প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার প্রস্তুতিতে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি হলো নিজের দুর্বলতা চিহ্নিত করা। অনেক সময়ই শিক্ষার্থীরা বুঝতে পারেন না যে ঠিক কোথায় তাঁদের ঘাটতি রয়ে গেছে। কিন্তু কেমন হয়, যদি এই কাজটাই করে দেয় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা? এমন এক ভাবনা থেকেই ‘টেস্টমিত্র এআই’ নামের একটি অ্যাপ তৈরি করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তিন শিক্ষার্থী হাসিবুল আসিফ, নয়ন পাল ও সারাফ লামইয়া। তাঁদের লক্ষ্য ছিল এমন একটি প্ল্যাটফর্ম তৈরি করা, যা শিক্ষার্থীদের প্রস্তুতিকে আরও গোছানো, কাঠামোবদ্ধ এবং ব্যক্তিকেন্দ্রিক করে তুলবে।
‘টেস্টমিত্র এআই’ মূলত ‘কারেক্ট ইঙ্ক’ নামের একটি উদ্যোগের অংশ। শুরুতে হাসিবুল আসিফ ও সারাফ লামইয়া মিলে এই উদ্যোগটি গড়ে তোলেন। অ্যাপ ও ওয়েবসাইট ডেভেলপমেন্টের পাশাপাশি সার্বিক ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে ছিলেন আসিফ, আর কনটেন্ট ও মার্কেটিং সামলাতেন সারাফ। পরে মার্কেটিং লিড হিসেবে যুক্ত হন নয়ন পাল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি ক্লাবেই তাঁদের পরিচয়, যেখানে একসঙ্গে কাজ করতে করতেই গড়ে ওঠে পারস্পরিক বোঝাপড়া ও আস্থা যা পরবর্তীতে এই উদ্যোগকে বাস্তব রূপ দিতে সাহায্য করে।
বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর থেকেই কোচিং ও টিউশনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন তাঁরা। সেখান থেকেই একটি সাধারণ কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা তাঁদের চোখে পড়ে যেমন অনেক শিক্ষার্থী পরিশ্রম করলেও বুঝতে পারছে না, কোথায় তাদের দুর্বলতা। হাসিবুল আসিফের ভাষায়, একটি ক্লাসে একজন শিক্ষকের পক্ষে ৪০-৫০ জন শিক্ষার্থীর প্রত্যেকের ভুল আলাদা করে ধরিয়ে দেওয়া প্রায় অসম্ভব। তাই তাঁরা এমন একটি সমাধান খুঁজতে চেয়েছেন, যেখানে শিক্ষার্থী নিজেই পরীক্ষা দিয়ে নিজের অবস্থান বুঝতে পারবে, আর এআই তাকে জানিয়ে দেবে কোথায় সে ভালো করছে, কোথায় আরও কাজ করা প্রয়োজন।
এই ভাবনা থেকেই তৈরি হয় ‘টেস্টমিত্র এআই’। এটি একটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাচালিত প্ল্যাটফর্ম, যেখানে শিক্ষার্থীরা আগের বছরের প্রশ্ন অনুশীলন করতে পারে, নিজের মতো করে নতুন প্রশ্নপত্র তৈরি করতে পারে, এমনকি এআইয়ের সাহায্যে সমস্যার সমাধানও পেতে পারে। পরীক্ষার পর বিস্তারিত বিশ্লেষণের মাধ্যমে জানা যায় কোন বিষয়ে ভুল বেশি হচ্ছে এবং কোথায় বেশি মনোযোগ দেওয়া দরকার। পাশাপাশি পাওয়া যায় পারফরম্যান্সভিত্তিক একটি স্টাডি প্ল্যান, যা প্রস্তুতিকে আরও কার্যকর করে তোলে।
বর্তমানে “টেস্টমিত্র এআই” এর ব্যবহারকারী সংখ্যা দুই হাজারের বেশি। উদ্যোক্তারা যেহেতু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, তাই নিজেদের ক্যাম্পাসের শিক্ষার্থীদের জন্য তিন মাসের জন্য বিনামূল্যে অ্যাপ ব্যবহারের সুযোগও রেখেছেন তাঁরা। নয়ন পাল জানান, এটি শুধু প্রশ্ন অনুশীলনের একটি প্ল্যাটফর্ম নয়, বরং একটি সম্পূর্ণ পার্সোনালাইজড প্রিপারেশন টুল। ব্যবহারকারীরা এআই দিয়ে নিজেরাই প্রশ্ন তৈরি করে পরীক্ষা দিতে পারে। ইউজার-ফ্রেন্ডলি ইন্টারফেসের কারণে অ্যাপটি ইতিমধ্যেই ভালো সাড়া পাচ্ছে, যদিও ব্যবহারকারীদের কিছু ফিডব্যাক অনুযায়ী বাগ ফিক্স ও উন্নয়ন কাজ চলমান রয়েছে।
তবে শুরুটা মোটেও সহজ ছিল না। ছোট একটি দল নিয়ে অ্যাপ ও ওয়েবসাইট ডেভেলপমেন্ট, গবেষণা, মার্কেটিং, এমনকি ব্যবহারকারীদের ফিডব্যাক সংগ্রহ সবকিছুই সামলাতে হয়েছে তাঁদের। প্রতিনিয়ত ফিডব্যাক নিয়ে সমস্যা সমাধান এবং নতুন ফিচার যুক্ত করার মাধ্যমে এগিয়ে নিতে হয়েছে এই উদ্যোগকে। এখন দল কিছুটা বড় হওয়ায় কাজগুলো ভাগ করে করা যাচ্ছে।
ভবিষ্যতে “টেস্টমিত্র এআই” এ গেমিফিকেশন, এক্সাম ক্যালেন্ডারসহ আরও ইন্টারেক্টিভ ফিচার যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে। কারেক্ট ইঙ্কের সহপ্রতিষ্ঠাতা ও সিইও সারাফ লামইয়া বলেন, শুরু থেকেই তাঁদের লক্ষ্য ছিল বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থাকে আরও প্রযুক্তিনির্ভর ও কার্যকর করে তোলা। সেই লক্ষ্য নিয়েই তাঁরা কাজ করে যাচ্ছেন প্রযুক্তির মাধ্যমে শেখা ও শেখানোর প্রক্রিয়াকে আরও সহজ, স্মার্ট এবং সবার জন্য গ্রহণযোগ্য করে তুলতে।



