Wednesday, July 15, 2026

সেকশন

English
Dhaka Tribune

ইংল্যান্ড-আর্জেন্টিনা: যুদ্ধ, বিতর্ক, বৈরিতা আর প্রতিশোধের ৬০ বছরের গল্প

আজ বিশ্বকাপ সেমিফাইনালে মুখোমুখি হচ্ছে ইংল্যান্ড ও আর্জেন্টিনা। ‘হ্যান্ড অব গড’, ফকল্যান্ড যুদ্ধ বা বেকহামের লাল কার্ডের আগেই দুই দলের বৈরিতার বীজ বপন হয়েছিল ১৯৬৬ বিশ্বকাপের এক বিতর্কিত ম্যাচে, যা পরে ফুটবলে হলুদ ও লাল কার্ড চালুর পথও তৈরি করে।

আপডেট : ১৫ জুলাই ২০২৬, ০৫:১৬ পিএম

এমবাপ্পে-দেম্বেলের ফ্রান্সকে যেভাবে রুদ্ধ করে ফাইনালে জায়গা করে নিল স্পেন, তাতে মঙ্গলবারের সেমিফাইনালকে এবারের বিশ্বকাপের সেরা ম্যাচ বললেও খুব একটা আপত্তি থাকার কথা নয়। 

তবে ফুটবলবোদ্ধাদের বিশ্বাস, বুধবার আটলান্টায় ইংল্যান্ড ও আর্জেন্টিনা মুখোমুখি হওয়ার পর সেই আলোচনা বদলে যেতে পারে।

কারণ, ইংল্যান্ড-আর্জেন্টিনা কখনোই শুধু একটি ফুটবল ম্যাচ নয়। এটি এমন এক প্রতিদ্বন্দ্বিতা, যেখানে প্রতিটি সাক্ষাৎ জন্ম দিয়েছে নতুন ইতিহাসের। কখনও বিতর্ক, কখনও যুদ্ধ, কখনও প্রতিশোধ, আবার কখনও ফুটবলের সবচেয়ে স্মরণীয় মুহূর্ত।

এই গল্পের শুরু ১৯৬৬ বিশ্বকাপে।

সেবার কোয়ার্টার ফাইনালে আর্জেন্টিনার অধিনায়ক আন্তোনিও রাট্টিনকে বিতর্কিতভাবে মাঠ থেকে বের করে দেন পশ্চিম জার্মানির রেফারি রুডলফ ক্রাইটলাইন। অভিযোগ ছিল, রাট্টিন তাকে অপমান করেছেন। কিন্তু বিস্ময়কর বিষয় হলো, রেফারি স্প্যানিশ জানতেন না, আর রাট্টিন জানতেন না জার্মান বা ইংরেজি। সেই সময়ে ফুটবলে লাল কিংবা হলুদ কার্ডের প্রচলনও ছিল না। ফলে রেফারির মৌখিক সিদ্ধান্তই ছিল শেষ কথা।

রাট্টিন সিদ্ধান্ত মেনে নেননি। দোভাষীর দাবি জানিয়ে দীর্ঘ সময় মাঠ ছাড়তে অস্বীকৃতি জানান। পরে ক্ষোভে রাজকীয় গ্যালারির সামনে লাল কার্পেটে বসে প্রতিবাদ করেন। গ্যালারি থেকে তার দিকে ছুড়ে মারা হয় বিয়ারের ক্যান ও চকোলেট। শেষ পর্যন্ত ১০ জনের আর্জেন্টিনা ১-০ গোলে হেরে বিদায় নেয়। ইংল্যান্ড পরে নিজেদের ইতিহাসের একমাত্র বিশ্বকাপও জিতে নেয়। অন্যদিকে আর্জেন্টিনায় ম্যাচটি আজও পরিচিত ‘এল রোবো’ -- অর্থাৎ ‘ডাকাতি’ নামে।
কিন্তু সেই বিতর্কের প্রভাব শুধু একটি ম্যাচেই সীমাবদ্ধ ছিল না। ভাষাগত বিভ্রান্তি ও রেফারিং সংকট থেকেই সাবেক রেফারি কেন অ্যাস্টনের মাথায় আসে হলুদ ও লাল কার্ডের ধারণা, যা ১৯৭০ বিশ্বকাপ থেকে চালু করে ফিফা।
এরপর প্রতিদ্বন্দ্বিতা ছড়িয়ে পড়ে মাঠের বাইরেও। ১৯৮২ সালে ফকল্যান্ড যুদ্ধ দুই দেশের সম্পর্কে নতুন মাত্রা যোগ করে। কয়েক মাস পরই ১৯৮৬ বিশ্বকাপে সেই ক্ষত যেন ফুটবল মাঠে বিস্ফোরিত হয়।

সেদিন দিয়েগো ম্যারাডোনা ইংল্যান্ডের বিপক্ষে করেন ইতিহাসের সবচেয়ে বিতর্কিত গোল – “হ্যান্ড অব গড”। 

মাত্র চার মিনিট পর একই ম্যাচে করেন এমন এক গোল, যেটিকে আজও অনেকেই ইতিহাসের সেরা গোল বলে মনে করেন। আর্জেন্টিনার কাছে সেটি ছিল শুধু সেমিফাইনালে ওঠা নয়, ফকল্যান্ড যুদ্ধের ক্ষত থেকে জন্ম নেওয়া এক প্রতীকী প্রতিশোধ। সেই বিশ্বকাপও শেষ পর্যন্ত জিতেছিল ম্যারাডোনার দল।

১৯৯৮ সালে আবার মুখোমুখি দুই দল। এবার আলোচনার কেন্দ্রে ডেভিড বেকহাম। মাঠে পড়ে থাকা অবস্থায় দিয়েগো সিমিওনেকে লাথি মেরে লাল কার্ড দেখেন ইংলিশ মিডফিল্ডার। ম্যাচ গড়ায় টাইব্রেকারে, যেখানে জিতে যায় আর্জেন্টিনা। চার বছর পর ২০০২ বিশ্বকাপে আবারও দেখা। এবার পেনাল্টি থেকে একমাত্র গোল করে ইংল্যান্ডকে জেতান সেই বেকহামই, শেষ করে দেন আর্জেন্টিনার শিরোপার স্বপ্ন।

তাই আটলান্টার সেমিফাইনালকে কেবল মেসি বনাম ইংল্যান্ড কিংবা ফাইনালে ওঠার লড়াই হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এই দ্বৈরথের প্রতিটি অধ্যায় ফুটবল ইতিহাসে আলাদা জায়গা করে নিয়েছে।

অবশ্য আর্জেন্টিনা কোচ লিওনেল স্কালোনি ইতিহাসের ভার কাঁধে নিতে রাজি নন। তার ভাষায়, “এটি একটি ফুটবল ম্যাচ, এর বেশি কিছু নয়। নতুন একটি অধ্যায়। এর মধ্যে অন্য কিছু খুঁজতে চাই না” ।
তবু ইতিহাস অন্য কথা বলে। 

প্রায় ছয় দশক ধরে ইংল্যান্ড ও আর্জেন্টিনা যখনই মুখোমুখি হয়েছে, ফুটবল পেয়েছে মনে রাখার মতো একটি গল্প। 

আটলান্টাও কি সেই তালিকায় নতুন একটি অধ্যায় যোগ করবে? উত্তর মিলবে ৯০ মিনিট—অথবা তারও পরে।

   

About

Popular Links

x