প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলমের বক্তব্য নির্দেশ করছে যে, শীঘ্রই স্থানীয় সরকারের মাধ্যমে গণতান্ত্রিক চর্চা ও তৃণমূলের প্রশাসনিক ভিত্তি সক্রিয় করার একটি পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।
তবে নির্বাচন বা সরকার পরিবর্তনের এ উদ্যোগ কেবল তখনই অর্থবহ হতে পারে, যখন নির্বাচন-পরবর্তী প্রশাসনিক কাঠামোর মৌলিক দুর্বলতাগুলো কাটানো সম্ভব হবে। রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে একটি বড় বৈপরীত্য হলো- সংবিধান যে স্থানীয় সরকারকে জনগণের নিকটতম শাসনব্যবস্থা হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে, বাস্তবে সেই প্রতিষ্ঠানগুলোই সবচেয়ে সীমিত ক্ষমতার ও দুর্বল।
জনগণের হাতের নাগালে থাকা নির্বাচিত প্রতিনিধিদের ওপর উন্নয়ন, জনসেবা এবং স্থানীয় সমস্যা সমাধানের নানা দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে, কিন্তু সেই দায়িত্ব পালনের জন্য প্রয়োজনীয় জনবল, আর্থিক স্বাধীনতা এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের কর্তৃত্ব তাদের দেওয়া হয়নি। ফলে জবাবদিহি থাকলেও কার্যকর ক্ষমতার অভাবে পুরো ব্যবস্থাটি একটি স্থায়ী প্রশাসনিক সংকটের মধ্য দিয়ে পরিচালিত হচ্ছে।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী দেশে বর্তমানে ৪,৫৯৯টি ইউনিয়ন পরিষদ রয়েছে। সাধারণ মানুষের কাছে এ প্রতিষ্ঠানই রাষ্ট্রের সবচেয়ে প্রত্যক্ষ ও দৃশ্যমান প্রতিনিধি। জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন, নাগরিক সনদ বিতরণ, সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী পরিচালনা, স্থানীয় অবকাঠামো উন্নয়ন থেকে শুরু করে সালিস-নিষ্পত্তির মতো দৈনন্দিন নানা কাজের সঙ্গে ইউনিয়ন পরিষদ সরাসরি সম্পৃক্ত।
তাই এটি কেবল একটি সাধারণ প্রশাসনিক ইউনিট নয়; এটি গণতন্ত্র, মাঠপর্যায়ের উন্নয়ন এবং রাষ্ট্র পরিচালনার মূল চালিকাশক্তি। সংবিধানের ৫৯ ও ৬০ অনুচ্ছেদে স্থানীয় সরকারের বিষয়ে রাষ্ট্রের অবস্থান অত্যন্ত স্পষ্ট। সেখানে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের মাধ্যমে স্থানীয় প্রশাসন পরিচালন, উন্নয়ন পরিকল্পনা প্রণয়ন, নিজস্ব কর আরোপ, বাজেট প্রস্তুতকরণ এবং স্থানীয় তহবিল ব্যবস্থাপনার কথা বলা হয়েছে। সংবিধানের মূল লক্ষ্য ছিল স্থানীয় সরকারকে কেবল সেবাদানকারী সংস্থা নয়, বরং প্রতিটি এলাকায় কার্যকর 'স্থানীয় সরকার' হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা।
কিন্তু স্বাধীনতার দীর্ঘ সময় পার হওয়ার পরও বাস্তব চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। ক্ষমতা, আর্থিক সম্পদ এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের বড় অংশটি এখনও কেন্দ্রীয় আমলাতন্ত্র ও প্রশাসনের হাতে কেন্দ্রীভূত। ফলে ইউনিয়ন পরিষদকে প্রতিনিয়ত বহুমাত্রিক দায়িত্ব পালন করতে হলেও সেই দায়িত্ব বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় আইনি ও কাঠামোগত সক্ষমতা তাদের দেওয়া হয় না।
কাগজে-কলমে একটি ইউনিয়ন পরিষদকে ১০টি বাধ্যতামূলক এবং ৩৯টি ঐচ্ছিক দায়িত্বসহ প্রায় শতাধিক কাজের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে। পরিবেশ সংরক্ষণ, প্রাথমিক শিক্ষা ও জনস্বাস্থ্য পর্যবেক্ষণ, নারী ও শিশু সুরক্ষা, সামাজিক সম্প্রীতি রক্ষা, স্থানীয় আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখা এবং গ্রামীণ অবকাঠামোর তদারক- সবই এই কাঠামোর অন্তর্ভুক্ত। কিন্তু বাস্তবতায় অধিকাংশ ইউনিয়ন পরিষদের দৈনন্দিন কার্যক্রম সীমাবদ্ধ থাকে কেবল সনদ প্রদান, সরকারি খাদ্য সহায়তা কর্মসূচি (ভিজিএফ-ভিজিডি) বিতরণ, ক্ষুদ্র সংস্কারকাজ এবং কিছু সালিস বৈঠকের মধ্যে।
এই সীমাবদ্ধতার প্রধান কারণ দায়িত্বের অভাব নয়, বরং দায়িত্ব পালনের কার্যকর সুযোগ ও স্বাধীনতার অভাব। বিশ্বব্যাপী একটি গতিশীল ও আধুনিক স্থানীয় সরকারব্যবস্থা নিশ্চিত করতে চারটি মৌলিক ভিত্তির ওপর জোর দেওয়া হয়- কাজ (ফাংশন), কর্মী (ফাংশনারি), অর্থ বা সম্পদ (ফান্ড) এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বাধীনতা (ফ্রিডম)। বাংলাদেশে ইউনিয়ন পরিষদগুলো এই চারটির কোনোটিই স্বয়ংসম্পূর্ণভাবে ভোগ করতে পারে না। সবচেয়ে বড় সমস্যাটি ঘটে কর্মীবাহিনীর প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণে।
ইউনিয়ন পরিষদ এলাকায় দায়িত্বপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা চেয়ারম্যান বা পরিষদ কমিটির অধীন নন। তারা তাদের নিজ নিজ কেন্দ্রীয় মন্ত্রণালয় বা বিভাগের নিয়ন্ত্রণে কাজ করেন। ফলে কৃষি, শিক্ষা, জনস্বাস্থ্য, প্রাণিসম্পদ, সমাজসেবা কিংবা নারী ও শিশু বিষয়ক প্রতিনিধিরা মাঠপর্যায়ে অবস্থান করলেও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের তাদের ওপর কোনো প্রাতিষ্ঠানিক বা প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ থাকে না। জনগণের কাছে চেয়ারম্যান জবাবদিহি করতে বাধ্য হলেও, সেবা বাস্তবায়নের প্রধান অনুঘটকদের ওপর তার প্রশাসনিক কোনো কর্তাকর্তৃত্ব থাকে না।
এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে অতিরিক্ত কেন্দ্রীয় ও আমলাতান্ত্রিক তদারকি। সংবিধানে ইউনিয়ন পরিষদকে স্বশাসিত প্রতিষ্ঠান হিসেবে দেখার নির্দেশনা থাকলেও বাস্তবে একে বিভিন্ন অনুমোদননির্ভর প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার মধ্যে আটকে রাখা হয়েছে। নির্বাচিত প্রতিনিধিরা নীতি নির্ধারণ বা নিজস্ব পরিকল্পনা বাস্তবায়নের চেয়ে উচ্চপর্যায়ের নির্দেশ কার্যকর করার মাধ্যমে তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করতে বাধ্য হন। এই কেন্দ্রীয় প্রভাব শুধু ইউনিয়ন পরিষদকে দুর্বল করেনি, বরং স্থানীয় প্রতিনিধিদের একধরনের প্রাতিষ্ঠানিক সংকটের মুখে ঠেলে দিয়েছে।
মাঠপর্যায়ে কাজের অভিজ্ঞতা থেকে দেখা যায়, কোনো এলাকায় সরকারি সেবার ত্রুটি বা উন্নয়নমূলক কাজের ধীরগতির জন্য জনগণ নির্বাচিত চেয়ারম্যান বা মেম্বারকেই দায়ী করে। অথচ সেই সেবা বা বরাদ্দের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত থাকে অন্য দপ্তর কিংবা কেন্দ্রীয় কর্মকর্তাদের হাতে। রুশ শব্দ ответственности (অৎভিয়েত্স্তভেন্নস্তি) যার অর্থ বাংলা করলে দাঁড়ায় দায়িত্ব/দায়বদ্ধতা ও ক্ষমতার এই অসঙ্গতি জনপ্রতিনিধিদের অদক্ষতার জন্য এককভাবে দায়ী করার সুযোগ তৈরি করে, যা বাস্তবে কাঠামোগত ত্রুটিরই ফল।
তাই স্থানীয় সরকারব্যবস্থার দুর্বলতাকে কেবল ব্যক্তিগত অদক্ষতা কিংবা নৈতিক ব্যর্থতা দিয়ে দেখলে সঠিক সমাধান পাওয়া সম্ভব নয়। যখন দায়িত্ব এবং জনগণের প্রত্যাশা এক জায়গায় জমা হয়, কিন্তু অর্থায়ন ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা অবস্থান করে অন্য স্থানে, তখন কাঠামোগত স্থবিরতা তৈরি হওয়া অনিবার্য।
শক্তিশালী স্থানীয় সরকার রাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ক্ষমতার প্রতিদ্বন্দ্বী নয়, বরং রাষ্ট্রের সামগ্রিক কার্যকারিতা বৃদ্ধির অন্যতম বড় মাধ্যম। বিশ্বের যে রাষ্ট্রগুলো সুশাসন নিশ্চিত করেছে, তারা স্থানীয় সরকারকেই নাগরিক সেবার মূল কেন্দ্রে রূপান্তর করেছে। কারণ স্থানীয় মানুষের সমস্যা সবচেয়ে ভালো বোঝেন স্থানীয় প্রতিনিধিরাই, এবং দ্রুততম সময়ে সমাধান দেওয়াও তাদের পক্ষেই সম্ভব।
আগামী জানুয়ারিতে শুরু হতে যাওয়া স্থানীয় সরকার নির্বাচন যদি কেবল ক্ষমতা রদবদলের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে, তবে কাঠামোগত পরিবর্তন আসবে না। ইউনিয়ন পরিষদকে প্রকল্প বাস্তবায়নের শেষ প্রান্তের সহযোগী সংস্থা হিসেবে না দেখে প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণের মূল কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। দায়িত্বের সাথে সামঞ্জস্য রেখে সরাসরি অর্থায়ন, নিজস্ব জনবল ও নীতি নির্ধারণের স্বাধীনতা দিতে হবে।
একই সঙ্গে সংবিধানের ৫৯ ও ৬০ অনুচ্ছেদের আলোকে আমলাতান্ত্রিক নিয়ন্ত্রণ কমিয়ে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের হাতে প্রকৃত ক্ষমতা হস্তান্তর করা প্রয়োজন। একটি দেশের সত্যিকারের উন্নয়ন কেবল মেগা প্রকল্প বা কেন্দ্রীয় বড় অবকাঠামোর ওপর নির্ভর করে না; উন্নয়নের সঠিক মানদণ্ড হলো রাষ্ট্রীয় সেবা কতটা সহজে ও মর্যাদা সহকারে সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছাচ্ছে। স্থানীয় সরকারের ভিত্তি দুর্বল রেখে জাতীয় পর্যায়ে টেকসই গণতন্ত্র কিংবা শক্তিশালী রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে তোলা অসম্ভব।



