Thursday, June 04, 2026

সেকশন

English
Dhaka Tribune

যে হিন্দু ব্রাহ্মণরা কারবালা স্মরণে ‘আশুরা’ পালন করেন

এই সম্প্রদায়টি ‘হুসাইনি ব্রাক্ষ্মণ” নামে পরিচিতি

আপডেট : ০৫ জুলাই ২০২৫, ০৯:৩৪ পিএম

ইসলামি বর্ষপঞ্জির প্রথম মাস মহররম। আর এই মাসের দশম দিন "আশুরা" নামে পরিচিত। আরবিতে "আশারা" শব্দের অর্থ ১০। সেখান থেকেই মহররমের ১০ তারিখকে "আশুরা" বলা হয়। আশুরা ইসলামের ইতিহাসে বিভিন্ন দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ একটি দিন।

আশুরার দিনই আল্লাহ হজরত আদম (আ.)-কে সৃষ্টি করেন। এই দিনেই তিনি নুহ (আ.)-এর জাহাজকে মহাপ্লাবনের পর নিরাপদে পর্বতে স্থির করেন। হজরত ইব্রাহিম (আ.) এই দিন আগুন থেকে মুক্তি লাভ করেন, ইউনুস (আ.) মাছের পেট থেকে উদ্ধার পান, আইয়ুব (আ.) রোগমুক্ত হন, সুলাইমান (আ.) রাজত্ব ফিরে পান এবং হজরত ঈসা (আ.) জন্মগ্রহণ করেন ও আকাশে উঠিয়ে নেওয়া হয়। এই দিনই ইয়াকুব (আ.) তার বহুদিনের হারানো সন্তান ইউসুফ (আ.)-কে ফিরে পান।

তবে আশুরার দিনে সবচেয়ে যে ঘটনাটি সবচেয়ে বেশি হৃদয়বিদারক, সেটি হলো কারবালার প্রান্তরে ইসলাম ধর্মের শেষ নবি হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর প্রিয় দৌহিত্র হযরত হোসাইন (রা.)-এর শাহাদাত।

এদিকে, ইসলাম ধর্মের গুরুত্বপূর্ণ এই ঘটনার সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে হিন্দু ধর্মের একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর নাম।

ইমাম হোসাইনের অনুগত, অথচ ধর্মবিশ্বাসে হিন্দু ব্রাহ্মণ - এই সম্প্রদায়টি "হুসাইনি ব্রাহ্মণ" নামে পরিচিত। ভারতের কোনো কোনো জায়গায় তাদের "মোহিয়াল ব্রাহ্মণ" নামেও ডাকা হয়।

পাকিস্তানের সিন্ধু প্রদেশ, ভারতের পাঞ্জাব, মহারাষ্ট্র, রাজস্থান, কাশ্মীর, দিল্লি ও লখনৌর নানা প্রান্তে এখনো বেশ কয়েক হাজার হুসাইনি ব্রাহ্মণ ছড়িয়ে ছিটিয়ে বসবাস করেন বলে জানিয়েছে সংবাদমাধ্যম বিবিসি বাংলা। গবেষকরা বলছেন, আরব উপদ্বীপেও বেশ কিছু হুসাইনি ব্রাহ্মণ বসবাস করেন।

বিবিসি বলছে, "মোহিয়াল"রা হিন্দু ব্রাহ্মণদের মধ্যে যোদ্ধার জাত হিসেবে পরিচিত ছিলেন, আজও তাদের বংশধররা অনেকে আর্মিতে যোগ দিয়ে থাকেন। ফলে ভারতীয় সেনাবাহিনীতে অনেক হুসাইনি ব্রাহ্মণকে দেখা যায়।

এখন প্রশ্ন হলো, হিন্দু সম্প্রদায়ের হয়েও এই গোষ্ঠাটি কেন ইমাম হোসাইন (রা.) এর অনুসারী?

জনশ্রুতি রয়েছে, ৬৮০ খ্রীষ্টাব্দ বা হিজরি ৬১ সনের কারবালার যুদ্ধে ইমাম হোসাইনের হয়ে যুদ্ধ করেছিলেন ভারতের এক হিন্দু সারস্বত ব্রাহ্মণ। যার নাম রিহাব সিধ দত। শুধু নিজে যুদ্ধ করাই নয়, তার সাত পুত্রও নাকি সেই যুদ্ধে অংশ নিয়ে শহিদ হন।

বিবিসি বাংলা বলছে, রিহাব সিধ দতের উত্তরসূরীরা আজ শত শত বছর পরেও ইমাম হোসাইনের প্রতি শ্রদ্ধা আর কৃতজ্ঞতাপাশে বাঁধা পড়ে আছেন – যে কারণে তারা নিজেদের ধর্ম না পাল্টালেও শিয়া ইসলামের অনেক রীতিনীতি, বিশেষ করে মহররম মাসে আশুরা পালন করে চলেছেন।

ইন্দো-ইসলামিক স্কলার গুলাম রসুল দেহলভির মতে, হুসাইনি ব্রাহ্মণরা হলেন প্রাচীন ভারত ও ইসলামী বিশ্বের মধ্যে সম্পর্কের এক অতুলনীয় নিদর্শন।

এ বিষয়ে রসুল দেহলভি বিবিসিকে বলেন, "স্বৈরাচারী ইয়াজিদ যখন ইমাম হোসাইনকে কারবালার প্রান্তরে সপরিবারে মেরে ফেলার চক্রান্ত করলেন, তখন তিনি বিশ্ব মানবতার উদ্দেশে আহ্বান জানিয়েছিলেন 'হাল মিন নাসিরিন ইয়ানসুরনা!' – যার অর্থ কেউ কি কোথাও আছে, যারা আমাদের সাহায্য করতে পারে?"

ইতিহাসের বরাত দিয়ে রসুল দেহলভি জানান, সেই ডাকে সাড়া দিলেন সুদূর ভারতের (হিন্দুস্তান) রাজা সমুদ্রগুপ্ত, যিনি ইমাম হোসাইনের পুত্র আলি আকবরের কাছ থেকেও সাহায্যের আবেদন জানিয়ে পাঠানো একটি বার্তা পেয়েছিলেন।

এদিকে, ইউফ্রেটিস (ফোরাত) নদীর পানি আটকে দিয়ে ইয়াজিদের সেনারা ততক্ষণে ইমাম হোসাইন ও তার সঙ্গীদের মৃত্যুর পথ তৈরি করে ফেলেছেন।

অন্যদিকে, রাজা সমুদ্রগুপ্ত তার বীর সৈন্যদের একটি দলকে কারবালায় পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিলেন, যার নেতৃত্বে ছিলেন বীর যোদ্ধা রিহাব সিধ দত – যিনি পাঞ্জাবের একজন মোহিয়াল ব্রাহ্মণ।

গুলাম রসুল দেহলভি বিবিসিকে বলেন, "কিন্তু দত ও তার সাহসী সেনারা যখন কারবালায় পৌঁছলেন, ততক্ষণে ইমাম হোসাইন শহীদ হয়েছেন। ক্ষোভে-দু:খে ভারত থেকে যাওয়া ওই সৈন্যরা স্থির করলেন নিজেদের তরবারি দিয়েই তারা নিজেদের শিরশ্ছেদ করবেন। কিন্তু ইমামের আরব অনুরাগীরা তাদের বোঝালেন, এভাবে জীবন নষ্ট না করে তারা বরং জনাব-ই-মুখতারের বাহিনীতে যোগদান করুন এবং ইমামের মৃত্যুর প্রতিশোধ নেওয়ার লড়াইতে সামিল হোন! রিহাব দত ও তার বাহিনী ঠিক সেটাই করেছিলেন – ইয়াজিদের বিরুদ্ধে মরণপণ যুদ্ধ করে প্রাণোৎসর্গ করেছিলেন।"

   

About

Popular Links

x