Friday, June 26, 2026

সেকশন

English
Dhaka Tribune

বিভেদহীন সমাজের স্বপ্ন দেখতেন ড. আসমা চৌধুরী

সমাজের প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রে বিভেদ আসমা চৌধুরীকে খুবই ব্যথিত করেছে। তাই বিভেদ দূর করার প্রত্যয় তার অন্তরে এমনভাবে বাসা বেঁধেছিল যে, আমৃত্যু তিনি সেই প্রত্যয় থেকে সরে যাননি

আপডেট : ১১ সেপ্টেম্বর ২০২২, ০৫:১১ পিএম

বিশিষ্ট নাট্যব্যক্তিত্ব ও সাহিত্যিক খায়রুল আলম সবুজ বলেছেন, “মানুষে মানুষে বিভেদ একটি অপসাংস্কৃতিক নির্মাণ, যা মেনে নিতে পারেননি ড. আসমা চৌধুরী। তাই অপসংস্কৃতির বিরুদ্ধে আন্দোলন এবং সাংস্কৃতিক বিনির্মাণের মাধ্যমেই তিনি সেই বিভেদ দূর করতে চেয়েছিলেন।”

শনিবার (১০ সেপ্টেম্বর) রাজধানীর পরিবাগের সংস্কৃতি বিকাশ কেন্দ্রে আয়োজিত ড. আসমা চৌধুরী স্মারক বক্তৃতা অনুষ্ঠানে খায়রুল আলম সবুজ এসব কথা  এসব কথা বলেন। দেশের অন্যতম সাংস্কৃতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক প্রতিষ্ঠান ‘‘সংস্কৃতি বিকাশ কেন্দ্র’’ -এর অন্যতম প্রধান সংগঠক এবং পথিকৃৎ ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা ড. আসমা চৌধুরীর ৫ম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।

খায়রুল আলম সবুজ বলেন, “যে সমাজের সংস্কৃতি তার নিজস্ব গতিপথ হারিয়ে দিন দিন তলিয়ে যাচ্ছে আরও অন্ধকার জগতে, আমাদের দেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গন তার বড় উদাহরণ হতে পারে। আজকের এই সমাজে আসমা চৌধুরীদের মানুষদের বড় প্রয়োজন যারা কেবল দেশের স্বার্থে, মানুষের স্বার্থে নিজেকে উজার করতে পারেন; আলোর মশাল জ্বেলে পথপ্রদর্শকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে পারেন।”

২০১৭ সালের ১১ সেপ্টেম্বর ক্যান্সারে মারা যান এই মহিয়সী নারী। আজ ড. আসমা চৌধুরীর ৫ম মৃত্যুবার্ষিকী।  

তিনি বলেন, “নিজের খেয়ে বনের মোষ তাড়ানোর মতো মানুষের জন্য যারা কাজ করেন, আজকের সমাজে তাদেরকে অনেকেই পাগল বলে অভিহিত করেন। কিন্তু এসব পাগলেরাই যে পেছন থেকে একটি মানবিক, টেকসই সমাজের ভিত্তি গড়ে দিচ্ছেন সেটি কেবল জ্ঞানী-গুণী, বিজ্ঞজনেরাই টের পান।”

খায়রুল আলম সবুজ আরও বলেন, “একটি দেশ জ্ঞান-বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, অর্থনীতি ইত্যাদি বিভিন্ন ক্ষেত্রে উন্নতির শিখরে পৌঁছাতে পারে। কিন্তু মানব উন্নয়ন যদি না হয়, মানুষে মানুষে যদি মানবিক সমতা-মর্যাদা প্রতিষ্ঠিত না হয়, মানুষ হিসেবে যদি আপনার সম্মান প্রতিষ্ঠা না পায়, তবে সেই সমাজ কেবলই অস্থিতিশীল, তাসের ঘরের মতো ভঙ্গুর। এই বাস্তবতাটাই অনুভব করতে পেরেছিলেন আসমা চৌধুরী। তাই সমস্যার গোড়াতেই সংস্কার করতে চেয়েছিলেন। বিভেদহীন সমাজের স্বপ্ন দেখেছিলেন।”

অনুষ্ঠানে প্রধান বক্তা স্থপতি ও চলচ্চিত্রকার মসিহ্‌উদ্দিন শাকের “বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে মুক্তির ভাবনা’’ শীর্ষক বক্তব্য উপস্থাপন করেন। 

তিনি বলেন, “বর্তমান বৈষম্যমূলক সমাজে বাস করেও মানুষের সার্বিক মুক্তির পথে সহায়ক চলচ্চিত্র তথা সংস্কৃতির প্রসার ঘটাতে পারি সেটাই হবে অর্জন। ড. আসমা চৌধুরী সেই চেষ্টাই করেছিলেন নিজের পথে।”

মসিহ্‌উদ্দিন শাকের বলেন, “১৯৫৬ সাল থেকে এ পর্যন্ত চার হাজার পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র নির্মিত হয়েছে। কিন্তু তার অধিকাংশের দর্শকরা এখনও এমন এক সচেতন মানসিকতায় ঋদ্ধ হতে পারেননি যা কাজে লাগিয়ে শ্রেণিগত বৈষম্য থেকে মুক্তির সংগ্রাম জোরদার করা যেতে পারে। বরং দেখা যায়, বৈষম্যকে আরও বাড়িয়ে তুলতে সেইসব পশ্চাৎপদ চিন্তার বাহক চলচ্চিত্রেই পুঁজি করে বিনিয়োগ করা হয় যেগুলো আমাদের সেই সচেতনতার পথে বাঁধা হয়ে দাঁড়ায়।”

আসমা চৌধুরী স্মারক বক্তৃতা উপলক্ষে তার বিষয়বস্তু চলচ্চিত্রের সঙ্গে প্রাসাঙ্গিক হলেও এটি সামাজিক উন্নয়নের নিরিখে ব্যাপক গবেষণার দাবি রাখে এবং চলচ্চিত্র শিল্পের উন্নয়নের জন্য এর প্রয়োজন রয়েছে বলেও মনে করেন তিনি।  

সবশেষে ধন্যবাদ জ্ঞাপন ও সম্মাননা প্রদান করেন পথিকৃৎ ফাউন্ডেশনের সভাপতি অধ্যাপক ড. লিয়াকত আলি। তিনি মসিহ্‌উদ্দিন শাকেরের হাতে সম্মাননা স্মারক তুলে দেন।

লিয়াকত আলি তার বক্তব্যে বলেন, “সমাজের প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রে বিভেদ আসমা চৌধুরীকে খুবই ব্যথিত করেছে। তাই বিভেদ দূর করার প্রত্যয় তার অন্তরে এমনভাবে বাসা বেঁধেছিল যে, আমৃত্যু তিনি সেই প্রত্যয় থেকে সরে যাননি।”

প্রয়াত সহধর্মীনি ড. আসমা চৌধুরীর স্মৃতিচারণা করে চিকিৎসাবিদ লিয়াকত জানান, সুইডেনে অবস্থানকালে দিনভর পিএইচডি গবেষণায় ল্যাবে থাকার পরও রাত জেগে তারা একসঙ্গে অসংখ্য সিনেমা দেখেছেন। সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড এবং চলচ্চিত্র তাদের মেলবন্ধন ও বোঝাপড়ার পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি। 

উল্লেখ্য, ড. আসমা চৌধুরী পথিকৃৎ ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা ট্রাস্টি ও সংস্কৃতি বিকাশ কেন্দ্রের ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজী বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ছিলেন। 

১৯৯৭ সালে সংস্কৃতি বিকাশ কেন্দ্র প্রকাশিত বাংলা ভাষার প্রথম নির্ঘণ্ট পত্রিকা “সূচিপত্র”-এর সম্পাদক ছিলেন আসমা চৌধুরী। এছাড়া দেশে-বিদেশে শিল্প, সাহিত্য, সংস্কৃতি নিয়ে তার অসংখ্য লেখা প্রকাশিত হয়েছে। মূল রচনা ছাড়াও তিনি মওলানা আবুল কালাম আজাদের “ইন্ডিয়া উইনস ফ্রিডম” বইটি ড. লিয়াকত আলির সঙ্গে যৌথভাবে অনুবাদ করেছেন। এছাড়া চিলির বিখ্যাত সাহিত্যিক হোসে ডোনোসোর সঙ্গে ফার্নান্দোর সাক্ষাতকারের অনুবাদও করেছেন তিনি। পাশাপাশি এশিয়াটিক সোসাইটি, বাংলা একাডেমি, বাংলাদেশ ইতিহাস পরিষদ, The international Association of the Teacher of English as a Foreign Language ইত্যাদির মতো সাংস্কৃতিক ও সামাজিক সংগঠনের সঙ্গে জড়িত ছিলেন তিনি। 

জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সেমিনার ও কনফারেন্সে ১০টি প্রবন্ধ উপস্থাপন করেছেন ড. আসমা। বিভিন্ন উপলক্ষে যুক্তরাজ্য, সুইডেন, ফিনল্যান্ড, জার্মানি, ইতালি, স্পেন, দক্ষিণ আফ্রিকা, মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড প্রভৃতি দেশ ভ্রমণ করেছেন বিদুষী এই নারী। ব্যক্তি জীবনে তিনি ড. লিয়াকত আলির স্ত্রী ছাড়াও চলচ্চিত্র পরিচালক কন্যা দৃষ্টি তন্ময় এবং পুত্র ডা. নিবিড় অনুভবের জননী। 

২০১৭ সালের ১১ সেপ্টেম্বর ক্যান্সারজনিত কারণে মৃত্যুবরণ করেন বিদুষী এই নারী। তার অনন্য অবদান চিরজাগরুক রাখার উদ্দেশ্যে পথিকৃৎ ফাউন্ডেশন প্রতিবছর ড. আসমা চৌধুরী স্মরণে বক্তৃতা আয়োজন করে থাকে।

   

About

Popular Links

x