সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার ‘‘মাদার’’ নদী তীরবর্তী প্রত্যন্ত অঞ্চল। রমজাননগর ইউনিয়নের এলাকাটি একসময় ছিল গাছপালাশূন্য। নদীর বড় বড় ঢেউয়ে ভেঙে যেত বেড়িবাঁধও। আর প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় জলোচ্ছ্বাসে লবণ পানি ঢুকে বসতবাড়ি এবং মাঠের ফসলও নষ্ট হতো।
এমন প্রতিকূলতার সঙ্গে রমজাননগরের মানুষের লড়াইয়ের ইতিহাস বহু বছরের। ২০১৭ সালে জেলার আশাশুনি ও শ্যামনগরে সামাজিক বনায়ন শুরু করে উন্নয়ন সংস্থা ফ্রেন্ডশিপ। ২০১৯ সালে রমজাননগরে শুরু হয় তাদের সামাজিক বনায়নের কাজ। ওই এলাকায় চার হেক্টর জমিতে বাইন, গরান, কেওড়া, গোলপাতাসহ ছয় প্রজাতির বৃক্ষ রোপণ করেছে তারা।
এ পর্যন্ত বিভিন্ন এলাকায় ১৫২ হেক্টর জমিতে সামাজিক বনায়ন করেছে ফ্রেন্ডশিপ। এসব গাছের চারা উৎপাদন করা হয় নিজস্ব ১২টি নার্সারিতে।
ফ্রেন্ডশিপ কর্মকর্তারা জানান, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রত্যক্ষ শিকার রমজাননগর। এই এলাকায় সামাজিক বনায়নের উদ্দেশ্য টেকসই বেড়িবাঁধ বাস্তবায়নে ভূমিকা রাখা, ঘূর্ণিঝড়, উঁচু জলোচ্ছ্বাস এবং অন্যান্য প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে রক্ষা।

এছাড়া, স্থানীয়দের জীবিকায়ও সহায়তা করে এই বনের গাছপালা।
ফ্রেন্ডশিপ ম্যানগ্রোভ প্রকল্পের ফোকাল পার্সন মো. বদিউজ্জামান ঢাকা ট্রিবিউনকে বলেন, “গাছগুলো দেখভালের কাজটি স্থানীয়রাই করেন। চারটি গ্রুপ আছে। প্রতি গ্রুপে ১৫ জন নারী ও সমসংখ্যক পুরুষ থাকেন। ম্যানগ্রোভ চারা রোপনের পর আমরা এখানে চারজন কেয়ারটেকার নিয়োগ দেই। তারা গাছের পরিচর্যা করেন।”
তিনি আরও বলেন, “তারাই বীজ সংগ্রহ করে। এখানকার নারী ও পুরুষ কর্মীরা সমান মজুরি পান। এসব গাছের নিচে ঘাস জন্মে, সেখান থেকে গবাদিপশুর খাবার হয়। কেওড়া বীজ থেকে আচার হয়। খুব ব্যাপক আকারে না হলেও এখান থেকে স্থানীয়দের আয়ের একটা ব্যবস্থা হয়েছে।”
কথা হয় স্থানীয় বাসিন্দা কৃষ্ণ ভদ্রের সঙ্গে। তিনি বলেন, “এখানকার মানুষের একমাত্র পেশা বলতে এখন চিংড়ি চাষ। লবণাক্ততার কারণে ফসল কম হয়। তবে ফ্রেন্ডশিপের এই বনায়নের কারণে কিছু মানুষের উপকার হয়েছে। তারা এই বনকে কেন্দ্র করে উপার্জন করতে পারছেন। এখানকার ফুল থেকে মধু হয়, ফল সংগ্রহ করে আচার তৈরি করেন কেউ কেউ।”
রমজাননগরের বাসিন্দা ফাতেমা বলেন, “আগে এমন বন বা জঙ্গল ছিল না। আমরা নিজেরা সংরক্ষণ করে গাছগুলোকে এ পর্যন্ত এনেছি। এখন সবুজ ও ছায়া-ঘেরা পরিবেশ তৈরি হয়েছে। এখন আর পানি ওঠে না। বাঁধও ভাঙে না।”
শেখ ছবিলার রহমান বলেন, “গাছের পাতা খাওয়াচ্ছি গরু-ছাগলকে। আবার শুকনো ডালপালা জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করছি।”
একসময় সুন্দরবন থেকে ভেসে আসা বীজ থেকে চারা করা হতো। এখন নিজস্ব বাগান থেকেই বীজ সংগ্রহ করে চারা করা হয় বলে জানান ফ্রেন্ডশিপ কর্মকর্তা বদিউজ্জামান।
তাদের এই কাজে সরকার থেকে মিলছে স্বীকৃতি। স্থানীয় উপজেলাগুলোর নির্বাহী অফিসার এবং ইউপি চেয়ারম্যানরাও সামাজিক বনায়নের জন্য তাদের কাছ থেকে চারা সংগ্রহ করছেন।
ভবিষ্যতে খুলনার কয়রায় এমন বনায়ন সৃষ্টির পরিকল্পনা রয়েছে তাদের।



