বেতন শব্দটি শুনলেই আমার মনে একধরনের নিশ্চয়তার অনুভূতি আসে। মাসের নির্দিষ্ট দিনে ব্যাংক হিসাবে টাকা জমা হবে, বাসাভাড়া থেকে শুরু করে বিভিন্ন বিল ও দৈনন্দিন খরচ মেটানো যাবে এই নিশ্চয়তাটুকু শুধু আমার নয়, অসংখ্য চাকরিজীবী মানুষের জীবনের বড় অবলম্বন। কিন্তু কখনো কখনো এই নিশ্চয়তাই ধীরে ধীরে একধরনের নেশায় পরিণত হয়। তখন বেতন শুধু জীবিকা থাকে না; হয়ে ওঠে সিদ্ধান্ত, সাহস এবং স্বপ্নের নিয়ন্ত্রক।
ওয়ারেন বাফেট নামে একজন বিশ্ববিখ্যাত মার্কিন বিনিয়োগকারী, ব্যবসায়ী ও সমাজসেবী, তার বহুল প্রচলিত একটি উক্তি আছে “ঘুমের মধ্যেও আয় করার কোনো উপায় তৈরি করতে না পারলে সারাজীবন কাজ করেই যেতে হবে।”
কথাটির তাৎপর্য আমার কাছে গভীর। এর অর্থ এই নয় যে চাকরি খারাপ কিংবা বেতননির্ভর জীবন অসম্মানের। বরং প্রশ্ন হলো আমাদের আয়ের একমাত্র উৎস যদি মাসিক বেতন হয়, তাহলে একসময় সেই বেতনের ওপর নির্ভরতাই আমাদের স্বাধীন সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতাকে সংকুচিত করে দিতে পারে।
ছাত্রজীবন থেকেই লেখালেখির মাধ্যমে সম্মানী পাওয়া শুরু করি। একপর্যায়ে মাসিক ৮ হাজার টাকা বেতনে একটি মিডিয়ায় চাকরি করার সুযোগ হয়। এরপর একটু বেশি বেতনের অফার পেয়ে একের পর এক চাকুরি পরিবর্তন করা শুরু করি। যখন যে পরিমাণ বেতন পেতাম আমার লাইফস্টাইলকেও সেভাবেই মানিয়ে নিতে শুরু করি। মজার বিষয় হলো মাসিক বেতনে চাকরি করে নিজের জন্য সেভিংস তো দূরের কথা মাস শেষ না হতেই ঋণ কিংবা অভাব বা টাকার চাহিদা লেগেই থাকতো। এখন ডলারে বেতন পেয়েও আমার কাছে একই মনে হয়। সঞ্চয় শব্দটার সাথে আর পরিচিত হতে পারলাম না।
এই মাসিক বেতনের অভিজ্ঞতা থেকে যদি বলি, আমাদের আয়ের একমাত্র উৎস যদি মাসিক বেতন হয়, তাহলে একসময় সেই বেতনের ওপর নির্ভরতাই আমাদের স্বাধীন সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতাকে সংকুচিত করে দিতে পারে।
আমার বাবা ব্যবসা করতেন। পরিবারের মধ্যে যারা বাবার ব্যবসায়িক মানসিকতা অনুসরণ করেছে, তারা অনেকটাই বেতননির্ভরতার বৃত্তের বাইরে যেতে পেরেছে। তাদের পথ দেখে আমি বুঝেছি, অর্থনৈতিক স্বাধীনতা শুধু বেশি টাকা উপার্জনের বিষয় নয়; নিজের সিদ্ধান্ত নিজে নেওয়ার সক্ষমতাও এর একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
পরিবারের বাইরে বন্ধু-বান্ধব-শুভানুধ্যায়ী কিংবা আত্মীয়-স্বজনদের উদাহরণ হিসেবে যদি বলি যারা ব্যবসা কিংবা উদ্যোক্তা না হয়ে মাসিক বেতনে চাকরি করে অর্থাৎ বেতনের বৃত্ত থেকে বের হতে পারেননি তারা এখনও হতাশায়ই রয়েছেন। আর যারা ব্যবসায় সফল হয়েছেন, তাদের জীবনটা একটা নির্দিষ্ট মানদণ্ডে নিয়ে গেছেন। এই দুই পক্ষের মধ্যে আয় বৈষম্য থাকার কারণে একেক জনের লাইফস্টাইলও একেক রকম। আমরা কথায় কথায় সবার লাইফস্টাইলের সাথে আমাদের লাইফস্টাইল এক করার চিন্তা করি অথচ ভাবি না আমাদের মাসিক খরচ বেতন নির্ভর। আর তাদের মাসিক খরচ ব্যবসার আয় নির্ভর। একজন সাংবাদিক হিসেবে এই বাস্তবতা আমাকে অস্বস্তিতে ফেলতো। তখন প্রায়ই আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করতাম, তিনি যেন আমাকে আরও সুন্দর ও স্বাধীন কোনো পথ দেখান।
সেই সময় বন্ধু ও শুভানুধ্যায়ীদের সঙ্গে নিয়ে বেতনের এই বৃত্ত থেকে বের হওয়ার নানা চেষ্টা করেছি। কোনো চেষ্টাই সফল হয়নি। বেতনের বৃত্ত পুরোপুরি ভাঙতেও পারিনি। তবে একটি বড় অর্জন হয়েছিল অনেক নতুন পথের সন্ধান পেয়েছিলাম। বুঝতে শিখেছিলাম, চাকরির বাইরেও পৃথিবী অনেক বড়।
আমার কিংবা অনেকেরই চাকরিজীবনের শুরুটা হয় প্রয়োজন থেকে। চাকরি মানে নিয়মিত আয়, নিরাপত্তা, সামাজিক স্বীকৃতি এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে কিছুটা নিশ্চয়তা। কিন্তু ধীরে ধীরে এই নিরাপত্তাই কখনো কখনো অদৃশ্য এক বৃত্ত তৈরি করে। আমরা এমন একপর্যায়ে পৌঁছে যাই, তখন এই বেতনের বৃত্ত থেকে আর বের হতে পারি না। এক কথায় যেখানে বেতন ছাড়া জীবন কল্পনা করাই কঠিন হয়ে পড়ে।
আমি মনে করি এটা আপনার-আমার জীবনের সবচেয়ে বড় ভুল। এই বেতনই আপনাকে আমাকে নতুন কিছু শেখা, ঝুঁকি নেওয়া, নিজের কোনো উদ্যোগ শুরু করা কিংবা বিকল্প আয়ের পথ খোঁজার ইচ্ছাগুলো থেকে বঞ্চিত করে। নিজেকেই বোঝাই ‘এখন’নয়,‘পরে’। অথচ সেই ‘পরে’ অনেকের জীবনেই আর আসে না। আমার ক্ষেত্রেও তাই হচ্ছে।
বেতন আপনার-আমার জীবনের সফলতার মাপকাঠি নয়। আমি মনে করি, সমস্যাটা বেতনে নয়। সৎভাবে কাজ করে বেতন পাওয়া অবশ্যই সম্মানের। সমস্যাটা শুরু হয় তখন, যখন বেতনই জীবনের একমাত্র লক্ষ্য এবং একমাত্র নিরাপত্তা হয়ে দাঁড়ায়।
মাস শেষে একটি নির্দিষ্ট অঙ্কের অর্থ পাওয়ার নিশ্চয়তার বিনিময়ে যদি আমরা নিজের স্বপ্নকে ছোট করতে শুরু করি, নতুন কিছু শেখা বন্ধ করি, নিজের দক্ষতার বাজারমূল্য বাড়ানোর চেষ্টা না করি কিংবা অন্যায়ের সামনে শুধু চাকরি হারানোর ভয়ে নীরব থাকি তাহলে বেতন আমাদের জন্য নিরাপত্তার পাশাপাশি একটি অদৃশ্য শৃঙ্খলেও পরিণত হতে পারে। এতোগুলো কথা বললাম বাংলাদেশের মাসিক বেতনের বাস্তবতা নিয়ে।
তবে বাংলাদেশে বিভিন্ন পেশায় বেতন-বৈষম্য থাকলেও প্রবাসে এসে আমার সেই ধারণার পরিবর্তন এসেছে। এখানে ন্যূনতম মজুরি-বেতন কাঠামো অনেক বেশি, যা বর্তমান অর্থব্যবস্থার সাথে সহায়ক। যে যেভাবে ক্যারিয়ার গঠন করতে চায় সে, সে লক্ষেই এগোতে পারে। প্রবাস জীবনের শুরুটা অনেককেই নানা চ্যালেঞ্জের মধ্য দিয়ে এগুতে হয়।
এখানের প্রিন্ট এবং ইলেক্ট্রনিক মিডিয়ার সম্মান এবং সম্মানী অনেক বেশি তবে সেই জায়গায় পৌঁছতে আপনাকে আমাকে কিছুটা পরিশ্রমী হতে হবে। শিক্ষাগত যোগ্যতা, ভাষা, দক্ষতা, নেটওয়ার্ক, পেশাগত মান, স্থায়ী বাসিন্দা কিংবা নাগরিকত্বসহ এখানকার পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে আমাকে-আপনাকে অনেকগুলো ধাপ অতিক্রম করতে হয়। আমি হয়তো তাই করছি। লক্ষে পৌছাতে পারবো কিনা জানি না, তবে চেষ্টা করতে দোষ কী?
চাকরি থাকবে, বেতন থাকবে। সিদ্ধান্ত আপনার? কোন লক্ষ্যে আপনি হাঁটবেন? আমার মতে, চাকরির পাশাপাশি এমন কিছু ক্ষেত্র তৈরি করার চেষ্টা থাকা দরকার, যা একদিন চাকরির বাইরেও আমাদের পরিচয়, আয় এবং স্বাধীনতার জায়গা তৈরি করতে পারে।
বেতনের একটি অংশ সঞ্চয় করা, বিনিয়োগ শেখা, নতুন দক্ষতা অর্জন করা, নিজের পেশাগত পরিচিতি তৈরি করা, লেখালেখি বা সৃজনশীল কাজ চালিয়ে যাওয়া কিংবা সামর্থ্য অনুযায়ী ছোট কোনো উদ্যোগের পথ খোঁজা। এসব সিদ্ধান্ত অর্থনৈতিক স্বাধীনতার দিকে এগিয়ে যাওয়ার উপায়। বেতনের বৃত্ত থেকে বের হওয়া মানেই চাকরি ছেড়ে দেওয়া নয়। বরং চাকরিকে নিজের ভবিষ্যৎ তৈরির একটি মাধ্যম হিসেবে দেখা যেতে পারে। যেমনটা হয়তোবা আমার মত আপনিও ভেবে রেখে মূল লক্ষে হাঁটছেন।
সবশেষে বলবো, আমি কাউকে বেতনের বৃত্ত থেকে বেরিয়ে আসার পরামর্শ দিচ্ছি না। এ লেখা কোনো পেশা বা বেতন নির্ভর জীবনকে প্রশ্নবিদ্ধ করার প্রয়াশ নয়; বরং নিজের জীবন ও অভিজ্ঞতা থেকে উপলব্ধি করা কিছু ব্যক্তিগত ভাবনার প্রকাশ মাত্র।



