Sunday, May 19, 2024

সেকশন

English
Dhaka Tribune

বাংলাদেশের সংস্কারে দরকার কঠোর পদক্ষেপ

সরকার কি তার ‘ব্যবসা-বান্ধব’ নীতির বাইরে গিয়ে স্বজনপ্রীতি ও নমনীয় মনোভাব পরিহার করবে না

আপডেট : ১১ মার্চ ২০২৪, ০৪:০৭ পিএম

কয়েকটি খাতে ঈর্ষণীয় সাফল্যে সারাবিশ্বে সুনাম অর্জন করলেও ২০২৪ সালে এসে আর্থিক সংকট, দুর্নীতি, লাগামহীন বাজারদর, সুশাসন প্রতিষ্ঠায় নানা চ্যালেঞ্জের কারণে বাংলাদেশ মাঝেমধ্যে হিমশিম খাচ্ছে। আর এটি স্পষ্ট যে, টানা ১৫ বছর ক্ষমতায় থাকা একটি দলের জন্য এই পরিস্থিতি অস্বস্তিকর। কিন্তু এই অস্বস্তি কাটিয়ে উঠে জনগণের আস্থা অর্জন করতে যে ধরণের অর্থপূর্ণ সংস্কার প্রয়োজন সেদিকে সরকার এখনো হাঁটছে না। দীর্ঘস্থায়ী সমাধানের পথে স্বল্প ও মধ্যমেয়াদী সংস্কারকাজ বাস্তবায়নে সরকারকে এখন কঠোর হতে হবে, কিন্তু সেজন্য ক্ষমতাসীন দল এখনো প্রস্তুত নয় বলে অনুমিত হয়।

সাম্প্রতিককালে বেইলি রোডের একটি বহুতল বাণিজ্যিক ভবনে বেআইনিভাবে পরিচালিত রেস্টুরেন্টের আগুনে প্রায় অর্ধশত প্রাণহানি ঘটেছে। দেখা যাচ্ছে, এই মর্মান্তিক ঘটনার কারণ অনিয়ম-দুর্নীতির মাধ্যমে রেস্তোরাঁ ও দোকান পরিচালনা করা। সরকারি ডজনখানেক দপ্তর ও সংস্থা এ ধরনের ব্যবসার অনুমোদন ও পরিদর্শনের জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত হওয়া সত্ত্বেও অনিয়ম দূর না করে সবাই সংঘবদ্ধভাবে দুর্নীতিকে প্রশ্রয় দিয়েছে। একই রকমের সমস্যা আছে স্বাস্থ্য ও অন্যান্য সেবাখাতেও।

অন্যদিকে, প্রধানমন্ত্রীসহ সরকার ও রাষ্ট্রের দায়িত্বপ্রাপ্তদের সতর্কবাণী সত্ত্বেও ব্যবসায়ীদের একটি বড় অংশ বিগত বছরগুলোর মতো এই রমজানেও নিত্যপণ্যের বাজারকে অস্থিতিশীল করে চলেছে। আর রাঘববোয়ালরা সরকারি প্রকল্প ও ব্যাংক-বীমার টাকা লুট করছে, বিদেশে সম্পদের পাহাড় গড়ছে আবার টাকার জোরে আইন-আদালতকে বুড়ো আঙুল দেখাচ্ছে। 

এমনটা বহু বছর ধরেই চলে আসছে। কিন্তু এর শেষ কোথায়? আমরা কি জাতি হিসেবে লোভী, দুর্নীতিপরায়ণ, বেখেয়ালি ও অপরিণামদর্শী থাকব? সরকার কি তার “ব্যবসা-বান্ধব” নীতির বাইরে গিয়ে স্বজনপ্রীতি ও নমনীয় মনোভাব পরিহার করবে না? ক্ষণিকের লাভের চেয়ে জবাবদিহিতাকে অগ্রাধিকার দেবে না? তারা কি অনিয়ম-দুর্নীতির বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে দীর্ঘমেয়াদী সংস্কার কাজে হাত দেবে না? 
যেহেতু সাধারণ আইন ও পদ্ধতিগুলো এসব অপরাধীদের বিরুদ্ধে যথাযথভাবে কাজ করছে না, তাই ছয় মাসের জন্য জরুরি অবস্থা ঘোষণা করে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, দুর্নীতি, সন্ত্রাস, মাদক চোরাচালান এবং অন্যান্য গুরুতর অপরাধ মোকাবিলায় প্রতিটি জেলায় বিশেষ টাস্কফোর্স গঠনের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট সব বিভাগ ও সংস্থাকে সমন্বিতভাবে কার্যক্রম চালাতে হবে। প্রয়োজনে ট্রাইব্যুনাল গঠনের মতো শক্তিশালী পদক্ষেপ নিতে হবে। এছাড়া বিদেশে পাচার হওয়া টাকা ফিরিয়ে আনা এবং লুটপাটকারীদের কাছ থেকে জরিমানা আদায় করে রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা দিতে হবে।

আর এ ধরনের একটি কঠোর সংস্কার কার্যক্রম শুরুর আগে সরকার ও সরকারি দলকে অবশ্যই তার সক্ষমতা এবং ত্রুটিগুলোর পুঙ্খানুপুঙ্খ মূল্যায়ন করতে হবে; সংশ্লিষ্ট দপ্তর ও সংস্থার পুনর্গঠন, দায়িত্ব পরিবর্তন এবং অনিয়ম-দুর্নীতিতে জড়িত কর্মীদের দ্রুততার সাথে অপসারণ করতে হবে।

১৯৭৪-৭৫ সালে একই রকম একটি পরিস্থিতিতে স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কিছু দূরদর্শী পদক্ষেপ নিয়েছিলেন। তিনি স্বল্পমেয়াদে সেনা মোতায়েনের মাধ্যমে মজুতদারি, চোরাচালান ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে সাঁড়াশি অভিযান পরিচালনা করেন।

দীর্ঘমেয়াদী চিন্তার অংশ হিসেবে নিজস্ব সমাজতান্ত্রিক দর্শনের ভিত্তিতে রাজনীতি, প্রশাসন ও অর্থনীতিতে ব্যাপক সংস্কার সাধনের লক্ষ্যে নতুন ধারার একটি সরকার প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি, আমলাতান্ত্রিক অযোগ্যতা এবং বিদেশি ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে লড়াই করতে দেশের প্রতিভাবান ব্যক্তিদের সঙ্গে নিয়ে কঠোরভাবে সংস্কারকাজ চালিয়ে যেতে হবে। রাষ্ট্র ও সমাজের সর্বক্ষেত্রে শৃঙ্খলা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে তিনি ছিলেন দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।

আজ প্রায় অর্ধশতাব্দী পরে বাংলাদেশের ভূ-রাজনৈতিক গুরুত্ব এবং বিশ্বব্যাপী গ্রহণযোগ্যতা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। আর বিশ্বায়নের ফলে বাংলাদেশের বিভিন্ন খাতে সাফল্যের গল্পের পাশাপাশি জনগণের অভাব-অভিযোগ, রাজনৈতিক ও আর্থিক খাতের সমস্যা ও সংকট, গণতান্ত্রিক পরিবেশ, আইনের শাসন ইত্যাদিও বৈশ্বিক পরিমণ্ডলে আলোচিত হয়। 

তাই বাংলাদেশের রাজনীতি, প্রশাসন ও অর্থনীতিতে গুণগত, টেকসই ও উদাহরণ সৃষ্টিকারী পরিবর্তন আনতে সরকার ও ক্ষমতাসীন দলকে অবশ্যই আত্মশুদ্ধির মাধ্যমে জনগণের কল্যাণের উদ্দেশ্যে দৃঢ় পদক্ষেপ নিতে হবে। সংকীর্ণ রাজনৈতিক হিসেব-নিকাশের চেয়ে জনগণের স্বার্থকে প্রাধান্য দিলে বা পক্ষপাতের বদলে মেধাকে গুরুত্ব দেওয়ার পাশাপাশি শৃঙ্খলা, জবাবদিহিতা ও সাম্যের পথে সংস্কার করলে স্মার্ট বাংলাদেশ নির্মাণ পরিকল্পনা বাস্তবসম্মত মনে হবে।

প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্ত ব্যক্তিগত। ঢাকা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ এর জন্য দায়ী নয়।

About

Popular Links