দক্ষিণ আমেরিকার বৃহত্তম দেশ ব্রাজিলকে বিশ্ব সাধারণত ফুটবল, কার্নিভাল আর প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের জন্য চিনলেও, দেশটির মাটিতে ইসলামের রয়েছে এক দীর্ঘ, বেদনাবিধুর এবং গৌরবময় ইতিহাস। দাসত্ব, নির্মম নির্যাতন ও ধর্মীয় নিপীড়নের অন্ধকার অধ্যায় অতিক্রম করে আজ ব্রাজিলের মুসলিম সমাজ শিক্ষা, ব্যবসা, সামাজিক নেতৃত্ব এবং শক্তিশালী ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে নিজেদের একটি সম্মানজনক অবস্থান তৈরি করতে সক্ষম হয়েছে।
বর্তমানে ব্রাজিলে প্রায় দেড় লাখ মুসলমান বসবাস করেন, যা দেশটির মোট জনসংখ্যার প্রায় ০.১%। দীর্ঘ প্রায় পাঁচ শতকের পরিক্রমায় এই সম্প্রদায়টি আজ লাতিন আমেরিকার অন্যতম অগ্রসর জনগোষ্ঠীতে পরিণত হয়েছে।
ইতিহাস ঘেঁটে জানা যায়, ষোড়শ শতকের শুরুতে পর্তুগিজ নাবিক পেদ্রো আলভারেস কারব্যাল যখন ব্রাজিল উপকূলে পৌঁছান, তখন তার সঙ্গে বেশ কয়েকজন মুসলিম নাবিক ছিলেন। তাঁদের মাধ্যমেই এই অঞ্চলে প্রথম ইসলামের পরিচয় ছড়িয়ে পড়ে। এই ক্ষেত্রে ইতিহাসে শিহাবুদ্দিন ইবনে মাজেদ এবং মুসা ইবনে সাতির নাম বিশেষভাবে স্মরণীয়। এর পাশাপাশি, স্পেনে মুসলিম শাসনের অবসানের পর বহু স্প্যানিশ মুসলমানও আটলান্টিক মহাসাগর পাড়ি দিয়ে ব্রাজিলে আশ্রয় গ্রহণ করেছিলেন। পরবর্তীতে আমেরিকা আবিষ্কারের প্রাথমিক সময়ে পর্তুগিজ শাসকেরা আফ্রিকান মুসলমানদের দাস হিসেবে ব্রাজিলে নিয়ে আসা শুরু করলে এই অঞ্চলে মুসলিম জনসংখ্যা বৃদ্ধি পায়।
ব্রাজিলের জাতীয় জাদুঘরে সংরক্ষিত বিভিন্ন ঐতিহাসিক দলিল থেকে জানা যায়, আফ্রিকান বংশোদ্ভূত মুসলিম দাসেরা কঠিন দাসজীবনের মধ্যেও নিজেদের ঈমান ও ধর্মীয় পরিচয় দৃঢ়ভাবে ধরে রেখেছিলেন। তারা আরবি ভাষায় কুরআন তিলাওয়াত করতেন এবং গোপনে ইসলামের মৌলিক শিক্ষাগুলো চর্চা করতেন। তাদের মধ্যে যারা বয়সে প্রবীণ ও জ্ঞানী ছিলেন, তারা অন্যদের কুরআন, ফিকহ ও শরিয়তের শিক্ষা দিতেন।
নিপীড়নের একপর্যায়ে ১৬০৫ সালে ব্রাজিলের উত্তরাঞ্চলের আলমিরস এলাকায় প্রায় ৩০ হাজার কৃষ্ণাঙ্গ মুসলমান দাসত্বের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করেন। তরুণ মুসলিম নেতা জানজা জুম্বা নিপীড়িত মুসলমানদের জন্য সেখানে একটি স্বাধীন মুসলিম রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন, যা তার উত্তরসূরিরা প্রায় এক শতাব্দীকাল টিকিয়ে রেখেছিলেন। পরবর্তীতে ১৬৯৪ সালে পর্তুগিজ বাহিনীর ভারী আক্রমণের মুখে আলমিরসের পতন ঘটে। এরপর মুসলমানদের ওপর আবারও জোরপূর্বক খ্রিষ্টান ধর্ম চাপিয়ে দেওয়াসহ নানামুখী ভয়াবহ নির্যাতন নেমে আসে। ১৮৮৮ সালে ব্রাজিলে দাসপ্রথা বিলুপ্ত হওয়ার আগ পর্যন্ত এই ধারা অব্যাহত ছিল।
উনিশ শতকের শেষভাগ থেকে ব্রাজিলের মুসলমানদের ভাগ্যের পরিবর্তন শুরু হয়। আরব-ইসরাইল যুদ্ধ, লেবাননের গৃহযুদ্ধ এবং মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে লেবানন, ফিলিস্তিন, মিসর ও সিরিয়া থেকে বিপুলসংখ্যক মুসলিম অভিবাসী ব্রাজিলে আগমন করেন। এর ফলে ব্রাজিলের সঙ্গে আরব ও মুসলিম বিশ্বের সম্পর্ক গভীর হয়।
বিগত ও চলতি শতাব্দীতে ব্রাজিলে আগত এই মুসলিম অভিবাসীদের বড় অংশই দেশটির ব্যবসা-বাণিজ্যের হাল ধরেন। বর্তমানে ব্রাজিলের জাতীয় অর্থনীতিতে মুসলিম ব্যবসায়ীরা গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছেন। ব্যবসা ছাড়াও সরকারি চাকরি, শিক্ষা ও চিকিৎসাক্ষেত্রে মুসলমানরা দক্ষতার পরিচয় দিচ্ছেন।
বর্তমানে ব্রাজিলের প্রায় প্রতিটি প্রধান শহরেই মুসলমানদের জন্য ধর্মীয় উপাসনালয় রয়েছে। দেশটিতে এখন মসজিদের সংখ্যা প্রায় ১৩০টি, যা ২০০০ সালের তুলনায় প্রায় চার গুণ বেশি। নতুন প্রজন্মের শিশুদের ইসলামি শিক্ষার জন্য দেশটিতে গড়ে উঠেছে মক্তব, মাদ্রাসা ও ইসলামিক স্কুল। এসব ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তা ও বিভিন্ন কার্যক্রমে দেশটির সরকারও প্রাতিষ্ঠানিক সহযোগিতা প্রদান করে থাকে।
ভৌগোলিক দিক থেকে ব্রাজিলের সাও পাওলো এবং রিও ডি জেনিরো শহরে সবচেয়ে শক্তিশালী ও বৃহৎ মুসলিম কমিউনিটি গড়ে উঠেছে। বিশেষ করে রিও ডি জেনিরোতে রয়েছে বিশাল ইসলামিক সেন্টার ও একাধিক বড় মসজিদ। এছাড়া রিও গ্রান্দে দো সুল এবং পারানা অঞ্চলেও আরব বংশোদ্ভূত উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মুসলিম সম্প্রদায়ের বসবাস রয়েছে। ইতিহাসবিদদের মতে, দাসত্বের শৃঙ্খল ও দীর্ঘ প্রতিকূলতা পেরিয়ে ব্রাজিলের মুসলমানদের এই পুনর্জাগরণ লাতিন আমেরিকার ইতিহাসে এক অনন্য দৃষ্টান্ত।



