বাংলাদেশে বিরল কোরাল রেড কুকরি বা কমলাবতী সাপের উপস্থিতি বাড়ছে। ২০২১ সালে দেশে প্রথমবারের মতো এ প্রজাতির সাপের সন্ধান পাওয়ার পর গত সাড়ে পাঁচ বছরে অন্তত ৬৬টি সাপ উদ্ধারের তথ্য মিলেছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তন, আবাসস্থলের পরিবর্তন এবং ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে এ প্রজাতির সাপ উত্তরাঞ্চলে বিস্তার লাভ করে থাকতে পারে।
তবে বিবিসি এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, বিষয়টি নিশ্চিত করতে আরো গবেষণার প্রয়োজন রয়েছে।
সম্প্রতি পঞ্চগড়ের বোদা উপজেলার চৌরঙ্গী বাজার এলাকার একটি কৃষিজমিতে মাছ ধরার জন্য পাতা রিং জালে দুটি কমলাবতী সাপ ধরা পড়ে। উদ্ধারকারীদের দাবি, এর একটি প্রায় সাড়ে তিন ফুট লম্বা, যা বাংলাদেশে এ পর্যন্ত পাওয়া সবচেয়ে বড় কমলাবতী সাপ। এর আগে এ প্রজাতির সাপ মূলত বাঁশঝাড় কিংবা মাটি খননের সময় পাওয়া গেলেও এবার প্রথমবারের মতো ফসলের ক্ষেতের পানির কাছাকাছি এর দেখা মিলেছে।
“ওয়াইল্ডলাইফ অ্যান্ড স্নেক রেসকিউ টিম ইন বাংলাদেশ” এর প্রতিষ্ঠাতা মো. শহীদুল ইসলাম জানান, ২০২১ সালে প্রথমবার এই সাপ উদ্ধারের পর থেকে এখন পর্যন্ত তিনি একাই ৬৬টি কমলাবতী সাপ উদ্ধার করেছেন। এর মধ্যে ১২ থেকে ১৩টি বাচ্চা এবং বাকিগুলো পূর্ণবয়স্ক। অধিকাংশ সাপই পঞ্চগড়ের বোদা ও আটোয়ারী উপজেলা থেকে উদ্ধার করা হয়েছে। একই এলাকায় আরো কিছু সাপ পাওয়া গেলেও সেগুলোর তথ্য আনুষ্ঠানিকভাবে সংরক্ষণ করা হয়নি।
তার ভাষ্য, স্থানীয় মানুষ লাল রঙের এ ধরনের সাপ আগে কখনো দেখেননি। ফলে সাপগুলো দেখার পর তারা না মেরে উদ্ধারকারীদের খবর দেন। ২০২৩ সালে আটোয়ারী উপজেলার একটি বাঁশঝাড় থেকে একটি মা সাপের সঙ্গে আটটি সদ্য ফুটে বের হওয়া বাচ্চাও উদ্ধার করা হয়েছিল। যদিও এ প্রজাতির ডিম এখনও পাওয়া যায়নি, তবে ওই ঘটনার ভিত্তিতে ধারণা করা হচ্ছে, একটি কমলাবতী সাপ একবারে ৮ থেকে ১২টি ডিম দিতে পারে।
কমলাবতী সাপের বৈজ্ঞানিক নাম ওলিগোডন খেরিয়েনসিস। ১৯৩৬ সালে ভারতের উত্তরপ্রদেশে প্রথম এ প্রজাতির সন্ধান পাওয়া যায়। দীর্ঘদিন ধরে এটি শুধু ভারতের হিমালয়-সংলগ্ন অঞ্চল ও নেপালেই সীমাবদ্ধ ছিল। ২০২১ সালের ফেব্রুয়ারিতে বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো এ সাপের উপস্থিতি নিশ্চিত হওয়ার পর আন্তর্জাতিক গবেষণা সাময়িকীতে দেশের ১০৩তম সাপের প্রজাতি হিসেবে এটি অন্তর্ভুক্ত হয়। গবেষকদের তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বজুড়ে এ প্রজাতির সাপ দেখার রেকর্ড ছিল মাত্র ২২ থেকে ২৩টি।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ও ভেনম রিসার্চ সেন্টারের গবেষক ড. মো. আব্দুল ওয়াহেদ চৌধুরী বলেন, বাংলাদেশে এ প্রজাতির সাপের সংখ্যা কেন বাড়ছে, সে বিষয়ে এখনই নির্দিষ্ট কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব নয়। তবে অন্যান্য সাপ নিয়ে পরিচালিত গবেষণায় দেখা গেছে, জলবায়ু পরিবর্তন, বন্যা, বন উজাড় এবং মানুষের কর্মকাণ্ডে প্রাকৃতিক আবাসস্থল নষ্ট হলে অনেক সাপ নতুন এলাকায় স্থানান্তরিত হয়। উত্তরবঙ্গের পঞ্চগড় ও ঠাকুরগাঁও হিমালয়ের কাছাকাছি এবং তুলনামূলক উঁচু ভূমি হওয়ায় এ অঞ্চল কমলাবতী সাপের জন্য উপযোগী হয়ে উঠতে পারে।
গবেষকদের মতে, কমলাবতী সাপ বিষহীন এবং শান্ত স্বভাবের। এটি সাধারণত নরম মাটির নিচে একাকী বসবাস করে। এ প্রজাতির খাদ্যাভ্যাস, জীবনচক্র ও প্রজনন নিয়ে এখনও পর্যাপ্ত তথ্য পাওয়া যায়নি। বর্তমানে আইইউসিএনের রেড লিস্টে এর সংরক্ষণ অবস্থাও নির্ধারিত হয়নি। তাই বিরল এ সাপের বিস্তার ও সংরক্ষণ নিয়ে আরও বিস্তৃত গবেষণার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা।



