Tuesday, September 22, 2026

সেকশন

English
Dhaka Tribune

‘আমরা মরে গেলাম ঋণের দায়ে আর খাওয়ার অভাবে’

রাজশাহীতে চারজনের লাশ উদ্ধারের ঘটনায় ঘর থেকে একটি চিরকুট উদ্ধার করেছে পুলিশ

আপডেট : ১৫ আগস্ট ২০২৫, ০৬:০৭ পিএম

রাজশাহীর পবা উপজেলার বামুনশিকড় এলাকায় একই পরিবারের চারজনের মরদেহ উদ্ধার করেছে পুলিশ। আজ শুক্রবার (১৫ আগস্ট) সকাল ৯টার দিকে ওই এলাকার নিজ বাড়ি থেকে তাদের মরদেহ পাওয়া গেছে।

মতিহার থানা পুলিশের সহকারী উপ পরিদর্শক (এএসআই) কালাম পরভেজ সাংবাদিকদের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।

মৃতরা হলেন- মিনারুল ইসলাম (৩০), তার স্ত্রী সাধিনা বেগম (২৮), ছেলে মাহিম (১৩), মেয়ে মিথিলা (১৮ মাস)।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, মিনারুল ইসলাম কৃষি কাজ করেন। তার অনেক ঋণ রয়েছে। তারা মাটির ঘরে বসবাস করতেন। মিনারুল ঝুলছিলেন সিলিং ফ্যানের সঙ্গে। পাশে বিছানায় পড়ে আছে বড় ছেলে। পাশের ঘরে মা ও মেয়ে পড়ে আছে। তাদের সবাইকে মৃত অবস্থায় উদ্ধার করেছে পুলিশ।

এদিকে, ঘর থেকে একটি চিরকুট উদ্ধার করেছে পুলিশ। যেখানে মিনারুলের বরাত দিয়ে লেখা রয়েছে ঋণের চাপ আর খাবারের অভাবে স্ত্রী ও দুই সন্তানকে হত্যার পর তিনি আত্মহত্যা করেছেন। চিরকুটের সত্যতা এবং প্রকৃত ঘটনা জানতে তদন্ত করছে পুলিশ।

রাজশাহীর পবায় একই পরিবারের চারজনের লাশ উদ্ধারের ঘটনায় স্বজনদের আহাজারি/ঢাকা ট্রিবিউন

আত্মীয়-স্বজন ও পুলিশ সূত্রে জানা যায়, মিনারুল আগে একসময় জুয়া খেলতেন। পরে ছেড়ে দেন। এ জন্য তিনি অনেক ঋণগ্রস্ত ছিলেন। দেড় বছর আগে বাবা রুস্তম আলী ধানিজমি বিক্রি করে ঋণের একটা অংশ পরিশোধ করেন। এরপরও তার ২ লাখ টাকার মতো ঋণ ছিল। এই ঋণের জন্য প্রতি সপ্তাহে তাকে ২,৭০০ টাকার বেশি কিস্তি পরিশোধ করতে হচ্ছিল। কিন্তু কিস্তি চালাতে বেশ হিমশিম খাচ্ছিলেন মিনারুল। বাবাকে মিনারুল আর কিছু জমি বিক্রি করে পুরো টাকা পরিশোধ করতে বলেছিলেন। কিন্তু বাবা জমি বিক্রি করতে রাজি হননি। এ নিয়ে মা-বাবার সঙ্গে মিনারুল কথা বলা বন্ধ করে দেন। এমনকি ছেলেমেয়েদেরও মিশতে দিতেন না।

আজ সকালে মিনারুলের মা আঞ্জুয়ারা বেগম নাতনিকে ডাকতে যান। অনেক ডাকাডাকির পরও কেউ সাড়া দিচ্ছিল না। সকাল পৌনে ৯টার দিকে লাগোয়া ঘরের পাশে ঘরের সিলিংয়ের ওপর দিয়ে ছেলেকে ঝুলন্ত অবস্থায় দেখতে পান। পরে জানাজানি হলে প্রতিবেশীরা বাড়িতে আসেন। স্থানীয় পারিলা ইউনিয়নের চেয়ারম্যান সাহেদ আলী পুলিশকে খবর দেন। পরে পুলিশ এসে ঘরের দরজা খোলে।

রাজশাহীর পবায় একই পরিবারের চারজনের লাশ উদ্ধারের ঘটনায় স্বজনদের আহাজারি/ঢাকা ট্রিবিউন

এ ঘটনা রাজশাহী মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ আবু সুফিয়ান ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে সাংবাদিকদের বলেন, ‘‘প্রাথমিকভাবে মনে হচ্ছে, মিনারুল স্ত্রী-সন্তানদের শ্বাস রোধ করে হত্যা করে নিজে আত্মহত্যা করেছেন। মরদেহগুলো উদ্ধার করে ময়নাতদন্ত করা হবে। এ ঘটনায় মামলা হবে। একটা চিরকুট পাওয়া গেছে। চিরকুটে উনি ঋণগ্রস্ত ও আর্থিক অনটনের কথা লেখেছেন। সিআইডির ফরেনসিক টিম ও পিবিআই এসেছে। তারা ক্রাইম সিনের আলামতগুলো সংগ্রহ করবে। পরে বিস্তারিত জানাতে পারবেন।’’

সেই চিরকুটে যা লেখা ছিল

চিরকুটটি দুই পৃষ্ঠার ছিল। প্রথম পৃষ্ঠার ওপর লেখা ছিল, ‘‘আমরা চারজন পৃথিবী থেকে বিদায় নেব, আর দেখা হবে না খোদা হাফেজ। আমি মিনারুল। নিচে যেসব লেখা লিখব, সব আমার নিজের কথা, এই কারণে লিখে যাচ্ছি। কারণ আজ রাতে আমরা চারজন মারা যাব। এই মরার জন্য কারও কোনো দোষ নেই। কারণ লিখে না গেলে পুলিশ কাকে না কাকে ফাঁসিয়ে টাকা খাবে। আমি মিনারুল প্রথমে আমার বউকে মেরেছি। তারপর আমার মাহিনকে মেরেছি। তারপর আমার মিথিলাকে মেরেছি। তারপর আমি গলায় ফাঁস দিয়ে মরেছি। আমাদের চারজনের মরা মুখ যেন বাপের বড় ছেলে ও তার বউ-বাচ্চা না দেখে এবং বড় ছেলে যেন জানাজায় না যায়। আমাদের চারজনকে কাফন দিয়ে ঢাকতে আমার বাবা যেন টাকা না দেয়। এটা আমার কসম। (ইতি মিনারুল, আসসালামু আলাইকুম)।’’

আরেক পৃষ্ঠায় লেখা ছিল, ‘‘আমি নিজ হাতে সবাইকে মারলাম এই কারণে যে আমি একা যদি মরে যাই, তাহলে আমার বউ, ছেলেমেয়ে কার আশায় বেঁচে থাকবে। কষ্ট আর দুঃখ ছাড়া দিতেই পারব না। আমরা মরে গেলাম ঋণের দায়ে আর খাওয়ার অভাবে। এত কষ্ট আর মেনে নিতে পারছি না। তাই আমাদের বেঁচে থাকার চেয়ে মরে গেলাম, সেই ভালো হলো। কারও কাছে কিছু চাইতে হবে না। আমার জন্য কাউকে মানুষের কাছে ছোট হতে হবে না। আমার বাবা আমার জন্য অনেক লোকের কাছে ছোট হয়েছে। আর হতে হবে না। চিরদিনের জন্য চলে গেলাম। আমি চাই, সবাই ভালো থাকবেন। ধন্যবাদ।’’

   

About

Popular Links

x