Friday, June 05, 2026

সেকশন

English
Dhaka Tribune

‘বাংলা কমিক্সকে পৃথিবীতে ছড়িয়ে দিতে চাই’

তার প্রতিষ্ঠিত 'ঢাকা কমিক্স' ইউনিসেফ ও ফেসবুকের পক্ষ থেকে পুরস্কার অর্জন করেছে। একক ব্যক্তি হয়ে এমন বহুমুখী কর্মের মানুষ একজন মেহেদী হক। সম্প্রতি তিনি নানা বিষয় নিয়ে মুখোমুখি হয়েছিলেন ঢাকা ট্রিবিউনের। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক হাসান শাওন 

আপডেট : ০৬ মে ২০২২, ০৩:২১ পিএম

সংবাদপত্রে কার্টুনহীনতার সময়ে তিনি এককভাবে পথ দেখাচ্ছেন। সক্রিয় আছেন ইংরেজি দৈনিক নিউ এজ-এর সিনিয়র কার্টুনিস্ট হিসেবে। যুক্ত আছেন দেশের একমাত্র ঐতিহ্যবাহী স্যাটায়ার ম্যাগাজিন ‘‘উন্মাদ’’ এর এক্সিকিউটিভ এডিটর হিসেবে। তিনি প্রতিষ্ঠাতা ‘‘ঢাকা কমিক্স’’ এর মতো সফল প্রকাশনার। 

প্রতিষ্ঠানটি মাত্র ক’দিন আগে শিশুদের জন্যে মানসম্মত মৌলিক কন্টেন্ট তৈরির জন্য ইউনিসেফ ও ফেসবুকের পক্ষ থেকে পুরস্কার অর্জন করেছে। একক ব্যক্তি হয়ে এমন বহুমুখী কর্মের মানুষ একজন মেহেদী হক।

সম্প্রতি তিনি নানা বিষয় নিয়ে মুখোমুখি হয়েছিলেন ঢাকা ট্রিবিউনের। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক হাসান শাওন।

ঢাকা ট্রিবিউন : কেন মনে হলো এমন কৃতিত্বপূর্ণ একাডেমিক ক্যারিয়ার ও অসংখ্য প্রলোভনের চাকরির প্রস্তাব থাকতেও কার্টুন ও কমিক্স আঁকা পেশা হবে?

মেহেদী হক : মনে হলো যে কাজ কেউ করছে না সেখানে বেশি কিছু করার থাকে। আর প্রথাগত চাকরিতে নিশ্চিত জীবন ও জীবিকা হলেও দেশের জন্যে কিছু করার খিদে মেটানো সেখানে কঠিন। তার চেয়ে বাংলা কমিক্স নিয়ে কাজ করে একটা নতুন ইন্ডাস্ট্রির শুরুটা করা বেশি লোভনীয় ছিল। আর পেছনে গুরু আহসান হাবীবের উৎসাহ তো ছিলই।

ঢাকা ট্রিবিউন : আপনার জীবনে কার্টুন বা কমিক্স ভর করলো কখন? ছোটবেলায় কাদের কাজ দেখে অনুপ্রেরণা পেয়েছেন? পরিবার থেকে কেমন সাপোর্ট পেয়েছেন?

মেহেদী হক: প্রথম যখন দৈনিক ইত্তেফাকে রাসেল জর্জ মানিংয়ের (রাস মানিং) আঁকা টারজান দেখি, তখন ক্লাস টু এ পড়ি। তখন থেকেই দেখে দেখে কলমে সেগুলো কপি করতাম। পরে ফ্যান্টম, চাচা চৌধুরি ইত্যাদি পড়ার ফাঁকে ফাঁকে সেগুলিও আঁকা শুরু করি। সেই থেকে শুরু। তবে পেশাদারি কাজের হাতেখড়ি ক্লাস টেনে এসে, ১৯৯৮ সালে উন্মাদ পত্রিকায় স্বয়ং আহসান হাবীবের তত্ত্বাবধানে।

পরিবার থেকে ভালই উৎসাহ পেয়েছি, সবথেকে বেশি উৎসাহ দিয়েছেন আমার বাবা। তিনি আমার আঁকার আগ্রহ দেখে পেশাদার আঁকিয়েদের আঁকার সরঞ্জাম কিনে দিয়েছিলেন। তখন পত্রিকার জন্যে ট্রেসিং পেপারে বেশ দামি জার্মান লাইনার পেনে আঁকতে হতো। ক্লাস এইটে পড়ার সময় তিনি সেই কলম কাগজ কিনে দিয়েছিলেন।

ঢাকা ট্রিবিউন : জীবনে প্রথম প্রকাশিত কাজ কী ছিল?

মেহেদী হক : দৈনিক সমাচারে, একটা রাজনৈতিক কার্টুন। শেখ হাসিনা, খালেদা জিয়া আর এরশাদ তিনজনকে নিয়ে একটা মজার কার্টুন।

মেহেদী হককে এঁকেছেন মামুন হোসেইন সৌজন্য ছবি

ঢাকা ট্রিবিউন : উন্মাদ ও আহসান হাবীবের সাথে পরিচয় কীভাবে?

মেহেদী হক : ছোটবেলা থেকে বাংলাদেশ এস্ট্রনমিকাল এসোসিয়েশনের সাথে যুক্ত ছিলাম, তাদের একটা ম্যাগাজিন আছে ‘‘মহাকাশ বার্তা’’। সেখানে আহসান হাবীবের কার্টুন ছাপা হত নিয়মিত। তো সেটা আনতে তাদের অফিসে যেতেন পত্রিকার সম্পাদক ও এসোসিয়েশনের পরিচালক মশহুরুল আমিন (মহাকাশ মিলন) তিনি আমার আঁকা দেখে একদিন সাথে নিয়ে গিয়ে পরিচয় করিয়ে দিলেন আহসান হাবীবের সাথে, তখন ১৯৯৮ সালের বন্যা চলছিল, বন্যা নিয়ে একটা কার্টুন এঁকে নিয়ে গেছিলাম, সেটা থেকেই শুরু। এর পর থেকে আজও এঁকে যাচ্ছি।’

ঢাকা ট্রিবিউন : দেশের একমাত্র স্যাটায়ার, ফান ও কার্টুনভিত্তিক ঐতিহ্যবাহী ম্যাগাজিন “উন্মাদ” দেশের কার্টুনিস্টদের মধ্যে কী প্রভাব সূচিত করেছে?

মেহেদী হক : শুধু প্রভাব নয়, আমি মনে করি বাংলাদেশের প্রায় সব কার্টুনিস্টদের জন্ম হয়েছে এবং হচ্ছে উন্মাদ ম্যাগাজিনে। তাই আলাদা করে প্রভাব বলা কঠিন। তার মধ্যেও যেটা না বললেই না সেটা হল উন্মাদ ম্যাগাজিন শুধু একটি পত্রিকা না, আহসান হাবীব এখানে একেবারে নবীন কার্টুনিস্টদের হাতে কলমে তৈরি করে সেটাকে একটা কার্টুন ইন্সটিটিউটে পরিণত করেছেন। যা এই উপমহাদেশেই দুর্লভ।

ঢাকা ট্রিবিউন : একটি প্রভাবশালী সংবাদপত্রের সিনিয়র কার্টুনিস্ট আপনি। আবার কমিক্স নিয়েও আপনার ভাবনার অন্ত নেই। এই দুই সত্ত্বার মধ্যে কি কোনো দ্বন্দ্ব হয়?

মেহেদী হক : না, কারণ দুটো পুরোপুরি আলাদা ক্ষেত্র। পত্রিকার কাজটা সাংবাদিকতার, একটা সম্পাদকীয় ধরনের কাজ, আর কমিক্স পুরোই গল্প। বরং চাইলে দুটোর মধ্যে একটা সংযোগ ঘটানো সম্ভব।

ঢাকা ট্রিবিউন : ঢাকা কমিক্স এর শুরুর গল্প জানতে চাই। কী ধরনের প্রতিকূলতা ছিল? কীভাবে তা জয় করেছেন?

মেহেদী হক : শুরুর প্রতিকূলতা মূলত ছিল বই ছাপার পরে সেটা পাঠকের হাতে তুলে দেওয়া, মানে বিতরণ কিভাবে হবে সেটা। সত্যি বলতে সেই প্রতিকূলতা এখনো পুরো কাটেনি। তবে এখন ইন্টারনেটের কারণে সরাসরি পাঠকের কাছে পৌঁছে যাওয়া যাচ্ছে যা আগে অত সহজ ছিলো না। আর কোনো কাজেই চটজলদি কোনো পথ নেই। আমি প্রতিদিনই আমার সহকর্মীদের সাথে নিয়ে শিখি, তাই পুরোটা জয় হয়ে গেছে এমন না বলে বলা ভাল ছোট ছোট প্রতিকূলতা  প্রতিদিন জয় করে চলেছি আমরা।

ঢাকা ট্রিবিউন : দেশের প্রকাশনা শিল্পে কমিক্স কী রকম প্রভাব রাখছে?

মেহেদী হক : এখনো অনেক ব্যাপক এমন বলবো না, তবে লক্ষণীয় যে বিগত কয়েক বছর যাবত অন্যান্য নামকরা প্রকাশনীও কমিক্স প্রকাশ করা শুরু করেছে, তার মানে এটা ধীরে ধীরে মূলধারায় চলে আসছে। আর এর পাঠকপ্রিয়তা অনেক। অন্যদিকে বই হবার পরেও এর ম্যাগাজিনের মত গড়ন হওয়াতে সহজেই ছোটখাট পত্রিকা স্ট্যান্ড বা ছোট লাইব্রেরিতে এর প্রদর্শন করা সহজ। দামেও সুলভ বলে এর বিক্রিও বেশ ভালই হচ্ছে।

ঢাকা ট্রিবিউন : আঁকিয়েদের ভেতর ঢাকা কমিক্স কীভাবে স্বপ্নের বীজ রোপিত করছে?

মেহেদী হক : একটা যেটা হয়েছে যে আমরাও যে এই দেশে বসে বিশ্বমানের যেকোনো কাজ করতে পারি, ঢাকা কমিক্সের কারণে তরুণ আঁকিয়েদের মধ্যে এই আত্মবিশ্বাস এসেছে। আগে যা কিছু ভাল তা-ই বিদেশি এমন যে ব্যাপারটা ছিল তা অনেকটাই কেটেছে। পপ কালচার, কমিক্স ইত্যাদি নিয়ে যারা কাজ করছেন ইদানিং তাদের অনেকেই ঢাকা কমিক্সের থেকে তাঁডের অনুপ্রেরণা পান বলে আমাদের জানিয়েছেন।

ঢাকা ট্রিবিউন : একটি কমিক্স প্রকাশের সময় প্রথম কোন বিষয়টি বিবেচনা করেন?

মেহেদী হক : সেটা যেন কোনভাবেই কোন স্পর্শকাতর বা দুর্বোধ্য বিষয় নিয়ে কাজ না করে। কারণ এটা আমাদের একেবারে শুরুর সময়। তাই সবাই পড়তে পারে এবং পড়ে বুঝতে পারে এমন কিছুই প্রাধান্য দেয়া হয়। আর অবশ্যই ফ্যান্টাসি ছাড়া অন্য সব গল্পে নিজেদের কালচার ও গল্প যেন থাকে সেইদিকে চোখ রাখি।

ঢাকা ট্রিবিউন : ঢাকা কমিক্স কেন জরুরি? কেন এ প্রতিষ্ঠান অন্য অনেকের চেয়ে আলাদা?

মেহেদী হক: জরুরি কারণ এই ভিজুয়ালের যুগে বিশ্বের আরো অনেক ক্যারেক্টার ও গল্পের পাশাপাশি আমাদের ভিজুয়াল ও থাকা জরুরি। এটা আমি মনে করি শুধু বাংলাদেশের শুধু না যে কোন বাংলা ভাষাভাষীদের জন্যও জরুরি। আর ঢাকা কমিক্সের সবচেয়ে চমকপ্রদ বিষয় হল এর প্রায় সবাই নিজেরাই আঁকিয়ে বা লেখক। মানে ব্যবসা প্রতিষ্ঠানটা আসলে আঁকিয়ে-লেখকেরা মিলেই চালাচ্ছেন।

ঢাকা ট্রিবিউন : উদ্যোক্তা মেহেদী হক কতটা সফল?

মেহেদী হক: সত্যি বলতে ঢাকা কমিক্স যে আদৌ এতদূর আসবে এটা আমি নিজেও জানতাম না। মাত্র চারটা বই দিয়ে শুরু করে আজ আমাদের ১০০র কাছাকাছি কমিক্স। আর প্রতি মাসে এখন তিন থেকে চার হাজার কপি বই বিক্রি হচ্ছে তাই আমি বলবো একশো ভাগ না হলেও আঁকার পাশাপাশি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানকে সবাই মিলে এতদূর আনার জন্যে কিছুটা সাফল্য আছে বৈকি।

ঢাকা ট্রিবিউন : কিংবদন্তি প্রয়াত নারায়ণ দেবনাথের হাত থেকে পুরস্কার নেওয়ার সময় কেমন অনুভূতি ছিল?

মেহেদী হক : অনুভূতি ছিল এমন যে, যে কোনো সময় ঘুম ভেঙে দেখবো এটা স্বপ্ন ছিল।

ঢাকা ট্রিবিউন : ঢাকা কমিক্স এর ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা কী?

মেহেদী হক: প্রথম দেশে একটা বাংলা কমিক্স মেলা করা। এর পর দিল্লিতে যে কমিক্সের মেলা হয় দিল্লি কমিকন সেখানে অংশ নেওয়া, এর পর পৃথীবীর অন্যতম সেরা কমিক্স মেলা আমেরিকার সান দিয়েগো কমিকনে যাওয়া। সোজা কথা বাংলা কমিক্সকে পৃথিবীতে ছড়িয়ে দিতে চাই। আর এ বছরেই ছোটদের জন্য অ্যানিমেশন সিরিজ চালু করা।

   

About

Popular Links

x