Friday, June 14, 2024

সেকশন

English
Dhaka Tribune

গর্বের বহুমুখী পদ্মা সেতু সবার

এমন অর্জনক্ষণেও আমরা রাজনৈতিক বিভেদের খপ্পড়ে! ক্ষমতাসীনরা ব্যস্ত উল্লাসে। আরেক পক্ষ নিরব। একাত্ম না হয়ে বিভেদে টুকরো টুকরো হওয়াই যেন আমাদের নিয়তি

আপডেট : ২৫ জুন ২০২২, ১১:৫৫ এএম


পদ্মাকে টের পেয়েছি স্রোতের তীব্রতায়। বরিশালের লঞ্চ সদরঘাট থেকে ছাড়ে সন্ধ্যা ৭টা, ৮টার দিকে। নদীযাত্রা দারুণ। কিন্তু বুড়িগঙ্গাকে কি আর নদী বলা যায়? দুর্গন্ধ আর কালচে পানি মন খারাপ করায়। এরপর লঞ্চ পাড়ি দেয় শীতলক্ষ্যা। পুরোপুরি দূষণহীন না হলেও ভালোই লাগে তীরের নারায়ণগঞ্জ দেখতে।

রাত ১০টার দিকে আসে সেই ক্ষণ। লঞ্চের দুলুনিই যেন বলে দেয় নদীর নাম। এমনি এমনি তো আর পদ্মাকে ‘‘প্রমত্তা’’ ডাকা হয় না। যাত্রার সুবর্ণক্ষণ তখন। তীরের হদিস নেই। চাঁদপুরের মোহনায় ঢেউ দোলা স্রোতময়তায় জেলেদের ডিঙি নৌকার দেখা মেলে। ‘‘কুবের মাঝিরা’’ শত শত বছর ধরে এভাবেই মাছ ধরে আসছেন। লঞ্চের সামনেটায় দাঁড়ালে এ সময় বাতাস আর বাতাস।

এ তো গেল লঞ্চে থেকে পদ্মা দেখা। সড়কপথের পদ্মা পাড়ি মানেই যেন দুঃসহ ভোগান্তি। রুট আরিচা অথবা মাওয়া যা-ই হোক। ফেরির জন্য দীর্ঘ লাইন। আবার প্রায়ই ফেরিঘাটের স্থান বদলায়। তখন বাস থেকে নেমে যাত্রীদের হাঁটতে হয় বহু পথ। নারী, শিশুদের অবর্ণনীয় দুর্ভোগ। শীতকালে দক্ষিণ বাংলামুখী হতে হলে ভাবতে হয় কুয়াশার কথা। কুয়াশায় ফেরির দেরি নিত্য সেসময়। আবার চরে আটকেও বহু সময় দেরি বাধায় ফেরি।

৫৬ হাজার বর্গমাইলের দেশে দক্ষিণ বাংলা দুর্গম হয়ে থেকেছে হাজার বছর। আজকের দিন মুছে দিচ্ছে সেই সব খারাপ স্মৃতি। পদ্মা বহুমুখী সেতুর উদ্বোধনে ঘুঁচলো ব্যবধান।

কিন্তু হায়, জাতির এমন অর্জনক্ষণেও আমরা রাজনৈতিক বিভেদের খপ্পড়ে! ক্ষমতাসীনরা ব্যস্ত উল্লাসে। আরেক পক্ষ নিরব। একাত্ম না হয়ে বিভেদে টুকরো টুকরো হওয়াই যেন আমাদের নিয়তি।

বিশ্বব্যাংকের মতো উন্নয়ন সংস্থা অর্থায়ন থেকে সরে আসার পর এ সেতুটির নির্মিত হয়েছে দেশের জনগণের অর্থে। এ নির্মাণের ইচ্ছা ও জেদের অবশ্যই ধন্যবাদ পাবেন সরকারপ্রধান। জেদ থেকে এমন ভালো কিছু হলে তো ভালোই। যদিও অবকাঠামো উন্নয়ন একটি রুটিন ওয়ার্ক।  

প্রধানমন্ত্রী ধন্যবাদ পাবেন আরও কারণে। তিনি উসকানি স্বত্ত্বেও উন্নয়ন সহযোগী প্রতিষ্ঠান বিশ্বব্যাংককে পদ্মা বহুমুখী সেতু প্রকল্প থেকে বেরিয়ে যাওয়ার জন্য সরাসরি অভিযুক্ত করেননি। প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে লড়াইয়ে যাওয়ার ঘোষণাও দেননি। কারণ সেতুতে না হলেও বিশ্বব্যাংকের ঋণ সহায়তা দেশের অন্য অনেক প্রকল্পে ঠিকই নেওয়া হচ্ছে। এ ঋণে উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে বাংলাদেশেরও অধিকার আছে। তিনি স্পষ্ট করেছেন এটি।

ধারণা করা হচ্ছে, পদ্মা বহুমুখী সেতু জাতিয় জিডিপিতে ১.২৩% অংশ যোগ করবে। শুধু দক্ষিণ পশ্চিম অঞ্চলের জিডিপিতে এটি ২.৩% অবদান রাখবে। এ সেতুর কারণের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে দারিদ্র দূর হবে ০.৮৪%। এ বহুমুখী প্রকল্প ক্রমান্বয়ে সিলেটের তামাবিল-ঢাকা হয়ে যুক্ত হবে এশিয়ান হাইওয়েতে।

২০০৭ সালের প্রস্তাবনায় ৫.৫৮ দৈর্ঘ্যের এ সেতুর নির্মাণে খরচ ধারনা করা হয় ১০.১৬১ কোটি টাকা। ২০১১ সালে সেতুর দৈর্ঘ্য নির্ধারিত হয় ৬.১৫ কিলোমিটার। তখন বাজেট দাঁড়ায় ২০.৫০৭ কোটিতে। ২০১৫ সালে সেতু নির্মাণের বাজেট দাঁড়ায় ৩০,১৯৩ কোটি টাকায়।

অনেকে এ প্রসঙ্গে বলছেন, এমন মেগা প্রকল্পে কত খরচ হয়েছে সেগুলোর একটা বিশদ হিসাব নিয়ে শ্বেতপত্র অফিসিয়ালি প্রকাশ করলে ভালো। ফেলে দেওয়া যায় না এমন প্রস্তাব।

আর “নিজস্ব অর্থায়ন” শব্দের ব্যাখ্যা খুব সহজ। কোনটা “নিজস্ব অর্থায়ন” নয়? বিশ্বব্যাংকের মতো সংস্থার কাছ থেকে ঋণ নিয়ে কোনো প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হলে তাকে কি “অন্যের অর্থায়ন” বলব? সেই ঋণ কি সুদাসলে পরিশোধ করতে হয়। তা অন্যের অর্থ হিসেবে আখ্যায়িত করা ঠিক হয় না।

সংবাদমাধ্যম মাফিক জানা যায়, “সড়ক ও জনপথ (সওজ) অধিদপ্তরের হিসাবে, তেঁতুলিয়া থেকে কুয়াকাটার দূরত্ব ৮০০ কিলোমিটারের কাছাকাছি। ঢাকা হয়ে পদ্মা নদীর ওপর দিয়ে এই পথ যেতে এক সময় আটটি ফেরি পাড়ি দিতে হয়েছে। যমুনা নদীতে বঙ্গবন্ধু সেতু চালু হওয়ার আগে ফেরি ছিল নয়টি। আগামীকাল শনিবারের পর কেউ তেঁতুলিয়া থেকে এই পথে যাত্রা করলে কোনো ফেরিই পাড়ি দিতে হবে না।”

প্রধানমন্ত্রী এ নির্মাণের জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে গেছেন প্রয়াত অধ্যাপক ড. জামিলুর রেজা চৌধুরীর প্রতি। তিনি বলেছেন, “বিশ্বব্যাংকসহ অনেক বড় বড় ব্যক্তি পিছু হটলেও তারা (জে আর চৌধুরীর মতো বাংলাদেশি প্রকৌশলী) হাল ছেড়ে দেননি। বরং তারা সাহস দেখিয়েছেন।”

দেশের প্রকৌশলীদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি অবকাঠামো ব্যবস্থার বদলে প্রধান ভূমিকা পালন করা অধ্যাপক জামিলুর রেজা চৌধুরী ২০২০ সালের ২৮ এপ্রিল ৭৬ বছর বয়সে মারা যান। 

এই মানুষটি সম্পর্কে অনেকে বলে থাকেন, “বাংলাদেশে কার্যত কোনো গুরুত্বপূর্ণ উন্নয়ন প্রকল্প অধ্যাপক চৌধুরীর সম্পৃক্ততা ছাড়া বাস্তবায়িত হয়নি। তিনি এক্সপ্রেসওয়ে, সেতু, উঁচু ভবন, শিল্প ভবন, ট্রান্সমিশন টাওয়ার, এয়ারক্রাফট হ্যাঙ্গার, স্টেডিয়াম, বন্দর ও জেটি, সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কম্পিউটারাইজেশন ইত্যাদি সংক্রান্ত প্রকল্পে বিপুল সংখ্যক জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সংস্থার বিশেষজ্ঞ পরামর্শক হিসেবে কাজ করেছেন।”

পদ্মা বহুমুখী সেতুর শুধু যান চলাচলের জন্য নয়। এর স্প্যানের ভেতর দিয়ে চলবে ট্রেন। 

সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, “এজন্য বসানো হয়েছে রেলওয়ে স্ল্যাব। তবে রেল লাইন এখনও বসানো হয়নি। পদ্মা সেতু ও পদ্মা সেতু রেল সংযোগ প্রকল্পের কর্মকর্তারা বলছেন, আগামী জুলাই থেকে রেললাইন বসানোর কাজ শুরু হতে পারে, যা শেষ করতে সময় লাগবে ছয় মাস। তবে ঢাকা থেকে পদ্মা সেতু হয়ে যশোর পর্যন্ত রেল যোগাযোগ শুরু করতে অপেক্ষা করতে হবে ২০২৪ সালের জুন পর্যন্ত।”

সংবাদমাধ্যমে আরও খবর পাই, “প্রকল্পের মূল কাঠামো নির্মাণে প্রায় ৯২ হাজার টন ইস্পাত ব্যবহার করা হয়েছে। দেশীয় প্রতিষ্ঠানই বেশিরভাগ ইস্পাত সরবরাহ করেছে। এর মধ্যে বিএসআরএমই শুধু ৮৮ হাজার টন ইস্পাত সরবরাহ করেছে, যা মোট ইস্পাতের ৯৬ শতাংশ। পদ্মা সেতুর মূল কাঠামোতে প্রায় আড়াই লাখ টন সিমেন্ট ব্যবহার করা হয় এবং সবগুলোই অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে এসেছে। স্ক্যান সিমেন্ট একাই প্রায় ২ লাখ ২৫ হাজার টন সিমেন্ট সরবরাহ করেছে। বসুন্ধরা সিমেন্ট, ক্রাউন সিমেন্ট, আবুল খায়ের গ্রুপের শাহ সিমেন্ট এবং সেভেন সার্কেল গ্রুপের সেভেন রিংস সিমেন্টও সেতুর বিভিন্ন নির্মাণের কাজে সিমেন্ট সরবরাহ করেছে। দেশের সবচেয়ে বড় ক্যাবল প্রস্তুতকারী সংস্থা বিআরবি ক্যাবল ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড এই প্রকল্পে ব্যবহৃত বিভিন্ন ধরনের ক্যাবল সরবরাহ করেছে। পদ্মা সেতুতে স্থানীয়ভাবে তৈরি পাইপও ব্যবহার করা হয়েছে। আরএফএল গ্রুপ উচ্চ ঘনত্বের পলিইথিলিন এবং পিভিসি ক্যাবল ডাক্টিং পাইপ এবং জিঙ্ক আবৃত ডব্লিউ-বিম গার্ডরেল সরবরাহ করেছে।”

তবে পদ্মা সেতুতে বাঙালির বীরত্বের জয়গীতির সঙ্গে অন্যদের অবদানও যেন ভুলে যাওয়া না হয়। কারণ, পদ্মা সেতুতে জড়িয়ে আছেন বহু মানুষের অবদান। 

সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, “পদ্মা সেতু প্রকল্পের কাজে ২০টি দেশের মানুষের মেধা জড়িয়ে আছে। দেশগুলো হচ্ছে—যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা, জার্মানি, অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড, নেদারল্যান্ডস, চীন, সিঙ্গাপুর, জাপান, ডেনমার্ক, ইতালি, মালয়েশিয়া, কলম্বিয়া, ফিলিপাইন, ভারত, তাইওয়ান, নেপাল, দক্ষিণ আফ্রিকা ও বাংলাদেশ। ব্রিটিশ নাগরিক রবিন শ্যামের নেতৃত্বে পদ্মা সেতুর বিশদ নকশা করা হয় হংকংয়ে। নকশা প্রণয়নে ব্যবস্থাপক ছিলেন অস্ট্রেলিয়ার কেন হুইটলার। এর নির্মাণকাজের তদারকির নেতৃত্ব দেন নিউজিল্যান্ডের নাগরিক রবার্ট জন এভস। আর নদীশাসনের নকশা প্রণয়নে ছিলেন কানাডার ব্রুস ওয়ালেস। এ কাজে আরও ছিলেন জার্মানি ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রকৌশলীরাও। পদ্মা বহুমুখী সেতু প্রকল্প বাস্তবায়নে সরাসরি যুক্ত ছিলেন আরও বহু মানুষ। এর মধ্যে সংবাদে জানা যায়, প্রকল্প পরিচালকসহ বড় পদে ছিলেন ৩২ জন। তাদের মধ্যে মো. শফিকুল ইসলাম সড়ক ও জনপদের (সওজ) অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী পদে থাকাকালে ২০১১ সালে পদ্মা সেতু প্রকল্পের পরিচালক হন। তার অধীনে ঠিকাদার নিয়োগ ও নির্মাণকাজ বাস্তবায়িত হয়। প্রকল্পের উপপরিচালক হিসেবে দীর্ঘদিন দায়িত্বে রয়েছেন সওজের সাবেক অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী মো. কামরুজ্জামান।”

পদ্মা সেতুতে প্রায় ১০টি দেশের ৫০টিরও বেশি বিপুল উপকরণ ব্যবহৃত হয়েছে। বাংলাদেশের বাইরে পদ্মা সেতু প্রকল্পে সবচেয়ে বেশি উপকরণ চীন, যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়া, সিঙ্গাপুর, লুক্সেমবার্গ, সংযুক্ত আরব আমিরাত, ভারত, মালয়েশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্র থেকে কেনা হয়েছে।

মূল সেতু নির্মাণে ২ লাখ ৮৯ হাজার টন স্টিলের প্লেট লেগেছে, যার পুরোটাই এসেছে চীন থেকে। এটি নির্মাণে বিশ্বের সবচেয়ে বড় ক্রেন ব্যবহার করা হয়েছে। পিলারের ওপর স্প্যান বসাতে যে ক্রেনটি ব্যবহৃত হয়েছে তা আসে আসে চীন থেকে। প্রতি মাসে এর ভাড়া বাবদ গুনতে হয় ৩০ লাখ টাকা। ক্রেনটি বাংলাদেশে থাকে প্রায় সাড়ে তিন বছর। এজন্য মোট খরচ হয় ১২ কোটি ৬০ লাখ টাকা। বিশ্বে প্রথম কোনো সেতু তৈরিতে এত দীর্ঘদিন ক্রেনটি ভাড়ায় থেকেছে। এর ক্রেনটির দাম প্রায় দুই হাজার ৫০০ কোটি টাকা।

জাতির গর্বের এমন অর্জন সবার। পদ্মার দুকূল মিলে অনাগত সম্ভাবনার প্রহরে আমরা যেন তা ভুলে না যাই।


লেখক, ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক ও স্বাধীন চলচ্চিত্র নির্মাতা হাসান শাওনের জন্ম, বেড়ে ওঠা রাজধানীর মিরপুরে। পড়াশোনা করেছেন মনিপুর উচ্চ বিদ্যালয়, সরকারি বাঙলা কলেজ, বাংলাদেশ সিনেমা ও টেলিভিশন ইনস্টিটিউটে। ২০০৫ সাল থেকে তিনি লেখালেখি ও সাংবাদিকতার সঙ্গে যুক্ত। কাজ করেছেন সমকাল, বণিক বার্তা, ক্যানভাস ম্যাগাজিন ও আজকের পত্রিকায়।

২০২০ সালের ১৩ নভেম্বর হাসান শাওনের প্রথম বই “হুমায়ূনকে নিয়ে” প্রকাশিত হয়।


About

Popular Links