Monday, May 20, 2024

সেকশন

English
Dhaka Tribune

গল্প : শফিউদ্দিনের এক ট্রিপ

মিরপুর থেকে উত্তরা এখন কাছে। মেট্রোরেলের নিচ দিয়ে নতুন রাস্তা হয়েছে। আবার গ্যাসও নেওয়া যাবে

আপডেট : ২০ নভেম্বর ২০২৩, ০৫:১৩ পিএম

সকালটা খুব তাড়ার শফিউদ্দিনের। সে থাকে মিরপুর দুয়ারিপাড়ার এক ভাড়া টিনশেড ঘরে। সিএনজি অটোরিকশা চালায়। দিনে মালিকের জমা বারো শ টাকা। শফিউদ্দিনের বউ জাহানারা ঘরে সেলাইয়ের কাজ করে। এ দম্পতির একমাত্র মেয়ে নূরীর বয়স পাঁচ। কাছের এক মাদ্রাসায় হিফজ পড়ছে ও।

জাহানারা ওঠে সবার আগে। ফজরের সময়। ভাত, তরকারি চুলায় বসিয়ে নূরীকে ঘুম থেকে জাগায়। রাত করে গাড়ি চালিয়ে আসা শফিউদ্দিন ওঠে এরপর।    

টিনশেডে সকালে টয়লেটের জন্য লাইন দিতে হয়। এখানের নিবাসী নারী-পুরুষ প্রায় সবাই গার্মেন্ট কর্মী। লেট হলে তাদের বেতন কাটা যাবে। কারও টয়লেটে বেশি সময় লাগলে তার মাদার, ভাতার তুলে গালিগালাজ চলে লাইনে। টয়লেটের দরজায় কালো হরফে এলোমেলো ভাবে লেখা- “জরিনারে...”। এর লেখক যেমন অজানা, তেমনই এখানে দু’বছর থাকা হলেও শফিউদ্দিন আজও জানে না, জরিনা কে?  

ভাত খেতে খেতে টিভির নিউজ দেখা শফিউদ্দিনের প্রধান কাজ। তিন বছর আগে এক মামলায় জেলে গিয়েছিল সে। তার বন্ধু মাহমুদ বিরোধী দলের রাজনীতিতে যুক্ত। একদিন বন্ধু তাকে পার্টি অফিস নিয়ে যায়। এরপর সেখানে রেইড হয়। গণমামলায় ছয় মাস জেল খাটে শফিউদ্দিন। কী যে কষ্ট গেছে তখন জাহানারা আর নূরীর ওপর দিয়ে! ছোট্ট মেয়েকে অনেক দিন শুধু ভাতের মাড় খাইয়েছে বউ। কোনো দিন বাসা-বাড়িতে ঝি এর কাজ করেনি জাহানারা। শফিউদ্দিন জেলে থাকার সময় তাও করেছে সে।  

এখন ভোটের আগের সময়টায় দেশে গণ্ডগোল চরমে। কোনো দিন হরতাল। কোনো দিন অবরোধ। শফিউদ্দিন সেদিন দেখল পল্টনে মিছিল। গাড়ি আর নড়ে না। আবার গাবতলীতে অবরোধেও একই দশা। এরচেয়ে ভয়াবহ হচ্ছে যানবাহনে আগুন দেওয়া হচ্ছে।

এমনিতেই জ্যামে অচল ঢাকা। যখন তখন রাস্তা আটকে ভিআইপিরা যায়। এর মধ্যে মিছিল, মিটিং থাকলে পরিস্থিতি আরও অসহ্য হয়। ট্রিপ কমে যায়। রাতে গ্যারাজে গাড়ি জমা দেওয়ার সময় মালিক তো তা শুনবে না। সকালে খবর দেখে শফিউদ্দিন বুঝতে চায় শহরের ভাব।       

আজ ভাত খাওয়ার সময় নূরী বলে,

: মা, ভাত শক্ত লাগে।

জাহানারা জবাব দেয় শফিউদ্দিনকে শুনিয়ে। 

: মারে গ্যাসের সিলিন্ডার তো শেষ। হ্যায় আজ নতুনডা না আনলে রাইতে উপোস।

শফিউদ্দিন টিভির খবর থেকে বাস্তবে ফেরে। ভাত আসলেই সেদ্ধ হয়নি। সে আধ খাওয়া ভাত প্লেটে রেখে হাত ধুয়ে ফেলে। নূরীকে মাদ্রাসায় দিয়ে এসে তাড়াতাড়ি গাড়ি নিয়ে নামতে হবে। বেশি ট্রিপ দিতে হবে আজ। বউয়ের কথার জবাব দেয় না। নূরীর দিকে তাকিয়ে বলে,

: মা, জলদি চলো। রাইতে আমরা ডিম ভাজি দিয়া ভাত খামুনে। 

নূরীর হাত ধরে শফিউদ্দিন বের হচ্ছে। জোরে হাঁটার প্রস্তুতি। এর মধ্যে পাড়ার দোকানের আলী ভাইয়ের ডাক।  

: শফিউদ্দিন, একটু শুইন্যা যাইও।

শফিউদ্দিন মনে করার চেষ্টা করে এই দোকানে গত মাসে মোট কত বাকি হয়েছে। নূরীকে নিয়ে সে আলীর সামনে যায়।

: আলী ভাই, বাকি তো বহুত জানি। আইজ পাঁচ শ হইলেও দিতে চেষ্টা করুম। 

আলী ভাই গাড়ি থেকে নামা এক কাস্টমারকে ডায়েট পেপসি দিচ্ছিলেন। এরপর নূরীর মাথা হাত বুলিয়ে দেন। 

: কীরে মা, সুরা মুখস্ত করায় কত দূরে গেলি?
 
নূরী চুপ থাকে। একটি লজেন্স তুলে দেন আলী নূরীর হাতে। শফিউদ্দিনের কথার উত্তরে বলেন।

: দিও ভাই। জিনিসপত্রের যে দাম..তোমারে তো কিছু বুঝানোর নাই। 

শফিউদ্দিন গ্যারাজে যায়। গাড়ি নেয়। ড্রাইভিং সিটে বসে দেখে গ্যাস কম আছে। পথে কোথাও থেকে নিতে হবে। বর্ধিত পল্লবীর স্ট্যান্ডে প্যাসেঞ্জারের আশায় থাকে। সকালে এ জায়গা খুব ব্যস্ত সরগরম। একদিকে কাঁচাবাজার। অন্যদিকে নতুন মসজিদের জন্য টাকা তোলা হচ্ছে মাইকে। এক মশারি বিক্রেতা ধুমসে মশারি বিক্রি করছেন ভ্যানে। জটলা জমে গেছে তাকে ঘিরে। এবার ডেঙ্গু ভয়াবহ। তাই মানুষের এমন মশারি কেনার ঝোঁক। 

এক যাত্রী শনির আখড়া যেতে চান। শফিউদ্দিন যাবে না জানায়। ঐ দিক গেলে পুরা দিন মাটি। ১০ মিনিট পর যাত্রী পায় সে। উত্তরার প্যাসেঞ্জার। চোখে তার সানগ্লাস। হাতে ব্যাগ।

মিরপুর থেকে উত্তরা এখন কাছে। মেট্রোরেলের নিচ দিয়ে নতুন রাস্তা হয়েছে। আবার গ্যাসও নেওয়া যাবে।  

উত্তরার প্যাসেঞ্জার গাড়িতে উঠেই বললেন,

: ভাই, সিগারেট খাই? কী বলেন?

শফিউদ্দিন ভাবে শরিফ আদমি। সিগারেট খাওয়ারও পারমিশন চায় সিএনজিওয়ালার থেকে। উত্তরে সে বলে,

: ভাই, খান কোনো সমস্যা নাই।

এদিকে জ্যাম নেই। সিএনজি চলছে। পথে প্যাসেঞ্জারের ফোনে বলা কথা শফিউদ্দিনের কানে আসছে। বারবার সে শুনতে পাচ্ছে, “ তুমি কোথায়? আমি কোত্থেকে তোমাকে পিক করব? অ্যালার্ট থেকো। পরিস্থিতি ভালো না। আমি সিএনজিতে।”

একটু পর পরই ফোন। প্যাসেঞ্জার ফোনে বলছেন তার অবস্থান। কয়েকবার শফিউদ্দিন শুনতে পেল “চেকপোস্ট” শব্দটি। 

উত্তরার শেষ মেট্রো স্টেশন তখন। যাত্রী নামবেন মাসকট প্লাজায়। শফিউদ্দিনের সিএনজি তখন উত্তরার ভেতরের রাস্তায়। ছোট রাস্তাগুলোয় বেশ জ্যাম। প্যাসেঞ্জার মনে হয় সিএনজিতে আরও কাউকে তুলবেন। তিনি বারবার লোকেশন বলছিলেন। আর লোকটি প্রচুর সিগারেট খাচ্ছেন। শফিউদ্দিন ভাবে ওনার বোধ হয় খুব তাড়া আছে।  
   
মাসকট প্লাজার কাছাকাছি এখন সিএনজি। পুরো রাস্তা জ্যাম। কারণ, পুলিশ চেকপোস্ট বসিয়েছে। সাধারণত এমন হয় না। শফিউদ্দিনের প্যাসেঞ্জার সাথে সাথে বলে,

: ভাই, টাকা রাখেন। বাকি পথ হেঁটে যাব। 

লোকটি দ্রুত ভাড়া চুকিয়ে নেমে যায়। ভিড়ে শফিউদ্দিনের দেখাও হয় না কোথায় গেল সে। সামনে এক অটোরিকশার সঙ্গে রিকশার লেগেছে। ক্যাচাল চলছে। খুব তাড়াহুড়ার সময়। 

হঠাৎ শফিউদ্দিনের চোখ পড়ে পেছনের সিটে। সেই প্যাসেঞ্জার ভাইয়ের ব্যাগ। লোকটি ব্যাগ রেখে গেছে। কোনো কাগজ বা ঠিকানা পাওয়া যদি যায় সেই ভরসায় সে ব্যাগের চেইন খোলে। তাজ্জব হয়ে যায় সে। পুরো ব্যাগ ভর্তি ডলার। কোনো কাগজপত্র পেল না সে। আর দুই গাড়ি পর চেকপোস্ট। পুলিশকে ঠিক কী বলবে ভেবে পায় না শফিউদ্দিন। তার মামলা ও জেল খাটার বিষয় পুলিশ জানলে কী করবে? ভোটের আগে এতগুলো ডলারই বা কী কাজে? 

শফিউদ্দিন চোখ বন্ধ করে নূরীর কথা ভাবে। মেয়েটাকে কথা দেওয়া ছিল রাতে ডিম দিয়ে ভাত খাওয়াবে।

About

Popular Links