পৃথিবীতে প্রতিবছর কোনো প্রাণীর আক্রমণে সবচেয়ে বেশি মানুষ মারা যান? এমন প্রশ্নের জবাবে সাধারণ মানুষের মাথায় প্রথমেই হয়তো আসবে বাঘ, সিংহ, কুমির কিংবা সাপের নাম। তবে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিষয়ক খ্যাতনামা সাময়িকী ‘বিবিসি সায়েন্স ফোকাস’-এর এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এক চমকপ্রদ ও নির্মম তথ্য। বিশালাকার বা হিংস্র কোনো বন্য প্রাণী নয়, বরং মানুষের ঘরের কোণে থাকা অতি ক্ষুদ্র এক পতঙ্গই পৃথিবীর সবচেয়ে বিপজ্জনক এবং প্রাণঘাতী প্রাণী।
যুক্তরাজ্যভিত্তিক সাময়িকীটির তৈরি করা শীর্ষ ১০ বিপজ্জনক প্রাণীর তালিকায় সবচেয়ে বেশি মৃত্যুর জন্য দায়ী করা হয়েছে মশাকে। আরও আশঙ্কাজনক তথ্য হলো, এই তালিকায় দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে খোদ মানুষ নিজে। চলুন জেনে নেওয়া যাক বিজ্ঞানীদের গবেষণায় উঠে আসা বিশ্বের শীর্ষ ১০টি বিপজ্জনক প্রাণী এবং তাদের আক্রমণে বার্ষিক মৃত্যুর পরিসংখ্যান:
১. মশা (বার্ষিক মৃত্যু: ৭,২৫,০০০+ জন)
আকারে ক্ষুদ্র হলেও মৃত্যুর সংখ্যার বিচারে মশাই পৃথিবীর সবচেয়ে ভয়ংকর প্রাণী। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) তথ্যমতে, মশাবাহিত বিভিন্ন রোগ, বিশেষ করে ম্যালেরিয়া এবং ডেঙ্গুর কারণে প্রতিবছর সাত লাখ ২৫ হাজারেরও বেশি মানুষ প্রাণ হারান। ২০২২ সালে ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন ছয় লাখের বেশি মানুষ। অন্যদিকে বাংলাদেশে ২০২৩ সালে ডেঙ্গুর প্রকোপে রেকর্ড সংখ্যক তিন লাখের বেশি মানুষ আক্রান্ত হন এবং প্রায় দেড় হাজার মানুষ মারা যান।
২. মানুষ (বার্ষিক মৃত্যু: ৪,৭৫,০০০+ জন)
তালিকায় সবচেয়ে বৈচিত্র্যময় ও নির্মম সংযোজন হলো মানুষ। গবেষণায় দেখা গেছে, মানুষ নিজেই নিজের প্রজাতির জন্য অন্যতম বড় হুমকি। ডব্লিউএইচও-এর হিসাব অনুযায়ী, শুধুমাত্র ২০১৯ সালেই বিশ্বজুড়ে চার লাখ ৭৫ হাজারের বেশি মানুষ হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন। এর বাইরে আত্মহত্যা ও সড়ক দুর্ঘটনা যোগ করলে এই সংখ্যা বার্ষিক ১২ লাখ ছাড়িয়ে যায়।
৩. সাপ (বার্ষিক মৃত্যু: ৮১,০০০ – ১,৩৮,০০০ জন)
অনেকের ধারণা সাপই হয়তো শীর্ষ প্রাণঘাতী, তবে তালিকায় এর অবস্থান তৃতীয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, প্রতিবছর বিশ্বে প্রায় ৫৪ লাখ মানুষকে সাপে কাটে, যার মধ্যে প্রায় ৮১ হাজার থেকে এক লাখ ৩৮ হাজার মানুষ মারা যান এবং লাখো মানুষ পঙ্গুত্ব বরণ করেন।
৪. কুকুর (বার্ষিক মৃত্যু: ৫৯,০০০ জন)
মানুষের বিশ্বস্ত সঙ্গী হিসেবে পরিচিত হলেও জলাতঙ্ক (র্যাবিস) ভাইরাসের কারণে কুকুর অত্যন্ত বিপজ্জনক। প্রধানত বেওয়ারিশ ও পাগলা কুকুরের কামড়, আঁচড় বা লালার মাধ্যমে সংক্রমিত হয়ে বিশ্বজুড়ে প্রতিবছর প্রায় ৫৯ হাজার মানুষ মারা যান।
৫. অ্যাসাসিন বাগ (বার্ষিক মৃত্যু: ১০,০০০+ জন)
মধ্য ও দক্ষিণ আমেরিকায় পাওয়া যাওয়া এই রক্তচোষা পতঙ্গটি মানুষের ঘুমের মধ্যে কামড়ায় এবং ‘চাগাস’ নামক মারাত্মক সংক্রামক রোগের জীবাণু ছড়ায়। এই রোগে আক্রান্ত হয়ে প্রতিবছর ১০ হাজারেরও বেশি মানুষের মৃত্যু হয়।
৬. বৃশ্চিক বা কাঁকড়াবিছা (বার্ষিক মৃত্যু: ৩,০০০+ জন)
বিশ্বের মরুভূমি অঞ্চলে প্রধানত দেখা মিললেও এই বিষাক্ত প্রাণীর হুলের আঘাতে প্রতিবছর সারা বিশ্বে গড়ে তিন হাজারেরও বেশি মানুষ অকালে প্রাণ হারান।
৭. কুমির (বার্ষিক মৃত্যু: ১,০০০ জন)
জলভাগের অন্যতম হিংস্র এই মাংসাশী প্রাণীর আক্রমণে বছরে গড়ে এক হাজার মানুষ মারা যান। বিজ্ঞানীরা একে ‘সুযোগসন্ধানী শিকারী’ বলে থাকেন। বাংলাদেশের সুন্দরবন ও উপকূলীয় অঞ্চলেও প্রায়ই কুমিরের আক্রমণের খবর পাওয়া যায়।
৮. হাতি (বার্ষিক মৃত্যু: ৬০০ জন)
স্থলভাগের সবচেয়ে বড় এই স্তন্যপায়ী প্রাণীটির বিশাল দেহ ও শক্তি অনেক সময় মানুষের মৃত্যুর কারণ হয়। রেগে গেলে শুঁড় দিয়ে আছড়ে কিংবা পায়ের নিচে পিষে ফেলার কারণে বছরে গড়ে প্রায় ৬০০ জন মানুষ নিহত হন।
৯. জলহস্তী (বার্ষিক মৃত্যু: ৫০০ জন)
তৃণভোজী এবং শান্ত প্রকৃতির মনে হলেও জলহস্তী অত্যন্ত আক্রমণাত্মক। সিংহের চেয়েও তিন গুণ শক্তিশালী কামড়ের ক্ষমতা থাকা এই প্রাণীর আক্রমণে আফ্রিকায় প্রতিবছর প্রায় ৫০০ মানুষ মারা যান।
১০. সিংহ (বার্ষিক মৃত্যু: ২০০ জন)
বনের রাজা সিংহ শক্তিশালী ও হিংস্র হলেও এই তালিকার তলানিতে রয়েছে। মূলত মানুষ সিংহের আবাসস্থল থেকে দূরে থাকে বলেই এদের আক্রমণে মৃত্যুর সংখ্যা তুলনামূলক কম। আফ্রিকা মহাদেশে সিংহের আক্রমণে বছরে গড়ে ২০০ জনের মতো মানুষ মারা যান।
বিবিসি সায়েন্স ফোকাসের এই তালিকা প্রমাণ করে যে, প্রাণঘাতী হওয়ার জন্য বিশাল আকৃতি বা হিংস্র গর্জনের প্রয়োজন নেই; প্রকৃতির সবচেয়ে ক্ষুদ্র জীবগুলোই মানুষের জীবনের জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি।



