টেকনাফের নির্জন উপকূলে রাত হলে শুধু অন্ধকার নয়, নেমে আসে এক ভয়ংকর নীরবতা। সেই নীরবতার মাঝে প্রতি রাতে কয়েকটি ছোট ছোট নৌকায় থাকে স্বপ্নের পথে যাত্রা করা মানুষগুলো - কেউ বেকার যুবক, কেউ অসহায় রোহিঙ্গা মা তার শিশুকে কোলে নিয়ে, কেউবা স্বামীর হাত ধরে ভালো জীবনের আশায়। কিন্তু তাদের গন্তব্য কখনো মালয়েশিয়া বা থাইল্যান্ড হয় না। তাদের গন্তব্য হয় মৃত্যু, নির্যাতন, না হয় জিম্মিশালার অন্ধকার।
সম্প্রতি কক্সবাজারের টেকনাফ উপকূল থেকে ট্রলারে মালয়েশিয়া যাওয়ার পথে আন্দামান সাগরে দুর্ঘটনায় অন্তত রোহিঙ্গাসহ ৩০ বাংলাদেশি নিহত হয়েছেন। তবে আন্দামান সাগরে ডুবে যাওয়া ট্রলার থেকে ছয় বাংলাদেশিসহ মোট নয়জন রোহিঙ্গা কোস্টগার্ডের মাধ্যমে দেশে ফিরেছেন। বিবিসির এক প্রতিবেদন থেকে এ তথ্য জানা গেছে।
গত ৯ এপ্রিল আন্দামান সাগর থেকে নয়জনকে গভীর সমুদ্রে টহলরত কোস্ট গার্ডের জাহাজ “মনসুর আলী”র কাছে হস্তান্তর করেছে বাংলাদেশের বাণিজ্যিক জাহাজ “মোটর ট্যাংকার মেঘনা প্রাইড”।
“এটা শুধু মানবপাচার নয়, এটা একটা নোংরা অপরাধের জাল,” বিবিসি বাংলাকে বলতে গিয়ে কণ্ঠটা ভেঙে আসে উদ্ধার হওয়া হাসানের। তার ভাষ্যমতে, এখানে জড়িত অর্থ পাচার, মাদক চোরাচালান, জিম্মি আর মানুষের জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলা। পুরো এলাকা জানে। স্থানীয় মানুষ জানে, বিভিন্ন বাহিনীও জানে। তারপরও এটা চলছে।
একজন মা তার ১৯ বছরের ছেলেকে বিদায় দিয়ে বলেছিলেন, “বাবা, ভালো করে খেয়ে-পরে থাকিস।” ছেলেটা আর ফেরেনি। নৌকায় খাবার শেষ হয়ে যাওয়ার পর পাচারকারীরা তাকে সমুদ্রে ফেলে দিয়েছে বলে জানিয়েছে হাসান।
রোহিঙ্গা শরণার্থীরা যাদের ঘরবাড়ি আগেই আগুনে পুড়েছে, তারাও এই একই নৌকায় উঠছে। বাংলাদেশকে তারা শুধু ট্রানজিট হিসেবে ব্যবহার করছে। কিন্তু এই ট্রানজিট তাদের জন্যও মৃত্যুফাঁদ হয়ে দাঁড়িয়েছে। অন্যদিকে এই পুরো সংকটের দাম সবচেয়ে বেশি দিতে হচ্ছে সাধারণ বাংলাদেশি যুবকদের। আন্দামান সাগর আর ভূমধ্যসাগরের মতোই এখন বঙ্গোপসাগরও হয়ে উঠেছে মানুষের মৃত্যুফাঁদ।
এদিকে, মানবপাচার রোধে অভিযান চালিয়ে যাওয়ার কথা জানিয়েছে বাংলাদেশ কোস্ট গার্ড। বাহিনীটি জানিয়েছে, গত এক বছরে তারা ১৫১ জন বাংলাদেশি ও ৪১৯ জন রোহিঙ্গাসহ মোট ৫৭০ জনকে উদ্ধার করেছে। সেইসঙ্গে ৪৮ জন পাচারকারীকে আটক করেছে।
এর আগে, ফেব্রুয়ারিতে ৫৫ জনকে (নারী ও শিশু) উদ্ধার করে পাঁচ পাচারকারীকে আটক করা হয়েছে। মার্চ-এপ্রিলে একাধিক অভিযানে ৭৩২ জনকে নৌকা থেকে উদ্ধার করেছে বলে জানিয়েছে কোস্ট গার্ড কর্মকর্তা।
মানবপাচার মামলায় তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে বলে সংবাদমাধ্যমকে নিশ্চিত করেছেন টেকনাফ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সাইফুল ইসলাম। তিনি জানিয়েছেন, পাচারকারীরা ভালো চাকরি, মোটা অংকের বেতন এবং সুন্দর ভবিষ্যতের স্বপ্ন আর অবিবাহিত নারীদের বিয়ের মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল।
তিনি আরও বলেন, আন্দামান সাগর কিংবা ভূমধ্যসাগর ব্যবহার করে যে মানবপাচার চলছে তা ঠেকাতে রাষ্ট্রকে আরও গুরুত্ব দিতে হবে।
এদিকে গভীর সমুদ্রে বিপুল সংখ্যক যাত্রী নিয়ে ট্রলার ডুবির এই ঘটনায় যৌথ বিবৃতি দিয়েছে জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক সংস্থা এবং আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা। সংস্থা দুটির মতে, অতিরিক্ত যাত্রী বোঝাই, তীব্র বাতাস এবং বৈরী আবহাওয়ার কারণে ট্রলারটি গভীর সমুদ্রে ডুবে যায়।



