Friday, June 05, 2026

সেকশন

English
Dhaka Tribune

রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্বপ্নপূরণে আরও একধাপ অগ্রগতি

এই কেন্দ্র থেকে বছরে প্রায় ১৯.৩৪ বিলিয়ন কিলোওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন হবে, যা ৬ কোটি মানুষের বার্ষিক চাহিদা পূরণে সক্ষম হবে

আপডেট : ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৩, ০৩:৪৪ পিএম

সম্প্রতি গ্রামের বাড়ি বেড়াতে গিয়েছিলেন সরকারি চাকরিজীবী সাবিয়া ইয়াসমিন। সেখানে লোডশেডিং নিয়ে অভিজ্ঞতার বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেন, ‘‘সকালে বাড়িতে পৌঁছে দেখি বিদ্যুৎ নেই। দিনের অনেকটা সময় বিদ্যুৎ থাকে না। যতদিন বাড়ি ছিলাম, ততদিন এই সমস্যার সম্মুখীন হয়েছি। শুনেছি আগামী বছর রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র চালু হবে। এখান থেকে বাড়তি  বিদ্যুৎ পাওয়া গেলে পরিস্থিতির উন্নতি হবে আশা করছি।’’

সাবিয়ার মতো এ পরিস্থিতির সম্মুখীন হন অনেকেই। গ্রীষ্মকাল এলেই বেড়ে যায় বিদ্যুতের চাহিদা, বাড়ে লোডশেডিং। পাশাপাশি প্রায় প্রতি বছর গ্রাহক পর্যায়ে বাড়ে বিদ্যুতের দাম। সরকার ও জনগণ উভয়ই অস্বস্তিতে থাকে এই ইস্যু নিয়ে। সরকার ক্ষমতায় আসার পর বিদ্যুৎ উৎপাদন পাঁচগুণ বাড়লেও পাল্লা দিয়ে কয়েক গুণ বেড়েছে বিদ্যুতের চাহিদা।

আশার কথা হলো, ২০২৪ সালে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র চালু হলে দেশের বিদ্যুৎ ঘাটতি ও মূল্য উভয়ই কমতে পারে। 

অর্থনীতিবিদ ড. মাসরুর রিয়াজের মতে, ‘‘দেশের আর্থসামাজিক উন্নয়নের জন্য বিদ্যুৎ অপরিহার্য। দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে প্রথমেই প্রয়োজন পর্যাপ্ত ও নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ সরবরাহ। দেশের সব মানুষের কাছে এবং বিভিন্ন অর্থনৈতিক সেক্টরে বিদ্যুৎ পৌঁছে দেওয়া বর্তমান সরকারের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য। এই কেন্দ্র বিদ্যুৎ উৎপাদনে নিশ্চয়তা দিতে যাচ্ছে, প্রকারান্তে দেশে বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি করছে। এছাড়া ১২ বিলিয়ন ডলারের এই প্রকল্প থেকে ৬০ বছরে ফেরত আসবে প্রায় ৬৬ বিলিয়ন ৭৭৪ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। এছাড়াও ৬০ বছর পরও আপগ্রেড করে প্রকল্পটি চালানো যাবে। বিশ্ব পরিস্থিতিতে আমদানিনির্ভর জ্বালানি থেকে তৈরি বিদ্যুতের অনিশ্চয়তার ঝুঁকি কাটবে।’’

জাতীয় সংসদের অনুমিত হিসাব সম্পর্কিত কমিটির সভাপতি মো. আব্দুস শহীদ বলেন, ‘‘প্রকল্পের কাজ সমাপ্ত হলে দেশের বিদ্যুৎ ঘাটতি অনেকাংশে কমে যাবে, মানুষ পর্যাপ্ত বিদ্যুৎ পাবে। রূপপুরের সফল বাস্তবায়ন হলে আরও একাধিক পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের কথা ভাবতে পারে সরকার।’’

তিনি আরও বলেন, ‘‘প্রকল্পের কাজ সন্তোষজনক, কোভিডও এই মহাপ্রকল্পের কাজের অগ্রগতিতে খুব বেশি বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারেনি। মুক্তিযুদ্ধে আমাদের পাশে দাঁড়ানো বন্ধুরাষ্ট্র রাশিয়া এই প্রকল্পটিকে চুক্তি মোতাবেক সমাপ্তির দিকে নিয়ে যাচ্ছে।’’

অক্টোবরেই বাংলাদেশ পারমাণবিক জ্বালানি (ইউরেনিয়াম) আনতে সক্ষম হবে বলে জানিয়েছেন রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্প কর্তৃপক্ষ। ইউরেনিয়াম আসা ও সংরক্ষণ সম্পন্ন হলে বাংলাদেশ বিশ্বের নিউক্লিয়ার ক্লাবে পদার্পণ করবে। ২০২৪ সালে পরমাণু থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য রূপপুর নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্ল্যান্টে এখন মহাকর্মযজ্ঞ চলছে। আর এজন্য অক্টোবরেই পারমাণবিক জ্বালানি বা ইউরেনিয়াম আসছে দেশে। আগামী জুনের মধ্যে আনুষঙ্গিক সকল কাজ শেষ করার কথা জানিয়েছেন প্রকল্প পরিচালক ড. শৌকত আকবর।

তিনি বলেন, ‘‘রুশ অর্থায়নে ভিভিইআর ১,২০০ টাইপের দুটি তৃতীয় প্রজন্মের রিয়্যাক্টর শত বছর ধরে নিরাপদেই অপেক্ষাকৃত কম দামে বিদ্যুৎ দেবে বাংলাদেশকে। একই সঙ্গে দেশও উন্নীত হবে প্রযুক্তি ব্যবহারের নতুন স্তরে।’’

ড. শৌকত বলেন, ‘‘সব পরিস্থিতি বিবেচনা করে আমরা ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরের মধ্যে রিয়্যাক্টরের স্টার্টআপ শুরু করব।’’

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রী স্থপতি ড. ইয়াফেস ওসমান বলেন, বাংলাদেশ ৩৩তম দেশ; যারা নিউক্লিয়ার দিয়ে বিদ্যুৎ তৈরি করতে যাচ্ছে। রূপপুর বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে বিশ্বের কাছে বাংলাদেশের মর্যাদা বেড়ে যাবে। বিশ্বে আমাদের দেশের অবস্থান বদলে যাবে। বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু হলে রূপপুর বিদ্যুৎকেন্দ্র বাংলাদেশকে একটা অনন্য মর্যাদায় নিয়ে যাবে।

প্রকল্পের অগ্রগতি নিয়ে খুশি বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ। বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের সার্বিক অগ্রগতি সন্তোষজনক উল্লেখ করে প্রতিমন্ত্রী বলেন, উন্নত, সমৃদ্ধ ও স্মার্ট বাংলাদেশ নির্মাণে সাশ্রয়ী মূল্যে ক্লিন এনার্জির রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র দারুণ ভূমিকা রাখবে। কেন্দ্রের প্রথম ইউনিটের কাজের ৮৭ ভাগ অগ্রগতি হয়েছে। 

তিনি বলেন, ‘‘এ মেগা প্রকল্পের স্বপ্নটি ছিল বঙ্গবন্ধুর, বাস্তবায়ন করছেন তাঁরই নির্ভীক কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। বিশ্বের সর্বাধুনিক প্রযুক্তির এই নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্ল্যান্ট বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাতকে নিয়ে যাবে অনন্য উচ্চতায়। তিনি জানান, ২০২৪ সাল থেকে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ইউনিট থেকে জাতীয় গ্রিডে ১২শ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ যোগ হবে।’’

এই কেন্দ্র থেকে বছরে প্রায় ১৯.৩৪ বিলিয়ন কিলোওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন হবে, যা ৬ কোটি মানুষের বার্ষিক চাহিদা পূরণে সক্ষম হবে। উৎপাদন খরচ হবে প্রতি ইউনিট সর্বনিম্ন ৪.৩৮ টাকা, যেখানে প্রচলিত গ্যাস বা ডিজেলচালিত কেন্দ্রে ক্ষেত্রবিশেষে খরচ কয়েক গুণ বেশি। অন্যান্য বিদ্যুৎকেন্দ্রের গড় আয়ু যেখানে ১৫-২০ বছর, সেখানে রাশিয়ার তৈরি করা কেন্দ্রের আয়ু হবে ৬০-৮০ বছর। 

দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় একক প্রকল্প রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র। এতে খরচ হচ্ছে প্রায় ১ লাখ ১৪ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে সরকার দিচ্ছে ২২ হাজার ৫২ কোটি ৯১ লাখ ২৭ হাজার আর রাশিয়া থেকে ঋণসহায়তা হিসাবে আসছে ৯১ হাজার ৪০ কোটি টাকা।

সরকারের উন্নয়ন কার্যক্রমকে অনেকেই নেতিবাচকভাবে দেখেন। 

এক সময় বলা হয়েছিল বাংলাদেশের অর্থনীতি শ্রীলঙ্কার মতো হবে। তবে বেসরকারি চাকরিজীবী মাহবুবুল আলম অনেকটাই আশাবাদী। 

তিনি বলেন, ‘‘পদ্মা সেতু, মেট্রোরেল, কর্ণফুলী টানেল, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র, মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দরসহ বড়ো প্রকল্পগুলোর উদ্বোধনের আনন্দকে ম্লান করে দেওয়ার জন্য অর্থনীতি ধসে যাওয়ার ভয় দেখানো আজগুবি। পদ্মা সেতু, মেট্রোরেল, কর্ণফুলী টানেল, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র, মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর একেকটি রূপকথা। রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র দেশের বিদ্যুৎ খাতের উন্নয়নে একটি মাইলফলক হয়ে থাকবে এমনটাই প্রত্যাশা সর্বসাধারণের।’’

মো. হাবিবুল আলম, ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক
প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্ত ব্যক্তিগত। ঢাকা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ এর জন্য দায়ী নয়।
   

About

Popular Links

x