Friday, June 05, 2026

সেকশন

English
Dhaka Tribune

পুরোনো সে ট্যাংকের কথা

ব্রিটিশ আমলে এই ওয়াটার ওয়ার্কস স্থাপন করা হয়েছিল তৎকালীন সাতক্ষীরায় পানি সরবরাহের জন্য। পাশের সুগভীর দীঘি থেকে পানি তোলা হতো একটি ট্যাংকে

আপডেট : ২৮ মে ২০২৩, ০৩:৫১ পিএম

হলফ করে বলতে পারি, ইতিহাস-ঐতিহ্য নিয়ে আমার আগ্রহ এবং ভালোবাসা শৈশব থেকে। কোথাও বেড়াতে গিয়ে পুরোনো বিল্ডিং দেখে থমকে দাঁড়ানো, বিখ্যাত ব্যক্তিদের জীবনী সম্পর্কে আগ্রহ সেই সামাজিক বিজ্ঞানের ইতিহাস অধ্যায় পড়ার শুরুর সময় থেকে। সেই আগ্রহ ডালপালা ছড়িয়ে বিস্তৃত হতে না পারলেও মরে যায়নি। আজও সেই ভাঙা দেয়াল, পোড়োবাড়ি, ক্ষয়ে যাওয়া ইতিহাসের সাক্ষীরা আমাকে টানে প্রবলভাবে।

এর আগে ইচ্ছে থাকা সত্ত্বেও কোনো ঐতিহাসিক স্থাপনা বা প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন নিয়ে বিস্তারিত কাজ করা হয়নি। বিস্তারিত দূর, লেখাই হয়নি কখনো। আজকের লেখাটি একটি স্মৃতিকথন। তথ্যবহুল প্রতিবেদন লিখতে যে পরিমাণ গবেষণা, তথ্য ও সময়ের প্রয়োজন- বর্তমান বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে আমার তা নেই।

সম্প্রতি একটা কাজে সাতক্ষীরায় গেলে বিকেলে সেখানকার প্রেসক্লাবে যাই। গেট দিয়ে ঢোকার আগেই চোখ আটকে যায় দুটি ফলকে। যার লেখা এখনও সহজপাঠ্য হওয়ায় ছবি সংযুক্ত করে দিলাম-

বাঁ দিকের ফলকের লেখা বাংলায় অনুবাদ করলে দাঁড়ায়-

প্রেসক্লাবের গেটে বাঁ দিকের ফলক/ঢাকা ট্রিবিউন

১৯১৯ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর তৎকালীন প্রেসিডেন্সি ডিভিশনের কমিশনার জে. ল্যাঙ্গ (আইসিএস) প্রাণনাথ ওয়াটার ওয়ার্কস উদ্বোধন করেন। ফলকের তথ্য বলছে তখন খুলনা জেলার ম্যাজিস্ট্রেট ছিলেন এম. থর্প নামে কোনো এক ব্রিটিশ। আর তৎকালীন সাব ডিভিশন সাতক্ষীরার এসডিও ছিলেন এস.এন. দাস। ঊর্ধ্বতন কর্তাব্যক্তিদের তুষ্টিসাধনের প্রয়াস আমরা দেখতে পাই শতবর্ষ আগেও।

ডান দিকের ফলকের সারমর্ম এমন-

প্রেসক্লাবের গেটে ডান দিকের ফলক/ঢাকা ট্রিবিউন

১৯০৯ থেকে ১৯১১ সাল পর্যন্ত সাতক্ষীরার এস.ডি.ও ছিলেন বাবু অক্ষয় কুমার সুর। এই ওয়াটার ওয়ার্কস প্রতিষ্ঠায় তার উদ্যোগ এবং কর্মযজ্ঞের জন্য সাতক্ষীরাবাসী কৃতজ্ঞ।

এখানেই থমকে যাওয়া যেত। তবে সাতক্ষীরা প্রেসক্লাবটা এক দারুণ জায়গায়। প্রেসক্লাব ভবনের পাশেই বিরাট এক দীঘি। টলটলে পানি তার। পড়ন্ত বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যার হু হু হাওয়ায় আড্ডা জমে উঠল বেশ। স্থানীয় সাংবাদিক ভাইদের কাছে কথায় কথায় জানতে চাইলাম, ভাই বাইরে দুইটা ফলক দেখলাম কোনো এক প্রাণনাথ রায়ের কথা বলা হচ্ছে, উনি কে ছিলেন? ফলকটাই বা কীসের?

এগিয়ে এলেন প্রবীণ সাংবাদিক বীর মুক্তিযোদ্ধা কালীদাস রায়। তার দেওয়া তথ্য বলছে, ব্রিটিশ আমলে এই ওয়াটার ওয়ার্কস স্থাপন করা হয়েছিল তৎকালীন সাতক্ষীরায় পানি সরবরাহের জন্য। পাশের সুগভীর দীঘি থেকে পানি তোলা হতো একটি ট্যাংকে।

কালীদাস রায়ের তর্জনী তখন ওপরের দিকে। তাকাতেই চোখে পড়ল এক সুবিশাল ট্যাংক। লোহার ট্যাংকটি প্রায় চারতলা সমান উঁচু। পাশেই তৎকালীন মেশিন ঘর।

সাতক্ষীরার এই প্রবীণ সহকর্মী জানালেন, দীঘি থেকে পাম্প দিয়ে পানি তুলে এখানেই ফিল্টারিং করা হতো। তারপর সরবরাহ হতো লাইনে। ব্রিটিশ আমলেই এটি বন্ধ হয়ে যায়। বন্ধ হয়ে যাওয়ার সময়কাল সঠিকভাবে তিনি বলতে পারেননি।

তবে এই দীঘিতেই তখন জমিদার বাড়ির নারীরা স্নান সারতে আসতেন গোপন সুড়ঙ্গ দিয়ে। সেসব আজ ইতিহাস।

সাতক্ষীরা প্রেসক্লাব/ঢাকা ট্রিবিউন

বন্ধ হয়ে যাওয়ার পরে এর মেশিনপত্র কোথায় গেল, মেশিনঘরের এখন কী অবস্থা- সেসব প্রশ্ন ততক্ষণে প্রসঙ্গ হারিয়েছে। বাংলাদেশে এসব ঐতিহাসিক স্থাপনা বেদখল হয়ে যাওয়া নিয়তি। এর ধারণক্ষমতা, কার্যপদ্ধতি আমি আর সেসব প্রশ্ন করে তাদের বিরক্ত করতে চাইনি। তবে স্থানীয় সাংবাদিকরাই জানালেন জমিদার প্রাণনাথ রায়ের বাড়ি কাছেই। সেখানে এখন হাইস্কুল এবং ল কলেজ। ততক্ষণে সন্ধ্যার ঘোর লেগে গেছে। আমাদের আবার ফেরার তাড়া।

প্রাণনাথের বাড়ি দেখার সাধ মিটল না। সাতক্ষীরা থেকে ফিরতে হলো একটুর জন্য না দেখতে পারার উপাখ্যান নিয়ে।

জমিদার প্রাণনাথ রায়ের জন্ম-মৃত্যু সম্পর্কে ইন্টারনেটে বিশ্বাসযোগ্য কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। তবে মৃত্যুর পরেও তিনি কতখানি প্রাসঙ্গিক ছিলেন তার প্রমাণ শহরের বিভিন্ন স্থাপনায় এখনও তার নাম। এই জমিদারকে বলা হয় আধুনিক সাতক্ষীরার স্থপতি বা রূপকার। তিনি ছিলেন জমিদার বিষ্ণুরাম চক্রবর্তীর (পরে রায়চৌধুরী) পুত্র। নদীয়ার প্রসিদ্ধ জমিদার কৃষ্ণচন্দ্র রায়ের ( ১৭১০-১৭৮২ বা ১৭৮৩) মৃত্যুর পর তার অধিকৃত জমিদারি পরগনাগুলো নিলামে ওঠে।

তখন তারই কর্মচারী বিষ্ণুরাম চক্রবর্তী বড়ুন পরগনা (বর্তমান সাতক্ষীরা) কিনে নেন। ১৭৯৭ সালে তিনি সাতঘরিয়া বা সাতক্ষীরায় এসে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন এবং রায়চৌধুরী উপাধি লাভ করেন।

জমিদার প্রাণনাথের স্মরণে নির্মিত ট্যাংকটি আজও কালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে/ঢাকা ট্রিবিউন

জমিদার প্রাণনাথ সাতক্ষীরায় অনেক জনহিতকর কাজ করেন। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য প্রাণসায়র খাল ও দীঘি খনন, রাস্তাঘাট নির্মাণ , ল্যাম্পপোস্ট স্থাপন , বৃক্ষরোপণ। ১৮৬৯ সালে সাতক্ষীরা মিউনিসিপ্যালিটি (বর্তমানে পৌরসভা) স্থাপিত হলে তিনি প্রথম চেয়ারম্যান হিসাবে দীর্ঘদিন (১৮৬৯-১৮৯৪) দায়িত্ব পালন করেন। তারই নামানুসারে সাতক্ষীরাতে প্রতিষ্ঠিত হয় প্রাণনাথ (পিএন) হাইস্কুল (১৮৬২) এবং প্রাণনাথ ওয়াটার ওয়াকর্স (১৯১৯)।

প্রাণনাথ ওয়াটার ওয়ার্কস সম্পর্কে জানার ইচ্ছে রইল। জানি লাভ নেই, তবুও এই গিলে খাওয়ার দেশে আধুনিক প্রভুরা চাইলে সাতক্ষীরার ঐতিহ্যগুলোকে রক্ষা করতে পারেন। অবশ্য বিষয়টি বোঝার মতো সুশিক্ষা ও সদিচ্ছা তাদের কতখানি আছে, সে বিষয়ে আমি সন্দিহান।


লেখকঃ সাংবাদিক


প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্ত নিজস্ব 



   

About

Popular Links

x