Thursday, June 04, 2026

সেকশন

English
Dhaka Tribune

রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ: যুক্তরাষ্ট্র যেভাবে লাঠি না ভেঙে সাপ মারলো

পরিকল্পনা অনুসারে যুক্তরাষ্ট্র কমেডিয়ান জেলেনস্কির ইউক্রেনকে অস্ত্র-রসদ সাহায্য দিয়ে  এবং অস্ত্র বিক্রি করে লেলিয়ে দিল তাদেরই রুশ ভাইদের বিরুদ্ধে

আপডেট : ১৭ আগস্ট ২০২২, ০৫:২৪ পিএম

প্রায় দুই দশক পর রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের বদৌলতে মার্কিন ডলার আর ইউরোর মান সমান হয়েছে। বিষয়টা ব্যাখার দাবি রাখে। করোনাভাইরাসের ধাক্কা সামলে ওঠার আগেই শুরু হয় রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ। ফলে দ্বিতীয় অর্থনৈতিক ধাক্কা খেতে হয় বিশ্বকে। বিশেষ করে জ্বালানি আমদানি-নির্ভর ইউরোপকে।

ইউরোপজুড়ে রেকর্ড মুদ্রাস্ফীতি এবং বিশ্ব বাজারে জ্বালানির উচ্চমূল্য ইউরোর ক্ষমতা হ্রাস করেছে বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা। প্রায় পুরো ইউরোপই রাশিয়ার গ্যাস ও তেলের ওপর নির্ভরশীল। 

অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের পরিশোধিত জ্বালানির বিশাল মজুত থাকায় রাশিয়া ইউরোপে জ্বালানি সরবরাহ কমিয়ে দিলেও তার প্রভাব যুক্তরাষ্ট্রে পড়েনি; পড়েছে ইউরোপের অর্থনীতিতে।

যুক্তরাষ্ট্রের নানা ধরনের নিষেধাজ্ঞার ফলে বিশ্ব বাজারে রাশিয়ার তেল সরবারাহ কমে যায়। ফলে ডিমান্ড সাপ্লাই ইলাস্টিসিটির ভিত্তিতে ৩০ থেকে ২৫০% দাম বেড়েছে  জ্বালানির। এর প্রভাবে দেশে দেশে বিদ্যুৎ-বিভ্রাট প্রকট আকার ধারণ করেছে। বাংলাদেশেও এর প্রভাব পড়েছে। আমাদের বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রধান জ্বালানি এলএনজির দাম যেখানে আগে ছিল ইউনিট প্রতি গড়ে ১০ ডলার, আর যুদ্ধের প্রভাবে তা ৩৮ ডলার ছাড়িয়েছে। তাছাড়া ডিজেলের দাম ২৮%, কয়লার দাম ৬১% এবং ফার্নেস অয়েলের দাম ৫২% বেড়েছে। 

জ্বালানির দাম বাড়ায় ইউরোভুক্ত অঞ্চলে রেকর্ড ৮.৬% মূল্যস্ফীতি হয়েছে জুনে। অর্থনীতিবিদরা আশঙ্কা করেছেন, ইউরো জোন মন্দাগ্রস্ত হয়ে পড়তে শুরু করেছে। পরিস্থিতি যা দাঁড়িয়েছে তাতে মার্কিন ডলার বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী মুদ্রা হয়ে দাঁড়াচ্ছে। তবে ইউরোর এই ডলারের বিপরীতে মূল্য হারানোর আরও কিছু কারণ আছে। 

প্রথমত, মার্কিন প্ররোচনায় পড়ে ইউরোপও রাশিয়ার ওপর অবরোধে শরিক হয়েছে। ফলে রাশিয়া ইউরো জোনের দেশগুলোকে বাধ্য করেছে রুবলে মূল্য পরিশোধ করতে। ইইউ এখন রুবলে রাশান গ্যাস কিনছে, গোপনে বা প্রকাশ্যে। এতে করে, রাশিয়ার ওপর আরোপিত অবরোধ শাপে বর হয়েছে তাদের জন্য; রাশান রুবল অনেকটা শক্তিশালী হয়েছে ইতোমধ্যেই। 

দ্বিতীয়ত, মার্কিন ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক ইন্টারেস্ট রেট কয়েক দফা বাড়িয়ে সর্বোচ্চ ৯.১% করে দিয়েছে। এতে বিনিয়োগের ওপর প্রবৃদ্ধি গতি পেয়েছে। ব্যাংকিং এর ভাষা বলছে, এই সুদের হার যদি ইউরোপীয় সেন্ট্রাল ব্যাংকের চেয়ে বেশি হয় তবে ইউরো অর্থনীতির থোক বিনিয়োগকারীরা মার্কিন মুলুকে বিনিয়োগ স্থানান্তর করবে। এনং এটাই স্বাভাবিক। সেই বিনিয়োগকারীরা ইউরো বিক্রি করে ডলার কিনে তাদের হোল্ডিং বাড়াবে, এতে ইউরো আরও দুর্বল হয়ে যাবে। বাস্তবে হচ্ছেও তাই। এ সুযোগে  ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক চাচ্ছে দুই মুদ্রার ব্যবধান যাতে আরও বাড়ানো যায়।

ডলারের মূল্য শক্তিশালী হলে মার্কিনীরা সস্তা মূল্যে আমদানি পণ্য ব্যবহার করতে পারবে, অন্যদিকে ইউরোর দরপতন হলে ইউরোপীয় রপ্তানিকারকরা লাভবান হবে। কিন্তু ইউরোপীয় আমদানিকারকরা প্রবল ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তাদের আগের চেয়ে চড়া দামে পণ্য আমদানি করতে হবে। 

২.

শিনজো আবের নেতৃত্বে জাপান যেমন নিজের মেরুদণ্ড খাড়া করে দাঁড়াতে শুরু করেছিল তেমনি ইউরোপও গত এক দশক ধরে নিজেদের হারানো রেনেসাঁকে পুনরুজ্জীবিত করতে চাচ্ছিল। আমেরিকার বলয় থেকে কিছুটা বেরিয়ে নিজেদের ইচ্ছামতো চলতে চাচ্ছিল। কিছুদিন আগে AUKUS জোটের গঠন এবং ফ্রান্সের তীব্র প্রতিক্রিয়া সেই ইঙ্গিত দিয়েছিল। সার্বিক বিবেচনায় মনে হচ্ছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র  ইন্দো প্যাসিফিক, চীন, মধ্যপ্রাচ্য এবং ইউরোপকে যেন একই সঙ্গে সামলাতে হিমশিম খেয়ে যাচ্ছিল। চীনের অর্থনৈতিক-সামরিকভাবে উত্থান এবং রাশিয়ার শক্তি সামর্থ্য ফিরে পাওয়ার চেষ্টা দেখে মনে হচ্ছিল, যেন স্নায়ুযুদ্ধ পরবর্তী মার্কিন নেতৃত্বাধীন ইউনিপোলার বিশ্বব্যবস্থা থেকে মাল্টিপোলার বিশ্বব্যবস্থার দিকে ধাবিত হচ্ছে।

এমতাবস্থায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম করণীয় ছিল নিজেদের ঘর সামলানো তথা পুরানো মিত্রদের নিজের পকেটে পুরে রাখা। এরই সুবর্ণ সুযোগ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের হাতে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ একটা তুরুপের তাস ধরিয়ে দিল। আর সেটিকে ব্যবহার করে মার্কিনিরা তাদের পুরানো মিত্র ইউরোপকে কৌশলে বিশ্ব ব্যবস্থার “ক্ষমতার ভারসাম্য” পাল্লায় নিজেদের বলয়ে রাখতে দাবার চাল চেলে দিল। পরিকল্পনা অনুসারে তারা কমেডিয়ান জেলেনস্কির ইউক্রেনকে অস্ত্র-রসদ সাহায্য দিয়ে  এবং অস্ত্র বিক্রি করে লেলিয়ে দিল তাদেরই রুশ ভাইদের বিরুদ্ধে। সঙ্গে রাশিয়াকে ১০ হাজারের বেশি অবরোধ চাপিয়ে দিল তারা। আবার এতে রাশিয়া রুষ্ট হয়ে ইউরোপে তেল বিক্রি কমিয়ে দিল। ইউরোপ পড়ল বিপদে। শক্তিশালী ইউরো হয়ে গেল দুর্বল। 

একটা চমৎকার ডোমিনো ইফেক্টের লুপহোল বানিয়ে আমেরিকা একই সঙ্গে   নিজেদের অর্থোডক্স খ্রিষ্টান প্রতিদ্বন্দ্বী রাশিয়াকে দমন করতে চেষ্টা করল এবং কিঞ্চিত অবাধ্য মিত্র ইউরোপকে বুঝিয়ে দিল যে আমেরিকা ও ন্যাটো ছাড়া তোমরা রাশিয়ার কাছে অসহায়, ভঙ্গুর ও অনিরাপদ। যুক্তরাষ্ট্র লাঠি না ভেঙেই সাপ মারলো!


জাহিদ আল আসাদ, বিসিএস সাধারণ শিক্ষা ক্যাডারে সুপারিশপ্রাপ্ত


প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্ত ব্যক্তিগত। ঢাকা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ এর জন্য দায়ী নয়।

   

About

Popular Links

x