২০১৭ সালে মিয়ানমারের রাখাইনে সহিংস ঘটনার অজুহাতে সে দেশের সেনাবাহিনী ও উগ্রবাদি মগদের বর্বোচিত নির্যাতনের কথা এখনও ভুলতে পারছেন না রোহিঙ্গা নারীরা। ভয়াবহ নির্যাতনের কথা মনে পড়লে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ছেন অসংখ্য রোহিঙ্গা নারী।
এমনই একজন রোহিঙ্গা নারী নুর জাহান (ছদ্মনাম)। বয়স ৩৫ বছর। কক্সবাজারের উখিয়ার কুতুপালং লম্বাশিয়া রোহিঙ্গা ক্যাম্প-১ এর ডাব্লিউ ব্লকের বাসিন্দা তিনি। ২০১৭ সালে রাখাইনে সেদেশের সেনাবাহিনীর নির্যাতনের শিকার হয়ে পালিয়ে আশ্রয় নেন কক্সবাজারের উখিয়া রোহিঙ্গা ক্যাম্পে। কিন্তু, দীর্ঘ ৮ বছরেও ভুলতে পারেনি বর্বোরিচিত নির্যাতনের ভয়াবহতা। এই নির্যাতনের দুঃসহ যন্ত্রণা প্রতিনিয়ত তাকে তাড়া করে বেড়াচ্ছে।
নুর জাহানের ভাষ্যমতে, ২০১৭ সালে যখন রাখাইনে সহিংসতা শুরু হয়, তখন সে দেশের সেনাবাহিনী তার বাড়িঘর আগুনে পুড়িয়ে দেওয়া হয়। কোন উপায় না দেখে অন্যান্য রোহিঙ্গাদের মত বাংলাদেশে পালিয়ে আসার সিদ্ধান্ত নেন নুর জাহান। পরে পালিয়ে আসার সময় তাকে এবং তার স্বামীকে ধরে নিয়ে যায় সে দেশের সেনাবাহিনী। সেনা ক্যাম্পে নিয়ে প্রথমে তার স্বামীকে গুলি করে হত্যা করা হয়। একপর্যায়ে তাকে ৫ সেনা সদস্য পালাক্রমে নির্যাতন ও ধর্ষণ করে। এরপর অসুস্থ অবস্থায় বাংলাদেশে পালিয়ে আসার পথে তার দুটি জমজ সন্তানের মধ্যে একটি সন্তানের মৃত্যু হয়। অনাহারে, অর্ধাহারে কোনো মতে জীবন বাঁচিয়ে আশ্রয় নেয় কক্সবাজারের উখিয়ার কুতুপালং লম্বাশিয়া রোহিঙ্গা ক্যাম্পে। সেই থেকে দীর্ঘ ৮ বছর অতিবাহিত হলেও ভূলতে পারেনি বর্বোরিত নির্যাতনের ভয়াবহতা। এখন দুঃসহ নির্যাতনের কথা মনে পড়লে মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন নুর জাহান।
শুধু নুর জাহান নয়। তার মতো অসংখ্য নারী রাখাইনে সে দেশের সেনাবাহিনী ও উগ্রবাদি মগদের নির্যাতনের শিকার হয়েছে। নারীদের ধর্ষনের পাশাপাশি পাশবিক নির্যাতন ও বর্বোচিত হামলা চালিয়ে হত্যা করেছে। এই বর্বোচিত হামলায় কেউ স্বামী, কেউ আদরের সন্তান, আবার কেউ স্বজনদের হারিয়ে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে মানবেতর জীবনযাপন করছেন।
রোহিঙ্গা ক্যাম্প-২ এর বি-৩ ব্লকের রোহিঙ্গা নারী ফাতেমা বেগম (ছদ্মনাম) বলছিলেন তার অমানুষিক নির্যাতনের কথা। ফাতেমার ভাষ্যমতে, আজ থেকে ৮ বছর পূর্বে ফাতেমাকে রাখাইনে সেনাবাহিনী ও উগ্রবাদি মগ যুবকরা ধরে নিয়ে গিয়ে পাষবিক নির্যাতন করে। তার অনেক স্বজনকে গুলি করে হত্যা করে। এখন সে কথা মনে হলে তার শরীর শিউরে উঠে। কোনোভাবে দেশে যাওয়ার ইচ্ছে নেই তার। যদি যেতে হয় তাহলে সম্মানের সঙ্গে নাগরিকত্ব দিলে তবে তারা মিয়ানমারে ফিরবে।
রোহিঙ্গা নেতা জাফর আলম বলেন, “নানা কারণে বিশ্বনেতারা আজ ভুলে যেতে বসেছেন রোহিঙ্গাদের ভয়াবহ নির্যাতনের ঘটনা। তাই, মিয়ানমারের জান্তা সরকারের গণহত্যার বিচারের পাশাপাশি খুব দ্রæত সময়ে একটি সেভ জোন করে সে দেশে থাকা রোহিঙ্গাদের জীবন বাঁচানোসহ কক্সবাজারে অবস্থানরত রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেয়ার এখনই সময়।”
কক্সবাজারের ত্রাণ ও শরণার্থী প্রত্যাবাসন কমিশনার মোহাম্মদ মিজানুর রহমান বলেন, “রোহিঙ্গা সংকট মোকাবেলায় মিয়ানমারে প্রত্যাবাসনে বর্তমান সরকার বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। বর্তমান সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ও জাতিসংঘের মহাসচিবের নেতৃত্বে একটি টিম রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শনের পর থেকে প্রত্যাবাসনে আশার আলো দেখা যাচ্ছে। সর্বশেষ ২৪ আগস্ট থেকে ২৬ আগস্ট পর্যন্ত ইনানীতে তিনদিনের সম্মেলনে ৪০টি দেশের প্রতিনিধিগণ অংশ নিচ্ছে। এতে রোহিঙ্গা সংকটের অনেক বিষয় উঠে আসবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।”
গত ২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট রাখাইনে সহিংস ঘটনায় সে দেশের সেনাবাহিনীর ভয়াবহ নির্যাতনে কক্সবাজারের রোহিঙ্গা ক্যাম্পে পালিয়ে আশ্রয় নেয় সাড়ে ৭ লাখ সহ দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে আশ্রয় নেন ১১ লাখ রোহিঙ্গা। গত এক বছরে নতুন করে আরো ২ লাখ রোহিঙ্গা সহ মোট ১৩ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা এখন বসবাস করছে উখিয়া ও টেকনাফের ৩৩টি রোহিঙ্গা ক্যাম্পে। এসব রোহিঙ্গাদের দ্রুত মিয়ানমারে প্রত্যাবাসনে প্রত্যাশা করছেন স্থানীয়রা।



রোহিঙ্গা সংকটের ৮ বছর আজ: প্রত্যাবাসন না হওয়ায় শঙ্কিত স্থানীয়রা 