Thursday, June 04, 2026

সেকশন

English
Dhaka Tribune

রোহিঙ্গা সংকটের ৮ বছর আজ: প্রত্যাবাসন না হওয়ায় শঙ্কিত স্থানীয়রা 

২০১৭ সালে সাড়ে ৭ লাখের অধিক রোহিঙ্গা সীমান্ত পাড়ি দিয়ে কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফের বনভূমিতে আশ্রয় নেয়

আপডেট : ২৫ আগস্ট ২০২৫, ১০:০৮ এএম

মিয়ানমারের রাখাইনে সহিংস ঘটনায় বাস্তুুুচ্যুত হয়ে কক্সবাজারে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গা আগমনের ৮ বছর পূর্ণ হলো আজ। ২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট মিয়ানমার সেনাবাহিনীর হত্যা, নির্যাতনের মুখে পড়ে সাড়ে ৭ লাখের অধিক রোহিঙ্গা সীমান্ত পাড়ি দিয়ে কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফের বনভূমিতে আশ্রয় নেয়। কক্সবাজারে আগে থেকে আশ্রয় নেওয়া আরও তিন লাখ রোহিঙ্গা ও নতুন করে আসা আরও দেড় লাখসহ বর্তমানে ১৩ লাখেরও অধিক রোহিঙ্গা বর্তমানে কক্সবাজারের ৩৩টি ক্যাম্পে বসবাস করছে। কখন তারা স্বদেশে ফিরে যাবে তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। তবে সরকারের শরনার্থী বিষয়ক কর্মকর্তারা জানিয়েছেন- ইতিমধ্যে রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে বিশ্ব সম্প্রদায়ের দৃষ্টি সরে গেছে। 

মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে সন্ত্রাস দমনের নামে সে দেশের সেনাবাহিনী রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর উপর জাতিগত নিধন চালানো হলে গত ২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট থেকে সীমান্ত পাড়ি দিয়ে কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফে আসতে থাকে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর ঢল। ২৫ আগস্টের পর দুই তিন মাসের মধ্যেই উখিয়া ও টেকনাফে আশ্রয় নেয় সাড়ে সাত লাখের মতো রোহিঙ্গা। এছাড়া কক্সবাজারে আগে থেকে আশ্রয় নেয়া আরও তিন লাখ রোহিঙ্গা ও গত এক বছরে নতুন করে আসা দেড় লাখ সহ ১৩ লাখের অধিক রোহিঙ্গাকে ৩৩টি ক্যাম্পে অবস্থান করছে। পরবর্তীতে জাতিসংঘের তত্বাবধানে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর খাদ্য সহায়তা ও অন্যান্য সুযোগ সুবিধা গুলো নিশ্চিত করা হয়। ২০১৭ সালেই বাংলাদেশ মিয়ানমারের সাথে রোহিঙ্গাদের স্বদেশে ফেরত পাঠাতে দ্বিপক্ষীয় আলোচনা শুরু করে। পরে কয়েক দফা রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের উদ্যোগ নিলেও একজন রোহিঙ্গাও মিয়ানমারে ফেরত যায়নি। বরং, গত এক বছরে নতুন করে আরো দেড় লাখ রোহিঙ্গা কক্সবাজারে আশ্রয় নিয়েছে। 

রোহিঙ্গাদের দাবি- তাদের নাগরিকত্ব, জাতিগত পরিচয়, জায়গা-জমি ও গণহত্যার বিচারের নিশ্চয়তা না পেলে তারা মিয়ানমারে গিয়ে আবারও সেদেশের সেনাবাহিনীর নির্যাতনের মুখে পড়বে। এছাড়াও সম্প্রতি রাখাইনে মিয়ানমারের জান্তা বাহিনীর সঙ্গে আরকান আর্মির চলমান যুদ্ধে রাখাইনের লাজুক পরিস্থিতিতে মিয়ানমারে ফিরতে নারাজ এসব রোহিঙ্গারা।

উখিয়ার লম্বাশিয়া রোহিঙ্গা ক্যাম্পের আব্বাসী বেগম বলেন, “রাখাইনে সে দেশের সেনাবাহিনী কর্তৃক জেল-জুলুম, নির্যাতনের মুখে বাংলাদেশে পালিয়ে এসেছি আজ ৮টি বছর পার হয়েছে। কিন্তু, দিনটি আসলে মনটা বেশি ভারি হয়ে আসে। কারণ, মিয়ানমারের আমার বাপ-দাদার কবর। রয়েছে ফেলে আসা ভিটা-বাড়ি। জানি না এখন ওই বাড়িটি কেমন আছে। আমার শুধু মন কাঁদে আমার সুন্দর বাড়িটির জন্য।”

একই ক্যাম্পের নুর আয়েশা বলেন, “কত আশা ছিল মিয়ানমারে নিজের বাড়িতে ফিরে যেতে পারবো। অথচ, আজকাল করে আর যাওয়া হলো না। গত ৮ বছর হয়ে গেছে। আমাদের স্বদেশে পাঠানোর কোন চিন্তা-ভাবনা করোর নেই। আমরা স্ব-সম্মানে আমাদের দেশে ফিরে যেতে চাই।”

আরকান রোহিঙ্গা সোসাইটি ফর পিস এন্ড হিউম্যান রাইটসের সভাপতি মোহাম্মদ জুবাইর বলেন, “দীর্ঘদিন পর হলেও বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূচ রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনের জন্য একটি সম্মেলনের ব্যবস্থা করেছেন। অথচ, বিদেশে থাকা কিছু বিত্তশালী রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের কিছু অর্থের লোভে নানাভাবে একটি দেশের এজেন্ডা বাস্তবায়নের জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছে। আমরা চাই, রোহিঙ্গা ক্যাম্পে বসবাসকারি রোহিঙ্গা প্রতিনিধিদের নিয়ে প্রত্যাবাসনের বিষয়ে কথা বলা হোক।”

একই সংগঠনের সহ সভাপতি মোহাম্মদ তৈয়ব বলেন, “মিয়ানমারের জান্তা সরকার রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনের বিষয় উঠে আসলে বার বার তালবাহনা শুরু করে। রাখাইনে আরকান আর্মি ও জান্তা সরকার বাহিনীর যুদ্ধটিও নাটক। বিশেষ করে মিয়ানমারের কিছু দালাল জান্তা সরকার ও আরকান আর্মির হয়ে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে। প্রত্যাবাসনের বিষয় উঠে আসলে শুরু হয় এসব দালালদের তৎপরতা।”

এদিকে, রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন যত বিলম্ব হচ্ছে, ততই স্থানীয়দের ওপর প্রভাব পড়ছে দাবি করে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা বলছেন- রোহিঙ্গা সমস্যা দ্রুত সমাধান না হলে রোহিঙ্গা ও স্থানীয়দের মধ্যে সংঘাতে জড়িয়ে পড়ছে। এতে করে অপরাধ প্রবণতা বেড়েই চলবে।

উখিয়ার কুতুপালংয়ের ইউপি সদস্য হেলাল উদ্দিন বলেন, “রোহিঙ্গাদের কারণে দিন দিন অপরাধ প্রবণতা বেড়েই চলছে। দীর্ঘ ৮ বছর ধরে রোহিঙ্গাদের বোঝা আমরা মাথায় নিয়ে আছি। আমরা যারা স্থানীয়রা রয়েছি আমাদের কথা কেউ ভাবেন না। কারণ, রোহিঙ্গা প্রতিনিয়ত চাঁদাবাজি, মাদক, খুন-খারাবি, অপহরণ ও ধর্ষনের সাথে জড়িত। আমরা বরাবরের মতো দাবি জানিয়ে আসছি যত দ্রæত সম্ভব রোহিঙ্গাদের স্বদেশে ফেরত পাঠানো হোক।”

কক্সবজারের উখিয়া উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান ও বিএনপির সভাপতি সরওয়ার জাহান চৌধুরী বলেন, “রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন বিলম্ব হওয়ায় আমরা যারা স্থানীয়রা রয়েছে, আমরা খুব শঙ্কিত উদ্বিগ্ন। রোহিঙ্গাদের কারণে আমাদের জীবন-জীবিকা, জলবায়ূ, প্রাণ ও পরিবেশ, আমাদের শ্রমবাজার ও আমাদের নিরাপত্তা সহ সবকিছুতে রোহিঙ্গাদের প্রভাব পড়েছে। এখন সরকারের কাছে আমাদের দাবি হচ্ছে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে নিয়ে খুব দ্রুত রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন শুরু করা। ভবিষ্যতে রোহিঙ্গা সংকট যদি আরো দীর্ঘায়িত হয়ে তাহলে আমরা নিজেরা নিজ দেশে পরবাসি হয়ে যাবো। রোহিঙ্গাদের কারণে আমরা আতঙ্কিত, শঙ্কিত।”

কক্সবাজার ত্রাণ ও শরণার্থী প্রত্যাবাসন কমিশনার মোহাম্মদ মিজানুর রহমান বলেন, “২৫ আগস্টকে রোহিঙ্গারা গণহত্যা দিবস হিসেবে পালন করে থাকে। এই দিনটি রোহিঙ্গা গণহত্যা দিবস পালনের মাধ্যমে বিশ্ব সম্প্রদায়ের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাই। এছাড়াও আন্তর্জাতিক আদালতে বিচারাধীন মামলা দ্রুত নিষ্পত্তি চাই রোহিঙ্গার। বিশেষ করে রোহিঙ্গারা আগমনের আজ ৮ বছর পর এসে যেসব সরকারী-বেসরকারি, এনজিও, আইএনজিও ও দাতা সংস্থা কাজ করছে তারাও এখন ক্লান্ত। বলতে গেলে রোহিঙ্গাদের বৈঞ্চিক সমস্যা সমাধানে বিশ্ব সম্প্রদায়ের দৃষ্টি এখন সরে গেছে।”

স্থানীয়দের নানামুখী সংকট থেকে বাঁচাতে খুব দ্রুত সময়ের মধ্যে রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনের দাবি সচেতন মহলের। 

 

   

About

Popular Links

x