ঈদের ছুটিতে প্রতিবছরই কমবেশি দেশি-বিদেশি পর্যটকেরা ছুটে আসেন চায়ের দেশ মৌলভীবাজা-সিলেটে। সেখানে সবুজের প্রকৃতি চা-বাগান, হাওর, লেক, পাহাড়, বনাঞ্চল ও কোলাহলমুক্ত পরিবেশে পরিবার-পরিজন নিয়ে সময় কাটাতে আসেন অনেকেই।
অন্য বছরের তুলনায় এবার পর্যটকের উপস্থিতি তুলনামূলক কম বলে পর্যটন সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। ফলে পর্যটক নিরুসাৎহীত হচ্ছে। অপরেিদক পর্যটকদের অভিমত এবার পর্যটকের চাপ কম থাকায় স্বস্তিদায়ক পরিবেশে পরিবার-পরিজন নিয়ে ঘোরাঘুরি করতে পারছি। তবে সড়কে শৃঙ্খলা না থাকায় ব্যাটারিচালিত টমটম ও সিএনজি অটোরিক্সার কারণে চরম ভোগান্তিতে পড়তে হয়েছে।
পর্যটক কমার কারণ পর্যটন-সংশ্লিষ্টরা বলছেন, হামের প্রাদুর্ভাব, রাস্তাঘাট ভাঙাচোরা, যাতায়াতে ভোগান্তি, ট্রেনের টিকিট সংকট এবং আবহাওয়ার বিরূপ প্রভাবের কারণে ঈদের ছুটিতে প্রত্যাশিত সংখ্যক পর্যটক আসেননি। ফলে পর্যটনকেন্দ্রগুলোতে ভ্রমণপিপাসুদের আনাগোনা থাকলেও নেই আগের বছরের মতো উপচেপড়া ভিড়।
জেলায় দর্শনীয় স্থানগুলোর মধ্যে পর্যটকের কাছে আকর্ষণ হলো- টিলায় সারি সারি বিভিন্ন চা-বাগান, লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান, হাকালুকি হাওর, বাইক্কা বিল হাইল হাওর, মাধবপুর লেক, মাধবকুণ্ড জলপ্রপাত, হামহাম জলপ্রপাত, বাইক্কা বিল হাইল হাওর, রাবার বাগান, চা গাছে সজ্জিত দার্জিলিং টিলা, খাসিয়াপুঞ্জি, মনিপুরী সম্প্রদায়ের তাঁতশিল্প, বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমান স্মৃতি কমপ্লেক্স, বাংলাদেশ চা গবেষণা ইনস্টিটিউট, সাত রঙের চা স্টল, বন্যপ্রাণী সেবা ফাউন্ডেশন, পৃথিমপাশা নবাববাড়ি, পাথারিয়া হিলস রিজার্ভ ফরেস্ট, বর্ষিজোড়া ইকোপার্কসহ বিভিন্ন দর্শনীয় স্থান।
এ ছাড়াও জেলা সদর উপজেলার মাতারকাপন এলাকায় অবস্থিত মনু ব্যারেজ, কমলগঞ্জ উপজেলার শমসেরনগর গলফ মাঠ, ক্যামেলিয়া লেক ও পদ্মছড়া চা বাগান লেক।
বড়লেখা উপজেলার আগর বাগান, শ্রীমঙ্গল উপজেলায় চা কন্যা ভাস্কর্য, টি মিউজিয়াম, ভাড়াউড়া চা বাগান লেক, হরিণ ছড়া গলফ মাঠ, লাল টিলা, শঙ্কর টিলা, রাজনগরের কমলা রানির দীঘি, বরথল চা বাগান লেক, জুড়ীর কাশ্মির টিলা, লাঠি টিলাসহ জেলার বিভিন্ন চা বাগানও অনেকের কাছে পছন্দ।
ঢাকা থেকে ঈদের ছুটিতে পরিবার নিয়ে ঘুরতে আসা পর্যটক মোজাম্মেল হক বলেন, “ঈদের দিন কোরবানির আনুষ্ঠানিকতা শেষ করেই পরদিন সকালে শ্রীমঙ্গলে চলে এসেছি। এখন পরিবারের সদস্যদের নিয়ে বিভিন্ন দর্শনীয় স্থান ঘুরে দেখছি। চারদিকে সবুজের সমারোহ আর প্রকৃতির অপার সৌন্দর্য মনকে ভীষণ প্রশান্ত করেছে। তবে রাস্তাঘাট ভাঙাচোরা থাকার কারণে খুবই ভোগান্তি হয়েছে।”
রাধানগর ট্যুরিজম এন্টারপ্রেনিউর অ্যাসোসিয়েশনের সহ-সভাপতি তাপস দাশ বলেন, “ঈদের দ্বিতীয় ও তৃতীয় দিনে পর্যটক বেড়েছে। কিন্তু হঠাৎ আবহাওয়া পরিবর্তন হয়ে তাপমাত্রা বেড়ে যাওয়ায় অনেক পর্যটক বাইরে ঘোরাঘুরির পরিবর্তে রিসোর্ট ও কটেজের ভেতরেই সময় কাটাচ্ছেন।”
মৌলভীবাজার পর্যটন সেবা সংস্থার সভাপতি সেলিম আহমেদ বলেন, “ঈদের টানা ছুটি থাকলেও মুলত ঈদের পর দিন থেকে হোটেল-রিসোর্ট বুকিং হয়েছে। তবে উল্লেখযোগ্য বুকিং হয়নি। ঈদুল আজহা উপলক্ষে ৪০ থেকে ৫০ ভাগ ডিসকাউন্ট দেওয়া হয়েছে। এ বছর দেশব্যাপী শিশুদের মধ্যে হামের প্রাদুর্ভাব বেড়ে যাওয়ায় পর্যটকদের আগমন কম। এ ছাড়া অতিবৃষ্টি ও সাম্প্রতিক বেকারত্ব বেড়ে যাওয়াও কারণ হিসেবে দেখছে অনেকে।”
ঢাকা সিলেট মহা-সড়কের বেহালদশা ও জেলার পর্যটন এলাকার সংযোগ সড়কের অবস্থা খারাপ থাকায় পর্যটকদের আগমন বেশ কয়েক মাস থেকে কম পরিলক্ষিত হচ্ছে।
রাধানগর নিসর্গ নিরব ইকো কটেজের মালিক কাজী শামছুল হক বলেন, “পর্যটকদের জন্য সবচেয়ে বেশি রিসোর্ট রয়েছে শ্রীমঙ্গলের রাধানগর এলাকায়। সড়কে যানজট থাকায় অনকে পর্যটক আসতে চায় না আবার অনেকে ট্রেনে আসতে চাইলে ট্রেনের টিকিট সংকট, পর্যটকরা টিকেট পায় না, ফলে পর্যটক নিরুসাৎহীত হচ্ছে। যদি পর্যটকের জন্য ঢাকা-সিলেট রেলপথে একটি নতুন ট্রেন যুক্ত করা হলে পর্যটক আরও বাড়বে।”
লাউয়াছড়া রেঞ্জ কর্মকর্তা মো. কাজী নাজমুল হক জানান, ঈদের তৃতীয় দিন লাউয়াছড়ায় ১৭ জন বিদেশী পর্যটকসহ মোট ২৬৩৬ জন দর্শনার্থী জাতীয় উদ্যানে টিকিট কেটে প্রবেশ করেছেন। এতে সরকারের রাজস্ব আয় হয়েছে ৩ লাখ ১৩ হাজার ৭৭৭ টাকা।
মৌলভীবাজার ট্যুরিস্ট পুলিশের ইন্সপেক্টর মো. কামরুল চৌধুরী বলেন, “পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে জেলা পুলিশের সমন্বয়ে জেলা ও উপজেলা প্রশাসন, ট্যুরিস্ট পুলিশ, র্যাব ও বিজিবি যৌথভাবে নিরাপত্তা কার্যক্রম পরিচালনা করছে। পর্যটকদের নিরাপত্তায় ট্যুরিস্ট পুলিশের টহল জোরদার করা হয়েছে। এছাড়াও ঈদে যানজট নিরসনে পর্যটন পুলিশ কাজ করছে।”



