৃষ্ণ আদভানি থেকেছেন, বিজেপির সব স্তরের নেতারা থেকেছেন, সেটা এত দিনে অর্জন করা গেছে। আমরা সেই আন্দোলন কিন্তু রাজনৈতিক উদ্দেশ্য নিয়ে করিনি। যে মন্দির প্রতিষ্ঠার আবেগ ছিল মানুষের মধ্যে, আমরাও কোটি কোটি মানুষের সেই আবেগকে পূর্ণ মর্যাদা দিতে এবং ভারতের অস্মিতাকে মর্যাদা দিতে এটা করেছি।"

ভোট ধরে রাখতে মরিয়া বিজেপি

অধ্যাপক বিমল শঙ্কর নন্দ বলেন, "এ থেকে যদি আমাদের রাজনৈতিক সুবিধা হয়, হয়ে যেতেই পারে, তাহলে আমাদের তো কিছু করার নেই।”

রাজনৈতিক বিশ্লেষক শুভাশিস মৈত্র বিবিসি বাংলাকে বলেন, , "রাম মন্দির নিয়ে মানুষের আবেগ যে আছে, বিশেষত হিন্দি বলয়ে সেটা ঘটনা। একাধিক সমীক্ষায় এটা উঠে এসেছে যে এমন বহু মানুষও রাম মন্দির চেয়েছেন যারা বিজেপিকে ভোটও দেন না। তাই রাম মন্দিরের আবেগকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে বিজেপি যে কাজে লাগাবে, তা খুব আশ্চর্যের কিছু নয়। হিন্দি বলয়ে যে অবস্থা এখন বিজেপির ভোট শেয়ারের, তাতে সেই ভোট ধরে রাখতে হবে বিজেপিকে। কারণ দক্ষিণ ভারতে কিন্তু বিজেপির অবস্থা কিছুটা নড়বড়ে।"

তিনি আরও বলেন, "হিন্দি বলয়ের নানা রাজ্যে আবার বিরোধী দলগুলোও কিন্তু কিছুটা শক্তিশালী। তাই লোকসভা নির্বাচনে জিততে হিন্দি বলয়ের ভোট বাড়াতে না পারুক, ধরে রাখা বিজেপির জন্য জরুরি। তাই ওই অঞ্চলের মানুষের আবেগকে তারা কাজে লাগাচ্ছে।”

‘নরম হিন্দুত্বের’ পথে কংগ্রেস

যেদিন প্রধানমন্ত্রী অযোধ্যায় রামচন্দ্রের মূর্তিতে প্রাণ প্রতিষ্ঠা করছেন, সেখানে হাজির ছিলেন না বিরোধী দলগুলির কোনো নেতা-নেত্রী। তবে রাম মন্দির এবং তাকে কেন্দ্র করে হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের যে আবেগ রয়েছে, তা বোঝেন তারা।

তাই অযোধ্যায় না গেলেও মধ্য প্রদেশ কংগ্রেস সদর দপ্তরে হোর্ডিং দিয়ে মনে করিয়ে দেওয়ার চেষ্টা হয় যে রাজীব গান্ধীর আমলেই অযোধ্যায় বাবরি মসজিদের তালা খুলে দেওয়া হয়েছিল।

আবার হিমাচল প্রদেশের কংগ্রেস সরকার অন্য সব বিজেপি শাসিত রাজ্যের মতোই ২২শে জানুয়ারি আধা দিনের সরকারি ছুটি ঘোষণা করেছিল। এমনকি রাহুল গান্ধী আসামে এক মন্দিরে গিয়ে পূজা দেওয়ার চেষ্টা করেছেন।

কংগ্রেস নেতৃত্ব অবশ্য বলছে যে তারা কখনই তাদের ধর্মনিরপেক্ষতার নীতির সঙ্গে আপোষ করেন নি।

প্রাক্তন সংসদ সদস্য ও কংগ্রেস নেতা প্রদীপ ভট্টাচার্য বিবিসি বাংলাকে বলেন, "কংগ্রেস কখনোই নেতা বা সদস্যদের বলেনি যে অযোধ্যায় যেও না। আমরা সবাই তো বিভিন্ন পূজাতে অংশ নিই ব্যক্তিগতভাবে। কিন্তু আমরা সেটাকে রাজনীতির সঙ্গে মেশাই না। এটাই কংগ্রেসের নীতি, এটাই কংগ্রেসের চরিত্র। এর সঙ্গে কখনোই আপোষ করি না আমরা। উল্টোদিকে বিজেপি কিন্তু ঠিক সেটাই করছে।"

কংগ্রেস 'খুব দেরি করে ফেলেছে'

তবে কংগ্রেস নেতাদের মন্দিরে মন্দিরে যাওয়া, ঘটা করে পূজা করা, হিমাচল প্রদেশে ২২ জানুয়ারি ছুটি দেওয়া বা কমল নাথের মতো বর্ষীয়ান কংগ্রেস নেতার বড় করে হনুমান পুজো করা এসব নিয়ে দলের সাধারণ সদস্যদের মধ্যে বিভ্রান্তিও যে ছড়াচ্ছে, সেটাও স্বীকার করছে কংগ্রেসেরই একাংশ।

দলটির অন্যতম মুখপাত্র কৌস্তভ বাগচি বলেন, "ঠিকই এসব নিয়ে সাধারণ কর্মী আর জনগণ তো কিছুটা বিভ্রান্তই। একদিকে নানা মন্দিরে পুজো দেওয়ার জন্য যাওয়া হবে, কংগ্রেস সরকার ২২ তারিখ ছুটি দেবে আবার বিজেপির বিরোধিতা করব - এরকমটা তো হওয়া উচিত ছিল না।"

বিজেপিও কংগ্রেস নেতাদের একাংশের এই কথিত “নরম হিন্দুত্ব” নীতি নিয়ে কটাক্ষ করতে ছাড়ছে না।

এ বিষয়ে অধ্যাপক বিমল শঙ্কর নন্দ বলেন, "এখন ওরা এসব করছে - রাহুল গান্ধী পৈতে ধারণ করে মন্দিরে চলে যাচ্ছেন, পুজো দিচ্ছেন, অন্যান্য নেতারাও নানা পুজো অর্চনার আয়োজন করছেন। তবে খুব দেরি করে ফেলেছে ওরা। এখন এসব করে হিন্দু ভোট নিয়ে আর কিছুই করতে পারবে না ওরা।"

আক্ষরিক অর্থে পশ্চিমবঙ্গ ছাড়া অন্য কোনো রাজ্যেই রাস্তায় নেমে কোনো প্রতিবাদ করেননি বিরোধী দলীয় নেতা নেত্রীরা।

পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জী এক সর্বধর্ম পদযাত্রা করেছেন, যাত্রাপথে মন্দির, মসজিদ, গির্জা আর গুরদোয়ারায় গেছেন সব ধর্মের প্রতি সম্মান জানাতে।

About

Popular Links