আমার নিজের শিক্ষার্থীসহ অনেকেই হয়ত জানেন না বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা কেন নতুন প্রত্যয় পেনশন স্কিমের বিরুদ্ধে আন্দোলন করছেন? প্রথমত, যে সরকারি চাকুরীজীবিরা পেনশন পান তাদের জন্য কোন নতুন পেনশন স্কিম-ই প্রয়োজন ছিল না এবং এ সংক্রান্ত কোনো প্রস্তাবও ছিল না। যারা সরকারি পেনশন পেতেন না তাদের জন্যই মূলত চারটি পেনশন স্কিম চালু করা হয়।
প্রাথমিকভাবে ৪ টি পেনশন স্কিম ঘোষণা করা হয়। যথা:
১) প্রবাস: প্রবাসী বাংলাদেশীদের জন্য
২) প্রগতি: বেসরকারি কর্মচারি/প্রতিষ্ঠান এর জন্য
৩) সুরক্ষা: স্বকর্ম ও অ-প্রাতিষ্ঠানিক কর্মীদের জন্য
৪) সমতা: স্বল্প আয়ের ব্যক্তিদের জন্য
হঠাৎ গত ১৩ সংশ্লিষ্ট কারো সাথে আলোচনা বা পর্যালোচনা না করেই সর্বজনীন “প্রত্যয়” নামক পেনশন স্কিম নাজিল করা হলো । বলা হলো “সর্বজনীন” কিন্তু “আপনারা” নিলেন না। তাহলে এটা সর্বজনীন কীভাবে হলো? আমরা শিক্ষক-গবেষকরা নতুন কোন ভ্যাকসিন বা কোন প্রোডাক্ট তৈরি করলে আগে নিজেরা বিভিন্নভাবে তার গুনগত মান যাচাই করে, নিজেরা ব্যবহার করে তারপর সাধারণ মানুষ বা এর সংশ্লিষ্ট ব্যবহারকারীদের সরবরাহ করি। আর আপনাদের ভাষ্য মতে “প্রত্যয়” এত ভালো স্কিম হওয়া স্বত্তেও “আপনারা” নিজেরা না নিয়ে আমাদের ওপর চাপিয়ে দিলেন।
সংশ্লিষ্ট স্টেকহোল্ডারদের (যেমন: বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক) সাথে কোন আলোচনা নাই, পরামর্শ নাই হুট করে “প্রত্যয়” নামক পেনশন স্কিম নাজিল করে স্বায়ত্বশাসিত (যেমন: বিশ্ববিদ্যালয়) প্রতিষ্ঠানের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হলো। কেন?
উপরন্তু, এই স্কিমে বর্তমানে প্রচলিত পেনশনের অনেক সুবিধা নাই যা ইতোমধ্যে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে আলোচিত হয়েছে (যেমন: প্রত্যয় স্কিম পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়কে যেদিকে ঠেলে দেবে, সমকাল, ১৯ মে-২০২৪)। এখানে, খুবই চাতুরতার সাথে বলা হয়েছে এটা জুলাই-২০২৪ এ যারা নতুন যোগদান করবেন তাদের জন্য। তাহলে এটা একই পেশায় একটা সুস্পষ্ট বৈষম্য যা বাংলাদেশের সংবিধান বিরোধী। এখন প্রশ্ন উঠতে পারে তাহলে আমরা (বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকবৃন্দ) কেন আন্দোলন করছি? এতে তো আমাদের (বর্তমানে কর্মরত শিক্ষক) কোনো ক্ষতি নাই। কথা আংশিক সত্য, আরো একটু গভীরে চিন্তা করলে দেখা যায় যে এটা আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা ধ্বংসের একটা নীল নকশা। তাই শিক্ষাব্যবস্থাকে বাঁচাতে এবং শিক্ষকদের সম্মান ধরে রাখতেই এই আন্দোলন। বিষয়টা একটু খোলাসা করি।
আমাদের দেশের শিক্ষকদের বেতন কাঠামো (প্রাইমারি থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত) এশিয়া উপমহাদেশের মধ্যে সবচেয়ে নিচে। তারপরও এখনও বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথমসারীর গ্র্যাজুয়েটরা (আনুমানিক ৯০%) পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতায় আসে। তার অন্যতম একটা কারণ হলো সম্মান ও চাকুরীর শেষে একটা ভালো পেনশন পাওয়া।
এখন এই চলতি পেনশন বাদ দিয়ে “প্রত্যয়” নামক নতুন পেনশন স্কিম (যাতে সুবিধা হ্রাস করা হয়েছে) চালু করলে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথমসারীর গ্র্যাজুয়েটরা আর বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতায় আসবেন না। কারণ সরকারি চাকরির একটি উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট হলো জীবনের শেষে একটা ভালো পেনশন পাওয়া। তাহলে বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতায় কারা আসবেন? আসবেন তলনামূলক কম মেধাবীরা যারা বিভিন্ন প্রতিযোগিতামূলক চাকরিতে টিকতে না পেরে শেষ-মেষ এই শিক্ষকতায় আসবেন। যেমনটি এখন প্রাইমারিতে দেখা যায় (প্রায় ৯০% ক্ষেত্রে)।
একটু খেয়াল করলে লক্ষ্য করবেন আমাদের দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ৯০% শিক্ষার্থীরা আসে মধ্যবিত্ত বা নিন্ম-মধ্যবিত্ত পরিবার থেকে। তাহলে এই সকল শিক্ষার্থীরা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিখবেন কাদের কাছ থেকে? ঐ সকল কম মেধাবী শিক্ষকদের কাছ থেকে। তাহলে কী শিখবেন আর কতটুকু স্কিলড হবেন তা আপনারাই ভেবে দেখুন। এখনো পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে যতটুকু স্কিল্ড হওয়া যায় তখন তার কিছুই হবে না। তাহলে আমাদের স্মার্ট বাংলাদেশ তথা বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা গড়ার স্বপ্ন, স্বপ্ন-ই থেকে যাবে।
একদিকে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ব্যবস্থা ধ্বংস হবে আর অন্যদিকে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের রমরমা ব্যবসা হবে। কিন্তু দুঃখের বিষয় আমার দেশের কৃষক, খেটে খাওয়া মানুষের ছেলে-মেয়েরা অত টাকা দিয়ে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে পারবে না। তাহলে ফলাফল কি হবে? আমার দেশের কৃষক, খেটে খাওয়া মানুষের ছেলে-মেয়েরা তখন “Low Quality” পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে বড় জোর ৩য় বা ৪র্থ শ্রেণির কেরানি হবে। তাদের বড় হবার স্বপ্ন, স্বপ্ন-ই থেকে যাবে।
দ্বিতীয়ত, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের বেশিরভাগ শিক্ষকরা নিজের চেষ্টায় স্কলারশিপ ম্যানেজ করে বিদেশ থেকে পিএইচডি করে আসেন। তারা চাইলেই বিদেশে খুব সহজেই সেটেল হতে পারবে। এইরকম ভাবে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের সুযোগ-সুবিধা কমাতে থাকলে বেশীরভাগ-ই দেশ ছেড়ে বিদেশে পাড়ি জমাবে। তাহলে লাভ হবে কার? কোন দেশের? যে দেশে গুণীর কদর নাই, সে দেশে গুণী জন্মাই/থাকবে না, এটাই স্বভাবিক।
দেশ ও জাতি গঠনে শিক্ষার কোনো বিকল্প নাই। আর শিক্ষকরা হচ্ছেন সেই জাতি গঠনের কারিগর। একথা বঙ্গবন্ধু বহু আগেই উপলব্ধি করেছিলেন বলেই দেশ স্বাধীনের পর সেই ভঙ্গুর অর্থনীতিতে দাঁড়িয়েও তিনি শিক্ষায় জিডিপির প্রায় ৪% বরাদ্দ দিয়েছিলেন। আর এখন আমরা সেই বরাদ্দ কমাতে কমাতে ২% এর নিচে নিয়ে চলে এসেছি। আর একটি কুচক্রী মহল এদেশের শিক্ষাখাত তথা শিক্ষকতা পেশা কে প্রতিনিয়ত অনাকার্ষনীয় করতে উঠে পড়ে লেগেছে।
আজ শিক্ষকদেরকে রাস্তায়/আন্দোলনে এনে দাড় করিয়েছে, আমাদের তো আন্দোলনে থাকার কথা না, আমাদের থাকার কথা ল্যাবে বা ক্লাশে। কিন্তু আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থাকে আজ ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে এনে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে ঐ কুচক্রী মহল। তারা বহুদিন ধরে পরিকল্পনা করে ধীরে ধীরে এই দেশের শিক্ষা ব্যবস্থাকে এমন পর্যায়ে নিয়ে এসেছেন যাতে করে এখান থেকে আর কোনো স্কিলড ম্যান পাওয়ার তৈরি না হয়। তাহলে দেশ এমনিতেই রসাতলে যাবে। বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা আর হবে না।
The famous statement of Nelson Mandela is notable here.
"Destroying any nation does not require the use of atomic bombs or the use of long-range missiles. It only requires lowering the quality of education and allowing cheating in the examinations by the students."
খুবই সুচারুভাবে সেই কুচক্রী মহল ধীরে ধীরে আমাদের দেশের শিক্ষার কোয়ালিটি হ্রাস করছে। এর ১ম ধাপে তারা ২০১৫ সালে পে-স্কেল এ শিক্ষকদের স্বতন্ত্র বেতন স্কেল তো দেয়ই নাই বরং গ্রেড আরও অবনমন করে নিজেরা সুপার গ্রেড তৈরি করে নিয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক হিসেবে ১ম যোগদানের সময়ের যে ৩টি বা ৪টি ইনক্রিমেন্ট পাওয়া যেত তা বিলুপ্ত করেছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের পিএইচডি অর্জনের জন্য যে ইনক্রিমেন্ট দেওয়া হত তা নিয়ে তাল-বাহানা চলছে। আর আমাদের প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের বেতন কাঠামো তুলনা করলে দেখা যায়, বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের বেতন সবচেয়ে কম।
তাহলে এই শিক্ষকতা পেশায় কোনো মেধাবী গ্র্যাজুয়েট কেন আসবে? তারপরও দেশপ্রেম এর তাড়নায় এবং ভালো পেনশন (শেষ বয়সে যাতে একটু ভালো থাকা যায়) এর আশায় এখনো অনেক মেধাবীরা এই পেশায় আসেন। কিন্তু এই পেনশন স্কিম “প্রত্যয়” চালু হলে আর কোনো প্রথম সারির মেধাবী গ্র্যাজুয়েট শিক্ষকতা পেশায় একেবারেই আসবে না। ধীরে ধীরে জাতি মেধা শূন্য হবে এবং এই ট্রেন্ড ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে।
সম্প্রতি প্রকাশিত ইউনেসকোর প্রতিবেদনের তথ্যতেও বলা হয়েছে, ২০২৩ সালে বাংলাদেশ থেকে বিদেশে পাড়ি দিয়েছেন মোট ৫২ হাজার ৭৯৯ জন শিক্ষার্থী। (https://www.prothomalo.com/opinion/letter/0p4q4ixwny)
তার আগের বছর ২০২২ সালে অন্তত ৪৯ হাজার ১৫১ বাংলাদেশি শিক্ষার্থী ৫৮টি দেশে পড়াশোনার জন্য গিয়েছে। (https://dailyinqilab.com/editorial/article/604252) এর মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরাও রয়েছেন। এই শিক্ষা ছুটিতে থাকা অধিকাংশ শিক্ষকরা এখনো দেশে ফিরতে চান। কিন্তু শিক্ষকতা পেশাকে আরও আকর্ষণীয় না করে উল্টা আরও সুযোগ-সুবিধা হ্রাস করলে এদের বেশিরভাগই আর ফিরবে না।
বর্তমান সময়ে শুধু সম্মান দিয়ে কিছুই হয় না। একজন মেধাবী শিক্ষক যদি সাচ্ছন্দে জীবিকা নির্বাহ করতে না পারেন তাহলে তিনি কেনো থাকবেন এই পেশায়? আর কুচক্রীমহল এটাই চাই। তাইতো এই পেশাকে অনাকার্ষনীয় করতে তারা উঠে পড়ে লেগেছে।
দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষাকে বাচাতে কিছু আশু পদক্ষেপ গ্রহণ করা জরুরী। যেমন:
১। পাশের কয়েকটি দেশের শিক্ষকদের বেতন কাঠামো পর্যালোচনা করে বিশ্ববিদ্যালয় তথা সকল স্তরের শিক্ষকদের জন্য যুগোপযোগী স্বতন্ত্র বেতন কাঠামো প্রনয়ন করা। যাতে সর্বোচ্চ মেধাবীরা এই পেশায় আসে।
২। যুগোপযোগী পেনশন চালু রাখা।
৩। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের সুযোগ-সুবিধা আরো বৃদ্ধি করা। তাহলে মেধাবীরা এই পেশায় আসতে আরো উৎসাহী হবে।
৪। জেলায়-জেলায় নতুন বিশ্ববিদ্যালয় না খুলে পুরাতন বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সক্ষমতা বৃদ্ধি করা। কারণ আমাদের ছোট দেশে নতুন-নতুন বিশ্ববিদ্যালয় খুলে এত বেশী সংখ্যক কোয়ালিটি সম্পন্ন শিক্ষক পাওয়া সম্ভব নয়।
৫। যোগ্য গবেষকের জন্য গবেষণা বরাদ্দ বৃদ্ধি করা এবং উক্ত বরাদ্দ প্রাপ্তির ক্ষেত্রে আমলা-তান্ত্রিক জটিলতা কমানো।
৬। Exceptional / outstanding শিক্ষক ও গবেষক দের জন্য Exceptional / outstanding সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধি করা। যেমন: আলাদা প্রমোশন নীতিমালা, বেতন-ভাতা, প্রণোদনা প্রদান ইত্যাদি।
৭। বিদেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়/প্রতিষ্ঠানে কর্মরত যোগ্য শিক্ষক/গবেষকদের আলাদা ইন্টেন্সিভ দিয়ে বিভিন্ন ট্যালেন্ট হান্ট প্রোগ্রামের মাধ্যমে দেশের শিক্ষা ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানে ফিরিয়ে আনা। যেমনটি চায়না ও ভারত করেছে।
৮। ন্যূনতম আগামী ১০ বছর সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সকল প্রকার ছাত্র ও শিক্ষক রাজনীতি আইন করে বন্ধ করা।
এছাড়া, প্রাইমারী স্কুলপর্যায়ে সঠিক যোগ্যতা নির্ধারণ করে শিক্ষকদের নিয়োগ অবশ্যই ১ম শ্রেণীর (৯ম গ্রেড) হওয়া উচিত।
এইরকম আরও অনেক পদক্ষেপ গ্রহণ করা যেতে পারে। হয়ত সব একবারে সম্ভব নয়, তবে আমাদের দেশের শিক্ষাব্যবস্থাকে বাঁচাতে এই রকম কিছু পদক্ষেপ এখন-ই গ্রহণ করা প্রয়োজন। শিক্ষায় এইরকম মেগা প্রকল্প গ্রহণ না করলে এদেশের শিক্ষাব্যবস্থা বাচবে না আর বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলাও হবে না। উল্লেখ্য যে, পৃথিবীতে এমন কোনো উন্নত দেশ নাই যারা শিক্ষাখাত উন্নত না করে নিজ দেশ কে উন্নত করতে পেরেছে। অন্যের সহায়তায় স্ট্রাকচারাল ডেভেলপমেন্ট মানেই উন্নয়ন নয়। এই ডেভেলপমেন্ট যদি নিজের দেশের স্কিল্ড ম্যান-পাওয়ার দিয়ে করা যায় এবং সেটি টেকসই হয়, তখনই কেবল দেশ উন্নত হবে। অন্যথায় নয়।
আপাতত আমাদের দেশের শিক্ষা ব্যবস্থাকে বাচাতে নতুন “প্রত্যয়” পেনশন স্কিম বাতিল করা হোক ও শিক্ষকদের যুগোপযোগী স্বতন্ত্র বেতন স্কেল চালু করা হোক। আর যতদিন স্বতন্ত্র বেতন স্কেল চালু না হয় ততদিন অধ্যাপকদের সুপারগ্রেড প্রদানের ব্যবস্থা করা হোক।



