চলছে সারাবিশ্বের মুসলমানদের কাছে পবিত্রতম মাস রমজান। ইসলাম ধর্মাবলম্বীরা এ মাসে আল্লাহর নৈকট্য লাভের আশায় রোজা রাখেন। ইসলামের পাঁচটি স্তম্ভের মধ্যে অন্যতম রোজা। ইমান, নামাজ ও জাকাতের পরই রোজার স্থান। আরবি ভাষায় রোজাকে সাওম বলা হয়, যার আভিধানিক অর্থ বিরত থাকা।
আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের আশায় বিশ্বের কোটি কোটি মুসলমান এই এক মাস সারাদিন পানাহারে বিরত থেকে রোজা রাখেন। রোজার মাসের অন্যতম অনুষঙ্গ ইফতার। ইফতারে ভাজাপোড়া খাবার অনেকেরই পছন্দ। তাই সারাদিন রোজা রাখার পর মুখে রুচি বাড়াতে ইফতারে বাহারি আইটেমের উপস্থিতি সর্বত্র লক্ষণীয়। সেই তালিকায় মুখরোচক ভাজাপোড়া খাবার রয়েছে ওপরের দিকেই।
রমজান মাসে বাংলাদেশের ইফতারে তাই পেঁয়াজু, বেগুনি, ছোলা, আলুর চপ, হালিম, মাংসের তৈরি কাবাবসহ নানা মুখরোচক খাবার অত্যাবশ্যকীয় উপাদানই বটে। সারাদিন পানাহার থেকে বিরত রাখার পর ভাজাপোড়া খাবার ছাড়া যেন অনেকের ইফতারই সম্পন্ন হতে চায় না। তাই ভাজাপোড়া খাবার বাংলাদেশিদের ইফতারের প্রধান আকর্ষণও বটে।
পুরো বছরে তেমন গুরুত্ব না পেলেও রমজান মাস আসামাত্রই বাংলাদেশে ভাজাপোড়া খাবার নিয়ে বাড়তি উন্মাদনা দেখা যায়। বাংলাদেশের সব বাড়িতে তো বটেই, বাজারে খাবারের দোকানগুলোতেও মশলাদার ইফতারি বিক্রির ধুম পড়ে যায়। পুরো রমজান মাসজুড়ে এ রকম মুখরোচক খাবার খাওয়া হলেও বছরের অন্য সময় এভাবে তেমন নিয়মিতভাবে খাওয়া হয় না।
ধর্মীয় বিধিবিধানের কোথাও ইফতারে এ ধরনের মুখরোচক ভাজাপোড়া খাবারের রীতির উল্লেখ আছে বলে শোনা যায় না। বাংলাদেশিদের ইফতারে ভাজাপোড়া খাবারের প্রচলন সম্পর্কে ইসলামের ইতিহাসবিদরা জানান, একেক সময়ে ভারতীয় উপমহাদেশে আসা এবং শাসন করা নানা জাতির বিভিন্ন ধরনের সংস্কৃতির মতো খাবারও এখন এ অঞ্চলের মানুষের খাদ্যতালিকায় যুক্ত হয়ে গেছে। সেভাবেই ইফতারের এ খাবারের তালিকায় মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশের খাবারের সংস্কৃতির ছাপ রয়েছে।
ইফতারে বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর খাবার
এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের অধ্যাপক ড. নুসরাত ফাতেমা যুক্তরাজ্য ভিত্তিক সংবাদমাধ্যম বিবিসি বাংলাকে বলেন, “আমাদের ইফতারে থাকা খাবারগুলোর বড় অংশ পার্সিয়ান বা মুঘল খাবারের তালিকা থেকে এসেছে। এক সময় মুঘলরা ভারতবর্ষ শাসন করতো। তারা যখন ঢাকা শাসন করেছেন, তাদের সেই খাদ্যতালিকা তখনকার ঢাকার লোকজন গ্রহণ করেছে। এরপর ধীরে ধীরে সেটা সারা দেশে ছড়িয়ে পড়েছে।”
তিনি আরও বলেন, “আপনি এমনিতে হয়ত ভাত, মাছ, মাংস ইত্যাদি খাচ্ছেন। কিন্তু যখন ইফতারির প্রসঙ্গে যাবেন, তখন দেখবেন সেখানে বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর খাবার মিশে গেছে। এরকম কয়েকটি খাবার হলো খেজুর, ছোলা, কাবাব, হালিম, বিরিয়ানি, পেঁয়াজু, বেগুনি, চপ, শরবত ইত্যাদি।”
খেজুর: ইসলামের নবী-সাহাবিরা ইফতারের সময় খেজুর খেতেন। ফলে ইফতারের সময় খেজুর খাওয়াকে অনেকে সুন্নাত বলে মনে করেন। মধ্যপ্রাচ্য থেকে ইফতারে খেজুর খাওয়ার রীতিটি সারাবিশ্বে ছড়িয়ে পড়েছে। পুরো পৃথিবীতেই ইফতারের সময় খেজুরকে অন্যতম প্রধান অনুষঙ্গ বলে বিবেচনা করা হয়।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামিক সংস্কৃতি ও ইতিহাসের সহযোগী অধ্যাপক এ কে এম খাদেমুল হক বিবিসিকে বলেন, “হযরত মুহাম্মদ (সা.) রোজা ভাঙার সময় অর্থাৎ ইফতারে খেজুর খেতেন। এ কারণে এটা ভালো অনুষঙ্গ বলে মনে করা হয়। সেজন্যই বাংলাদেশের মানুষ মনে করে, ইফতারিতে খেজুর খাওয়া সুন্নাত।”
শরবত: মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো ছাড়াও আফগানিস্তান, পাকিস্তান ও ভারতে ইফতারে শরবত খাওয়ার রীতি প্রচলিত রয়েছে। পানির পিপাসা থেকে স্বাদ, মিষ্টি ও সুগন্ধি শরবত খাওয়ার চল চালু হয়েছে বলে ধারণা ইসলামী ইতিহাসবিদদের।
ছোলা: ছোলা মূলত আফগানদের প্রিয় খাবার। তারা কাবুলি চানা বা কাবুলি ছোলা খেয়ে থাকে। তাদের কাছ থেকে ভারতীয় উপমহাদেশের বাংলাদেশের মুসলমানরা ছোলাকে ইফতারের অনুষঙ্গ হিসেবে গ্রহণ করেছে। শবে বরাতের সময় যে বুটের হালুয়া তৈরি করা হয়, সেটার আসল নাম হাবশি হালুয়া। এটাও আফগানদের একটা খাবার। তবে ভারত বা বাংলাদেশে এসে সেটা আরও মসলা, পেঁয়াজসহ বিভিন্ন উপাদান দিয়ে মুখরোচকভাবে রান্না করা হয়ে থাকে। ছোলার সঙ্গে মুড়ি খাওয়ার প্রচলনও এখানকার মানুষের নিজস্ব উদ্ভাবন।
কাবাব, হালিম, বিরিয়ানি: বাংলাদেশের খাদ্যতালিকায় থাকা মুঘল খাবারের মধ্যে পারসিক খাবারের প্রভাবটা অনেক বেশি ছিল। তারাই ইফতারে বিরিয়ানি, কাবারের মতো মুখরোচক খাবার খেতো। সেখান থেকেই এ অঞ্চলের বনেদি মানুষজনও এসব খেতে শুরু করে। এমনকি এখনও ইরান, আরব আমিরাত, সৌদি আরবের মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোয় ইফতারের সময় কাবাব সহযোগে বিরিয়ানি বা পোলাও খাওয়ার প্রচলন রয়েছে।
পেঁয়াজু, বেগুনি, চপ: মূলত উত্তর ভারত থেকে বাংলাদেশসহ বিভিন্ন এলাকার খাদ্যতালিকায় এসব খাবার ছড়িয়ে পড়েছে। ড. নুসরাত ফাতেমা বলেন, “এ অঞ্চলে ইসলামের প্রসারের সময় আরব, পার্সিয়ান প্রভাব ছিল। পরবর্তীতে সেটি একপ্রকার ভারতীয়করণও হয়। ভারতে এসে, মূলত উত্তর ভারত থেকে ইফতারের সময় মুখরোচক খাবারের অংশ হিসেবে বিভিন্ন রকমের ভাজাপোড়া খাওয়ার প্রচলন হয়েছে। তখন পেঁয়াজু, বেগুনি, নানা ধরনের চপ খাওয়ার চল যুক্ত হলো। সেটাই পরবর্তীতে আমরাও গ্রহণ করেছি।”
বাংলাদেশে কি বরাবরই মুখরোচক ভাহজাপোড়া খাবার দিয়ে ইফতারি করা হতো?
ইতিহাসবিদদের ধারণা, ইফতারে বিভিন্ন ধরনের মুখরোচক খাবার, মাংস, জিলাপি বা ভাজাপোড়া খাওয়ার ঐতিহ্য মাত্র কয়েকশ বছরের পুরোনো। কয়েকশ বছর আগেও ইফতারে এরকম ভাজাপোড়া খাওয়ার প্রচলন ছিল না।
ইতিহাসবিদ মুনতাসীর মামুন বিবিসিকে বলেন, “কোনো এক সময় মুঘলদের কাছ থেকে ঢাকার লোকজন এরকম বিরিয়ানি, কাবাব, ভাজাপোড়া খাওয়া গ্রহণ করে। তাদের কাছ থেকে সেটা ধীরে ধীরে সারাদেশে ছড়িয়ে পড়ে বলে ধারণা করা হয়।”
তিনি আরও বলেন, “উনিশ শতক থেকে এ অঞ্চলের মানুষজন এরকম খাবার খেতে শুরু করে বলে ধারণা করা যায়। কারণ এর আগে কোথাও এরকম রকমারি খাবারের বর্ণনা পাওয়া যায় না। বরং সেই সময় মানুষ ইফতারে ভাত খেতে বলেই জানা যায়।”
অধ্যাপক ড. নুসরাত ফাতেমা জানান, ভারতবর্ষে আরব, পারস্য, আফগান ইত্যাদি বিভিন্ন জাতির শাসকদের কারণে তাদের খাবার আর সাধারণ মানুষের মধ্যে খাবারের পার্থক্য ছিল। তবে পরবর্তীতে ধীরে ধীরে তাদের এসব খাবার এখানকার স্থানীয় মানুষ গ্রহণ করতে শুরু করে। এভাবেই স্থানীয় খাবারের সঙ্গে তাদের খাবারের রীতি মিশে যায়।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. শেখ মো. ইউসুফ বলেন, “ছোলা, পেঁয়াজু, কাবাব ইত্যাদি কিন্তু আমরা সারা বছরই কম বেশি হালকা নাস্তা হিসেবে খেয়ে থাকি। কিন্তু রমজানের সময় এটা মজাদার বা মুখরোচক খাবার হিসাবে যুক্ত হয়ে গেছে। সারাদিন অভুক্ত থেকে সন্ধ্যায় এরকম মজাদার খাবার খেতে ভালো লাগে।”
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নিউট্রিশন অ্যান্ড ফুড সায়েন্স ইন্সটিটিউটের অধ্যাপক নাজমা শাহিন জানান, বিশেষ কোনো কারণ বা পুষ্টিমাণের ব্যাপার না থাকলেও এই অঞ্চলের মানুষ একটু মুখরোচক, তেলেভাজা খাবার খেতে পছন্দ করে। এই কারণে ইফতারির মধ্যেই সেটা যুক্ত হয়ে গেছে।
তবে বাংলাদেশে এখনও বিভিন্ন এলাকায় ইফতারের খাবারেও পার্থক্য রয়েছে। অনেক এলাকায় পেঁয়াজু বা বেগুনির পরিবর্তে সন্ধ্যায় খেজুর ও শরবত খেয়ে ইফতারে করার পরপরই ভাত বা খিচুড়ি খাওয়ারও প্রচলন রয়েছে।
ইসলামে ইফতারের খাবার সম্পর্কে যা বলা হয়েছে
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. শেখ মো. ইউসুফ বলেন, “ইসলামের নবী-সাহাবিরা ইফতারের সময় খেজুর ও মিষ্টিজাতীয় খাবার খেতেন। বাকি খাবারগুলো বিভিন্ন দেশ তাদের নিজস্ব সংস্কৃতি ও পছন্দ অনুযায়ী খাবার খেয়ে থাকে।”
তিনি আরও বলেন, “ইফতারে বাংলাদেশ বা পাকিস্তানের লোকজন বুট, মুড়ি, ছোলার মতো ভাজাপোড়া খেয়ে থাকে। কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যের মানুষজন কিন্তু এগুলো খায় না। তারা বিরিয়ানি, মুরগির রোস্ট বা ফ্রাইয়ের সঙ্গে খেজুর খায়। ইফতারে সুন্নাত বলতে একটা মিষ্টি খাবার, খুরমা বা খেজুর বুঝি। বাকি খাবারের ব্যাপারে সুস্পষ্ট কোন নির্দেশনা নেই। যার যার রুচি-সংস্কৃতি অনুযায়ী এ খাবার খেয়ে থাকে।”



