ফুটবল বিশ্ব আগামী ১৯ জুলাই এক মহাকাব্যিক বিশ্বকাপের ফাইনাল প্রত্যক্ষ করতে যাচ্ছে, যেখানে মুখোমুখি হচ্ছে আর্জেন্টিনা ও স্পেন। তবে এই ট্রফি জয়ের লড়াই ছাড়িয়ে ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে রোমাঞ্চকর আলোচনা এখন ৩৯ বছর বয়সী জীবন্ত কিংবদন্তি লিওনেল মেসি এবং ১৯ বছর বয়সী স্প্যানিশ বিস্ময় বালক লামিন ইয়ামালের দ্বৈরথ। বয়সে ও অভিজ্ঞতায় দুজনের ব্যবধান আকাশ-পাতাল হলেও, মাঠে দুজনের খেলার পজিশন, ধরণ এবং জাদুকরী বাঁ পায়ের কারিশমা এই ফাইনালকে রূপ দিয়েছে এক অদ্ভুত নিয়তির গল্পে।
বার্সেলোনার ইতিহাসের সর্বকালের সেরা গোলদাতা মেসির মুখোমুখি হতে যাচ্ছেন একই ক্লাবের বর্তমান পোস্টারবয় ইয়ামাল। তবে মাঠের লড়াইয়ে এটিই তাদের প্রথম দেখা হলেও, বাস্তব জীবনে তাদের প্রথম দেখা হয়েছিল আজ থেকে প্রায় দুই দশক আগে। ইয়ামাল তখন নিতান্তই এক অবুজ শিশু, আর মেসি ২০ বছরের এক উদীয়মান তারকা।
দুই বছর আগে, ২০২৪ ইউরো কাপে যখন স্পেনের জার্সিতে ইয়ামালের রাজকীয় উত্থান ঘটছিল, ঠিক তখনই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কিছু অবিশ্বাস্য ছবি ছড়িয়ে পড়ে। এই বিশ্বকাপের ফাইনালের প্রেক্ষাপটে সেই ছবিগুলো এখন আরও বেশি তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
ভাইরাল হওয়া প্রথম ছবিটিতে দেখা যায়, একটি প্লাস্টিকের বাথটাবে বসে আছে ছোট্ট শিশু ইয়ামাল। পাশে দাঁড়িয়ে তাঁর মা শেইলা ইবানা এবং কাঁধ পর্যন্ত লম্বা চুলের ২০ বছর বয়সী লাজুক মেসি হাত বাড়িয়ে শিশুটিকে গোসল করাতে সাহায্য করছেন। ইয়ামালের বাবার ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্ট থেকে পরবর্তীতে বিশ্বখ্যাত ফুটবল সাংবাদিক ফ্যাব্রিজিও রোমানোর হাত ধরে ছবিটি মুহূর্তেই বিশ্বজুড়ে ভাইরাল হয়। পরবর্তীতে স্প্যানিশ দৈনিক ডিয়ারিও স্পোর্ট দ্বিতীয় আরেকটি ছবি প্রকাশ করে, যেখানে মেসিকে একাই ছোট্ট ইয়ামালকে কোলে নিয়ে বাথটাবের পাশে বসে থাকতে দেখা যায়।
২০০৭ সালে বার্সেলোনার ক্যাম্প ন্যু’র অ্যাওয়ে ড্রেসিংরুমে এই ছবিগুলো তুলেছিলেন ফ্রিল্যান্স আলোকচিত্রী জোয়ান মনফোর্ট। এটি ছিল কাতালান সংবাদপত্র দিয়ারিও স্পোর্ট এবং জাতিসংঘের শিশু তহবিল (ইউনিসেফ)-এর যৌথ উদ্যোগে একটি দাতব্য ক্যালেন্ডার তৈরির আয়োজন।
পরবর্তীতে বার্তা সংস্থা এপি-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে মনফোর্ট সেই পেছনের গল্প শুনিয়ে বলেন, “ইউনিসেফ মাতারোর রকা ফান্ডা এলাকায় একটি লটারির আয়োজন করেছিল, যেখানে ইয়ামালের পরিবার থাকত। ক্যাম্প ন্যু-তে বার্সার কোনো খেলোয়াড়ের সঙ্গে ছবি তোলার সুযোগ পেতে তারা লটারির টিকিট কাটেন এবং ভাগ্যবশত জিতে যান।”
তবে শুটিংয়ের শুরুটা সহজ ছিল না। মনফোর্ট জানান, মেসি অত্যন্ত অন্তর্মুখী ও লাজুক স্বভাবের ছিলেন। ড্রেসিংরুমে ঢুকে পানি ভর্তি প্লাস্টিকের বাথটাব আর এক শিশুকে দেখে তিনি ঘাবড়ে যান এবং কীভাবে কোলে নেবেন বুঝতে পারছিলেন না। পরে ইয়ামালের মা-ই মেসিকে অভয় দিয়ে ছবি তোলার কাজে সাহায্য করেন। এত বছর পর সেই শিশু ও তরুণ ড্রেসিংরুম থেকে বেরিয়ে আজ বিশ্বমঞ্চের ফাইনালে লড়বেন, যা ভাবতেই রোমাঞ্চিত বোধ করছেন মনফোর্ট।
সেদিনের পর কেটে গেছে দীর্ঘ সময়। মেসি বার্সেলোনা ছেড়েছেন ক্লাব ইতিহাসের সর্বকালের সেরা ফুটবলার হিসেবে আটটি ব্যালন ডি'অর নিয়ে। অন্যদিকে, মাত্র ১৫ বছর ৯ মাস ১৬ দিন বয়সে বার্সার মূল দলে অভিষেক হওয়া ইয়ামাল ইতোমধ্যে তিনটি লা লিগা এবং স্পেনের হয়ে ২০২৪ ইউরো কাপের শিরোপা জিতে নিয়েছেন। সদ্য ১৯ বছরে পা রাখা ইয়ামাল এখন ফুটবল বিশ্বের অন্যতম দামি তারকা।
সম্প্রতি ক্রীড়াভিত্তিক ওটিটি প্ল্যাটফর্ম ‘ডিএজেডএন’-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ইয়ামাল মেসির মুখোমুখি হওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করে বলেছিলেন, “আমি এখন কিছুটা বড় হয়েছি, লিওর বয়সও বেড়েছে। আশা করছি ফাইনালে ওর মুখোমুখি হতে পারব। যেহেতু ফিনালিসিমা ম্যাচটি শেষ পর্যন্ত মাঠে গড়ায়নি, তাই এই ফাইনালটি আমার জন্য অনেক বড় সুযোগ।”
অবশেষে নিয়তি তাদের আবার একই বিন্দুতে এনে দাঁড় করিয়েছে। ফুটবলপ্রেমীদের বড় একটি অংশ ইয়ামালকে বার্সেলোনায় মেসির যোগ্য উত্তরসূরি ভাবলেও, ইতিহাসের সেরা ফুটবলারের উচ্চতায় পৌঁছাতে ইয়ামালকে এখনো পাড়ি দিতে হবে এক দীর্ঘ পথ। তবে রোববারের ফাইনালে বাথটাবের সেই শিশুটিই নাকি চিরসবুজ জাদুকর শেষ হাসি হাসবেন, তা দেখতে উন্মুখ হয়ে আছে পুরো বিশ্ব।



