পনের বছরের টানা সামরিক ও আধা-সামরিক শাসনের পর নব্বইয়ের প্রবল গণআন্দোলনে সামরিক স্বৈরাচার জেনারেল হুসাইন মোহাম্মদ এরশাদের পতন হয়; তিনজোটের রূপরেখা অনুযায়ী গঠিত হয় প্রথম তত্ত্বাবধায়ক সরকার, যার অধীনে অনুষ্ঠিত নির্বাচন বাংলাদেশকে গণতান্ত্রিক ধারায় ফিরিয়ে নিয়ে আসে। গণঅভ্যুত্থানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখলেও নির্বাচনি প্রচারণায় পিছিয়ে যায় আওয়ামী লীগ। সরকার গঠন করে বিএনপি। এরপর সহযোগিতার পুরস্কারস্বরূপ জামায়াতে ইসলামির আমির গোলাম আযমকে নাগরিকত্ব ফিরিয়ে দেওয়াসহ অন্যান্য ধর্মভিত্তিক দলকে বিস্তার লাভ করার জন্য নানা সুযোগ-সুবিধা দেওয়া হয়। ১৯৯১ সালে দ্বিতীয়বারের মতো ক্ষমতায় এসে জেনারেল জিয়ার দেখানো পথেই হেঁটেছে খালেদা জিয়ার বিএনপি; মানে আওয়ামী লীগ ও ভারত বিরোধিতার রাজনীতি, দুর্নীতি, অনিয়ম, স্বজনপ্রীতি, ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক গোষ্ঠীকে প্রকাশ্যে প্রশ্রয় দেয় দলটি। এছাড়া ১৯৯৪ সালের ২০ মার্চ মাগুরা-২ আসনের উপনির্বাচনে পুকুরচুরি এবং বিরোধী দলগুলোর তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবিকে তুচ্ছ করে ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারির পাতানো নির্বাচনের কারণে দলটি এখনও ভীষণ সমালোচিত হয়। একই বছর জুনে খালেদা জিয়া তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন দিলে ক্ষমতার পালাবদল ঘটে; ২১ বছর পর ক্ষমতায় আসে আওয়ামী লীগ।
কিন্তু ইতিহাস থেকে শিক্ষা না নিয়ে প্রতিহিংসার রাজনীতি, দুর্নীতি-অনিয়ম-স্বজনপ্রীতি-সন্ত্রাস ও দায়মুক্তির অপসংস্কৃতিকে লালন করার কারণে তারাও হেরে যায় পরের নির্বাচনে। কারণ, নির্বাচন পরিচালনায় ছিল তত্ত্বাবধায়ক সরকার। ২০০১ সালের অক্টোবরে নির্বাচন-পরবর্তী রাজনৈতিক সহিংসতায় লাখ লাখ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হন। বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিশন পরে প্রায় ১৮ হাজার ঘটনার কথা লিপিবদ্ধ করে, যার মধ্যে খুন, ধর্ষণ, লুটপাট, ও অগ্নিসংযোগের ঘটনাই বেশি। কিন্তু পরিতাপের বিষয় হলো নির্বাচিত বিএনপির নেতৃত্বাধীন চার-দলীয় জোট সরকার ক্ষমতায় আসার পর একটি ঘটনারও বিচার করেনি। এমনকি পরবর্তী ১/১১ সরকার তার দুই বছর মেয়াদে এবং আওয়ামী লীগ সরকার ১৫ বছরের বেশি সময় এসব রাজনৈতিক প্রতিহিংসামূলক সহিংসতার বিচার করেনি। বলা যায়, ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিয়ে এরা কেউই দলীয় সংকীর্ণতাকে পরিহার করতে পারেনি। ফলে দলের সম্মান ক্ষুণ্ণ হওয়ার পাসশাপাসশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে জনগণ ও গণতন্ত্র।
তখনকার পত্রিকার খবর ও মতামত বিশ্লেষণ এবং মার্কিন গোপন নথি থেকে জানা যায়, ২০০১ সালে দলের যুগ্ম মহাসচিবের দায়িত্বে থাকা প্রধানমন্ত্রীর বড় ছেলে তারেক রহমান রাজনীতিতে সক্রিয় হন। সরকারের মন্ত্রীসভা, প্রশাসন, বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস এবং দল ও জোটের নানান সাংগঠনিক কাজে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে ভূমিকা রেখে ব্যাপকভাবে আলোচনায় আসেন। নির্বাচনের আগে দলের প্রস্তুতি এবং জোট গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখার জন্য ছাত্র-যুবক ও নতুন সংসদ সদস্য ও কনিষ্ঠ মন্ত্রীদের মধ্যে তিনি অত্যন্ত জনপ্রিয় নেতা ছিলেন। সুদর্শন চেহারা এবং মিষ্টি হাসির অধিকারী তারেক রহমানের ফ্যাশন ভাবনা ও চলাফেরা দেখে কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-যুবকরা তাকে অনুকরণ করতো। মাঠে-ময়দানে ভাষণ দিয়ে নেতা-কর্মীদের উজ্জ্বীবিত করতেন আবার গুরুত্ব দিতেন সময়ানুবর্তিতা ও শৃঙ্খলার ওপর। দলের বাইরে রাষ্ট্রীয় প্রশাসন যন্ত্রকে ঢেলে সাজানো, পুলিশ ও নির্বাচন কমিশন নিয়ে তার ভাবনা এবং জোটবদ্ধ দলগুলোর সাথে তিনি দারুণভাবে সমন্বয় করতেন।
তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান নিয়ে আওয়ামী লীগের আপত্তির কারণে বিএনপির নিয়োগকৃত রাষ্ট্রপতি ইয়াজউদ্দিন আহমেদ ২০০৬ সালের ২৯ অক্টোবর নিজেই প্রধান উপদেষ্টার পদ গ্রহণ করেন। তবে নির্বাচনের ১১ দিন আগেই ১১ জানুয়ারি জোট সরকারের নিয়োগকৃত তৎকালীন তিনবাহিনী প্রধানের চাপে রাষ্ট্রপতি প্রধান উপদেষ্টার পদ থেকে পদত্যাগ করেন এবং জরুরি অবস্থা জারি করেন। এরপর সুশীল সমাজের প্রতিনিধি হিসেবে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ফখরুদ্দীন আহমেদের অধীনে উপদেষ্টা পরিষদ গঠিত হয়, যা ১/১১ সরকার নামে পরিচিত। তারা নির্বাচনি ব্যবস্থা সংস্কার ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে জোরালো অভিযানের ঘোষণা দেয়, যা মাইনাস-টু ফর্মুলা হিসেবে আওয়ামী লীগ ও বিএনপিকে রাজনৈতিকভাবে দুর্বল করে দেওয়ার প্রচেষ্টা হিসেবে বিতর্কিত হয়েছিল।
এরই মধ্যে ৭ মার্চ রাতে শুরু হওয়া প্রথম অভিযানে সেনাবাহিনীর হাতে গ্রেপ্তার হন তারেক রহমান। ২০ দিন পর তার বিরুদ্ধে তিনটি দুর্নীতির মামলা হয়। রিমান্ডে অকথ্য নির্যাতন করার ফলে ২০০৮ সালের ২৯ জানুয়ারি তার সুচিকিৎসা নিশ্চিত করতে মেডিকেল বোর্ড গঠন করা হয়। দুইদিন পরে তাকে বঙ্গবন্ধু মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রিজন সেলে আনা হয়। হাইকোর্ট থেকে জামিন নিয়ে ২০০৮ সালের ৩ সেপ্টেম্বর কারাগার থেকে মুক্তির আগে তার বিরুদ্ধে আরও আটটি মামলা হয়। এরপর ১১ সেপ্টেম্বর যুক্তরাজ্যে চলে যান তিনি। দুর্নীতির বিরুদ্ধে ঘোষিত যুদ্ধের ধারাবাহিকতায় গ্রেপ্তার হন আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা, বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়া এবং এই দুই দলের শীর্ষনেতারা। অন্যদিকে, যাদের গ্রেপ্তার করা হয়নি, তাদের দিয়ে ১/১১ সরকার সমর্থক সংস্কারপন্থী দল গঠনের চেষ্টাও হয়েছিল জোরেশোরে।
এই রহস্যময় পরম ক্ষমতাশালী সরকারের গঠনপ্রক্রিয়া নিয়ে পরে জানা যায় ফখরুদ্দীনকে প্রধান উপদেষ্টা করার আগে সেনাবাহিনী প্রথমে নোবেল বিজয়ী অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক ড. মুহম্মদ ইউনূসকে অনুরোধ করলেও তিনি তা ফিরিয়ে দেন। তবে ঠিক এক মাস পরেই জরুরি অবস্থার মধ্যে রাজনীতিতে আসার ইচ্ছা পোষণ করে খোলা চিঠি দেন ড. ইউনূস। সুশীল সমাজের প্রতিনিধি ও সচেতন মহলের শুভাকাঙ্ক্ষীদের কাছ থেকে সাড়া পেয়ে দলের নাম ঠিক করেন নাগরিক শক্তি; পরিকল্পনা করেন কীভাবে এই দলের মাধ্যমে সারা দেশের আনাচে-কানাচে ছড়িয়ে গিয়ে সব বয়সের সব শ্রেণী-পেশার মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষাকে ধারণ করে গণতান্ত্রিক ও উন্নত বাংলাদেশে রূপান্তর করা যায়। কিন্তু মে মাসেই তিনি পিছিয়ে যান। খোলা চিঠিতে তিনি জানান, বিরাজমান রাজনীতির শক্ত বিকল্প গড়ে তুলতে যেসব রাজনৈতিক নেতাকে তিনি পাশে চেয়েছিলেন তারা তাকে অনুপ্রানণিত করলেও নিজের দল ছেড়ে আসবেন না। আরও অনেকে যারা ব্যক্তিগতভাবে তাকে সমর্থন জানিয়েছিলেন, তারাও ব্যক্তিগত কারণে প্রকাশ্যে আসতে অপারগতা জানান। তবে তারা সবাই দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতি পরিবর্তনের পক্ষে চছিলেন। এরপর প্রকাশ্য রাজনীতি থেকে সরে গেলেও দেশ পরিচালনায় সেনাবাহিনী সমর্থিত ১/১১ সরকারকে পরামর্শ দিয়ে ও সহযোগিতা করতে বিভিন্ন সংস্কার কাজে ড. ইউনূস ও সুশীল সমাজে তার শুভাকাঙ্ক্ষীরা ব্যাপকভাবে সক্রিয় ছিলেন।
শেষ খোলা চিঠিতে তিনি আরও বলেছিলেন, জরুরি অবস্থা ঘোষণা এবং তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনের পর দেশে আশার আলো বিরাজ করছে। রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন দ্বার উন্মোচিত হয়েছে। নতুন নেতৃত্বের মাধ্যমে নতুন রাজনৈতিক ধারা তৈরি করে দ্বন্দ্ব, কলহ ও সংঘাতকেন্দ্রিক রাজনীতিকে কবর দিয়ে দেশের অর্থনীতিকে এগিয়ে নিতে নতুন সুযোগ তৈরি হয়েছে। সবাই বুঝতে পেরেছে এরকম সুযোগ সবসময় আসে না। সবাই মনে করে রাজনৈতিক সদিচ্ছা, যোগ্য নেতৃত্ব এবং সুশাসন নিশ্চিত করা গেলে উদ্ভাবনের মাধ্যমে অসম্ভবকে সম্ভব করা যায়। এই দৃষ্টিকোণ থেকেই তিনি রাজনীতিতে যোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। তার লক্ষ্য চছিল একতাবদ্ধ, সহানুভূতিশীল, শান্তিপূর্ণ, ধর্মনিরপেক্ষ এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্য প্রতিশ্রুতিবদ্ধ রাজনৈতিক ধারা সৃষ্টি করার মাধ্যমে জনগণকে সংঘাত, অবিশ্বাস ও হতাশা থেকে মুক্ত করে দেশকে একটি আত্মপ্রত্যয়ী জাতিতে পরিণত করা। এর থেকে বোঝা যায়, সেনাশাসন পরবর্তী তথাকথিত গণতান্ত্রিক ১৬ বছরে দেশের রাজনীতি ও অর্থনীতি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল।
তবে দুই বছরের মাথায় নির্বাচন দেওয়ার আগে ১/১১ সরকার তাদের বেশিরভাগ সংস্কারকাজ সম্পন্ন করতে পারেনি। বাছ-বিচার করায় দুর্নীতির মূলোৎপাটনে কোনো কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেনি। মোটাদাগে ড. ফকখরুদ্দীনের সরকার কিছু দুর্নীতিবাজকে চিহ্নিতকরণ, মামলা দায়ের ও গ্রেপ্তারের মাধ্যমে জনমনে আতঙ্ক সৃষ্টি করতে এবং ভোটার তালিকা ও সীমানা সংশোধন করতে সক্ষম হয়েছিল।
দুর্নীতিবিরোধী কর্মকাণ্ডে যে কয়টি ঘটনা ও যাদের নাম উঠে আসে, তার মধ্যে সবচেয়ে বেশি আলোচিত হয়েছিল বিএনপির শীর্ষনেতা তারেক রহমানের নাম। মূলত গ্রেপ্তারের পর তারেক রহমানের দুর্নীতি ও অনিয়ম নিয়ে সুস্পষ্ট কিছু অভিযোগ সামনে আসে। গুলশানস্থ হাওয়া ভবন অফিস ব্যাপক পরিচিতি পায়। বলা হয়, তিনি এই বাড়িতে একটি সমান্তরাল সরকার চালাতেন। এছাড়া দুর্নীতি-অনিয়মের মাধ্যমে টাকার পাহাড় তৈরি, বিরোধী দলকে দমন-পীড়ন, সন্ত্রাসী কর্মকান্ডে মদদ দেওয়া এবং ২০০৭ সালের ২২ জানুয়ারির নির্বাচনে দলের বিজয় নিশ্চিত করতে ভুয়া ভোটার বানানো ও নির্বাচনি কর্মকর্তা হিসেবে দলীয় নেতা-কর্মীদের নিয়োগ দেওয়ার জন্য বিএনপির যে দুর্নাম ছিল, তার মূল কারিগর তারেক রহমান। সেসময়কার পত্র-পত্রিকা ও দেশী-বিদেশী মানবাধিকার সংগঠন, মার্কিন রাষ্ট্রদূতসহ অন্যান্য দূতাবাসের কর্মকর্তারা বিভিন্ন সময়ে বিএনপির অনিয়ম দুর্নীতির সমালোচনা করেছে। এমনকি ২০০৬ সালের ক্ষমতা হস্তান্তরের আগেই বিএনপির কিছু প্রভাবশালী নেতা দলত্যাগ করেন এবং প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানের কর্মকান্ডের নিন্দা জানান। অনেকেই তাই ২০০৮ সালের নির্বাচনে বিএনপির ভরাডুবির জন্য তারেক রহমানকেই দায়ী করেন।
২০০৫ সালের ২০ ডিসেম্বর ঢাকাস্থ মার্কিন দূতাবাসের চার্জ দ্যা অ্যাফেয়ার্স একটি টেলিগ্রামে তারেক রহমানকে “ডার্ক প্রিন্স” হিসেবে উল্লেখ করেন। তিনি বলেছিলেন যে, তারেক রহমান হাওয়া ভবনের মাধ্যমে ব্যবসায়ী ও দলের উচ্চাভিলাষীদের কাছ থেকে চাঁদা নিয়ে অর্থের পাহাড় গড়ে তুলেছেন। তার ভয়ে দলের মধ্যে থাকা নির্বিবাদী নেতা, সাংবাদিক, ব্যবসায়িক প্রতিদ্বন্দ্বী এবং প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের কিছু কর্মকর্তারাও তটস্থ থাকতেন। তারা তারেক রহমানকে নির্মম ও অনভিজ্ঞ মনে করতেন।
তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান নিয়ে আওয়ামী লীগের আপত্তি ও রাজপথে সহিংস আন্দোলনের কারণে গণতন্ত্র ও নির্বাচনি ব্যবস্থা আবারও হুমকির মুখে পড়ে। তখন সুশীল সমাজ ছাড়াও বিভিন্ন বিদেশি দূতাবাসের কর্মকর্তারা একটি শান্তিপূর্ণ সমাধানের জন্য দেন দরবার করেছেন। ২০০৬ সালের অক্টোবরে রাষ্ট্রপতি ইয়াজউদ্দিন আহমেদ প্রধান উপদেষ্টার দায়িত্ব নেওয়ার আগে আমেরিকা, বৃটেন, অস্ট্রেলিয়া ও কানাডার রাষ্ট্রদূতরা তত্ত্বাবধায়ক সরকার ও নির্বাচনি ব্যবস্থা সংস্কারের প্রস্তাব দেন। প্রতিবেদনে তারা বলেন বাংলাদেশের রাজনীতির সাথে অপরাধ জগতের সংশ্লিষ্টতার জন্য নির্বাচনে জয়লাভের পর বিজয়ীরাই সব ক্ষমতা কুক্ষিগত করে; সহিংসতা ও নির্বাচনে কারচুপি এগুলো সাধারণ ঘটনা। বলা হয়, জোট সরকার প্রধান নির্বাচন কমিশনার নিরপেক্ষ ও দক্ষ ছিলেন না; এছাড়া যাকে সরকার প্রধান উপদেষ্টা বানাতে চেয়েছিল তার জন্য প্রধান বিচারপতির অবসর গ্রহণের আইন পরিবর্তন করা হয়েছিল। অন্যদিকে, ভুয়া ভোটার বানানো এবং নির্বাচন পরিচালনা ও ফলাফলকে প্রভাবিত করতে বিএনপি-জামায়াতের অনুগত ব্যক্তিদের বিভিন্ন পদে বসানো হয়েছিল।
২০০৮ সালের নভেম্বরে ঢাকাস্থ মার্কিন রাষ্ট্রদূত জেমস এফ মরিয়ার্টি তারেক রহমানের যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ নিষিদ্ধ করতে দেশটির “অভিবাসন ও জাতীয়তা” আইনের ধারা ২১২ এবং প্রেসিডেন্টের ঘোষণা ৭৭৫০-এর অধীনে নিরাপত্তা উপদেষ্টাদের মতামত চেয়েছিলেন। কয়েক ডজন সুনির্দিষ্ট অভিযোগের সঙ্গে তারেক রহমান সরসারি জড়িত উল্লেখ করে রাষ্ট্রদূত বলেন, “তারেকের ‘প্রকাশ্য দুর্নীতি' মার্কিন মিশনের নির্দিষ্ট লক্ষ্যকেও মারাত্মকভাবে হুমকির মুখে ফেলেছে।” তিনি বলেন, "বাংলাদেশের জন্য মার্কিন দূতাবাসের তিনটি প্রধান অগ্রাধিকার রয়েছে- গণতন্ত্রীকরণ, উন্নয়ন, এবং সন্ত্রাসীদের স্থান না দেওয়া। তারেকের দুর্নীতিমূলক কর্মকাণ্ড তিনটি বিষয়কেই বিপন্ন করে তুলেছে।”
জোট সরকারের আমলে ইন্টারনেট ও জনপ্রিয় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুক না থাকায় সে সময়কার অনেককিছুই এখন সহজলভ্য নয়। তবে অনলাইনে কিছু পত্রিকার ই-পেপার এখনও পাওয়া যায়। আওয়ামী লীগের ১৫ বছরে নিজেরা বিস্তর দুর্নীতি, অনিয়ম, সন্ত্রাস ও নির্বাচনে কারচুপি করলেও এসব বন্ধ না করে সারাবছর জোট সরকা্রের আমলে সংঘটিত বিভিন্ন ঘটনা উল্লেখ করলেও সেসব বক্তব্য তথ্যনির্ভর নয়, বরং রাজনৈতিক অতিরঞ্জন বলেই ধরে নেওয়া যায়। যেন জোট সরকার অন্যায় করলে আওয়ামী লীগও তাই করতে পারে। তবে এই সময়টা সংবাদমাধ্যম খুব সক্রিয় থাকায় অনেক বড় বড় দুর্নীতি অনিয়মের খবর জনগণ জানতে পেরেছে। ইতিহাস থেকে শিক্ষা না নেয়ায় আওয়ামী লীগও ধ্বংস হয়ে গেছে।
২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এসে মামলাগুলোর কার্যক্রম চালতে থাকে এবং কয়েকটি মামলায় তারেক রহমান ও তার সহযোগী গিয়াস উদ্দিন আল মামুনকে সাজাও দেওয়া হয়। এর মধ্যে জাতির পিতা শেখ মুজিবর রহমান ও তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে নিয়ে কটুক্তি করার জন্যও তার বিরুদ্ধে মামলা হয়। তিনিও তার বাবা শহিদ প্রেসিডেন্ট জেনারেল জিয়াউর রহমানকে স্বাধীনতার ঘোষক দাবি করে বিতর্কিত হন। বলা হয়, তারই পরামর্শে ২০১৪ সালের নির্বাচনে অংশ নেয়নি বিএনপি ও সমমনা জোট। এরপর আইনের চোখে তিনি সাজাপ্রাপ্ত ও পলাতক আসামী হওয়ায় ২০১৫ সালের ৭ জুন হাইকোর্ট এক আদেশে তারেক রহমানের বক্তব্য পত্রিকা, টিভি ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিষিদ্ধ ঘোষণা করেন। তথাপি লন্ডনে থেকেই এখন পর্যন্ত তারেক রহমান রাজনৈতিক কর্মকান্ডে পুরোপুরি যুক্ত হন এবং দলের চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়াসহ জৈষ্ঠ্য নেতাদের সাথে সিদ্ধান্তগ্রহণ প্রক্রিয়ায় ও জনসভায় ভিডিও কনফারেন্সিং-এর মাধ্যমে নিয়মিত অংশগ্রহণ করেন। তার বক্তব্য ফেসবুক ও ইউটিউবে দলের একাউন্ট থেকে প্রচারিত হয়। দলের নেতাকর্মীরা তার বক্তব্য নিজেদের মধ্যে আলোচনায় ও জনসভায় বারবার বলার ফলে সব মিডিয়াতেই আদতে তারেক রহমানের বক্তব্যই প্রচারিত হয়েছে। ২০১৮ সালের ফেব্রুয়ারিতে জাতীয় নির্বাচনের আগে দুটি দুর্নীতির মামলায় খালেদা জিয়া দন্ডপ্রাপ্ত হলে দলের নেতা-কর্মীরা সেটি প্রতিহত না করে বরং মিছিল করে তাকে সাবেক কেন্দ্রীয় কারাগারে প্রতিষ্ঠিত সাব-জেলে রেখে আসে; এর মাধ্যমে খালেদা জিয়ার ৩৪ বছরের নেতৃত্বের অবসান হয়। এই মামলাগুলোর দুর্বলতা থাকা সত্বেও দন্ডের বিরুদ্ধে শক্ত কোন আইনি ব্যবস্থা নেয়নি বিএনপি। রাজতন্ত্র বা পরিবারতন্ত্রের মতো দলের নেতৃত্বে আসীন হন তারেক রহমান। এরপর ২০২৪ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ে নানা ধরনের আন্দোলন কর্মসূচি নিয়ে মাঠে নামে দলটি, জোটবদ্ধ হয় নানান দল ও শ্রেনিপেশার মানুষ।
৭ জানুয়ারি নির্বাচনের আগে ও পরে এবং জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানেও তিনি নিয়মিত দিক-নির্দেশনা ও সাহস দিয়ে প্রেরণা যুগিয়েছেন এবং নিজের দলের সকল নেতা-কর্মীদেরকে আন্দোলনের সময় সক্রিয় করেছেন। ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হলে শান্তিতে নোবেল বিজয়ী অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক ড. ইউনূসের অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ৮ আগস্ট দায়িত্ব নেয়। কিন্তু তার আগেই, ৬ আগস্ট, রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়ার সাজা মওকুফ করে তাকে মুক্ত জীবন ফিরিয়ে দেন, মুক্তি পান গিয়াস উদ্দিন আল মামুন। রাজনৈতিক মামলায় বন্দি ও সাজাপ্রাপ্ত হাজার হাজার ব্যক্তি ও টপ টেরর মুক্তি পেলেও বিএনপি নেতা তারেক রহমান এখনও মামলার জটিলতা থেকে রেহাই পাননি এবং দেশে ফেরেননি। তবে দলের নির্বাচনমুখী কার্যক্রম জোরেশোরে চলছে এবং তারেক রহমান ভিডিও কলের মাধ্যমে নীতিনির্ধারনী সভা ও বিভিন্ন জেলার জনসভায় দিকনির্দেশনা দিচ্ছেন। ফলে এটি সহজেই অনুমেয় যে, তখন তিনিই হবেন দেশের প্রধানমন্ত্রী।
জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের কনিষ্ঠ অংশগ্রহণকারীরা অনেকেই শুধু আওয়ামী লীগ আমলটাই দেখেছে। অনেকেই ভাবছে, কীভাবে এত পুরনো বড় একটা দল আওয়ামী লীগের কবর রচনা হলো। ২০০৮ সালের পর অনুষ্ঠিত তিনটি সংসদ নির্বাচনেই আওয়ামী লীগ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিধানকে পাশ কাটিয়েছে ক্ষমতা হারাবার ভয়ে। দুর্নীতি অনিয়ম আর পেশীশক্তির ব্যবহারে শীর্ষপর্যায় থেকে তৃণমূল পর্যায়ের নেতাকর্মীরা অতীতে নিজেদের ও অন্যসব আমলের সকল রেকর্ড ভেঙেছে। বিশৃঙ্খলা, কোন্দল সন্ত্রাস চাঁদাবাজীতেও রেকর্ড করেছে তারা। জনগণকে উচ্চমূল্যে নিম্নমানের ও ভেজাল পণ্য ও সেবা নিতে বাধ্য করেছে। দেশের সংবিধান, দলের নীতি-আদর্শ, মুক্তিযুদ্ধের মূলনীতি, দেশের আইন-কানুন, ২০০৭-০৮ সালের সংস্কারের উদ্যোগ, সামাজিক রীতিনীতি সবকিছুকে দেখিয়ে আওয়ামী লীগ বুড়ো আঙুল দেখাতে পেরেছিল। এর কারণ, দলটি বিভিন্ন কৌশলে একটি জবাবদিহিতাহীন দায়মুক্তির অপসংস্কৃতি প্রতিষ্ঠা করতে করেছিল।
ফলে তিনটি নির্বাচনের আগে ও পরে দেশে বড় ধরনের রাজনৈতিক আন্দোলন হয়েছে; বিরোধীদলের কর্মীদের সক্রিয়তা দেখা গেছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। কিছু মিডিয়া কোনো কোনো ক্ষেত্রে পুরোপুরি পেশাদারিত্ব দেখাতে না পারলেও দুর্নীতি অনিয়মের খবর প্রকাশ করে সরকারের কাছে জবাবদিহিতা চেয়েছে এবং রাজপথের বিরোধী দল ও জনগণকে সচেতন করেছে। এছাড়া অরাজনৈতিক ও অহিংস জনসাধারণের মধ্যে ক্ষোভ ছিল সারাবছর। তারা রাস্তায় পুলিশকে মোকাবিলা করতে না পারলেও ফেসবুক, ব্লগ, পত্রিকায় লিখে, ভিডিও বানিয়ে বা টকশোতে কথা বলে আওয়ামী লীগ সরকারের অগণতান্ত্রিক আচরণের নিন্দা করেছে। দেশে-বিদেশে এতো সমালোচনা প্রতিবাদের পরেও জনসমর্থন ক্ষয়িষ্ণু জেনেও ২০২৪ সালের ৭ জানুয়ারি তৃতীয়বারের মতো ভুয়া নির্বাচন করে আওয়ামী লীগ নিজের কফিনে শেষ পেরেকটি ঠুকেছিল। আর সরকার টিকিয়ে রাখতে গিয়ে আগের মতোই নিপীড়ক মনোভাব প্রকাশ করে ৫ আগস্ট কবরে শায়িত হলো। আওয়ামী লীগের মতো এত বৃহৎ ও প্রভাবশালী রাজনৈতিক দলের এই চূড়ান্ত পতন আগামীতে বিএনপিসহ অন্যান্য প্রভাবশালী রাজনৈতিক দল এবং ভবিষ্যতের নতুন নেতৃত্বের জন্য একটি সাবধানবাণী হিসেবে কাজ করলে আমজনতা নিঃসন্দেহে একটি সুন্দর দেশ পাবে।



