বৈরি আবহাওয়া, শ্রমিক সংকট আর বন্যার ঝুঁকিতে হাওরের ধান ও জেলার কয়েক লাখ কৃষক। গত কয়েক দিনের থেমে থেমে বৃষ্টি আর উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে বাড়ছে নদনদীর পানি। অন্যদিকে নিচু জমিতে সৃষ্টি হয়েছে জলাবদ্ধতা। ক্রমাগত বৃষ্টি হলে হাওরের ফসল রক্ষা বাঁধে বাড়বে পানির চাপ।
সব মিলিয়ে সুনামগঞ্জের কয়েক লাখ কৃষক উদ্বেগ উৎকণ্ঠায় দিনরাত পার করছেন। এপ্রিলের শুরুতে অতিবৃষ্টিতে নিচু জমি জলাবদ্ধতায় তলিয়ে গেছে ক্ষেত। অন্যদিকে শিলাবৃষ্টিতে ফলন বিপর্যয়। প্রতিকূল আবহওয়ার কারণে ধান শুকাতে পারছেন না কৃষক।
বজ্রপাতের কারণে হাওরে ধানকাটার শ্রমিকের সংকট অপরদিকে অতিবৃষ্টিতে ক্ষেতে কোমর পানি জমে আছে। জেলার সুমেশ্বরী, যাদুকাটা, মনাই, খাসিয়ামারা, চেলা, পিয়াইনসহ সাতটি সীমান্ত নদীতে উজানের পানি প্রবাহ অনেক বেড়েছে। হাওরের লাখো কৃষক উদ্বেগ উৎকণ্ঠার মধ্যে সময় পার করছেন। আগামী চারদিন ধমকা, ঝড়ো হাওয়াসহ বৃষ্টিপাতের পূর্বাভাস থাকায় বোরো’র ভরা মৌসুমে রীতিমত বেকায়দায় পড়েছেন সুনামগঞ্জের কৃষকরা।
ধর্মপাশা উপজেলার সুখাইড় রাজাপুর উত্তর ইউনিয়নের সুখাইড় গ্রামের কৃষক সীতেশ দাস বলেন, “লামার জমি (নিচু জমি) নিয়ে চিন্তার শেষ নেই। জমিতে পানি জমেছে তাই মেশিনে কাটা যায় না। শ্রমিকের মজুরি বেশি। মাড়াই খলায় মজুদ করা ধান শুকানো যাচ্ছে না।”
বাগবাড়ি গ্রামের কৃষক সুবল দাস বলেন, “খলার ক্ষেতের ধান নিয়ে বিপাকে আছি। বৃষ্টিবাদলের কারণে খলার ধান শুকানো যায় না। অন্যদিকে নিচু জমির ধান কাটা যায় না। এমন বৈশাখ আগে কখনও আসেনি। এবারের বৈশাখ কৃষকের ঘুম কেড়ে নিয়েছে।”
জয়শ্রী গ্রামের আব্দুল মালেক বলেন, “গত ৬-৭ বছর ভালো বৈশাখ ছিল। এবারের বৈশাখে বিপদ আর বিপদ। শুরুতে শিলাবৃষ্টি পরে অতিবৃষ্টিতে জলাবদ্ধতায় কাচা ক্ষেত তলিয়ে গেছে। এবার ক্ষেতগৃহস্তি করে লাভবান হওয়ার কোনো সুযোগ নেই।”
পানি উন্নয়ন বোর্ডের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের আকস্মিক বন্যা সম্পর্কিত পূর্বাভাস থেকে জানা যায়, ৫ এপ্রিল থেকে ১২ এপ্রিল হাওর অববাহিকায় ও উজানে হালকা মাঝারি ও ভারী বৃষ্টিপাতের কারণে সুরমা কুশিয়ারা ধনু বৌলাই নদীর পানি প্রবাহ দ্রুত বৃদ্ধি পেয়েছে। এছাড়া ২৩ এপ্রিল থেকে ৩০ এপ্রিল হাওর অববাহিকায় ও উজানে হালকা মাঝারি ও ভারী বৃষ্টিপাতে নদনদীর পানি বেড়ে ২৮ এপ্রিল বন্যা হাওরাঞ্চলে পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে পারে।
ক্ষেতের ৮০% ধান পাকলে তা কর্তনের পরামর্শ দেওয়া হয়। তবে সুরমা নদীর পানি এখনও বিপৎসীমার ১.৭৬ মিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। বৈরী আবহওয়া ও বজ্রপাতের কারণে ধান কাটার শ্রমিক সংকটের পাশাপাশি বেড়েছে দৈনন্দিন মজুরি। জলাবদ্ধতায় আক্রান্ত জমির ধান শ্রমিক ছাড়া কাটার কোনো উপায় নেই। তাই কৃষকরা বাধ্য হয়ে ১,২০০ টাকা রোজে শ্রমিক নিয়ে পানিতে নিমজ্জিত ক্ষেতের ধান কাটছেন।
এদিকে ভারতীয় আবহাওয়া দপ্তর জানিয়েছে, বাংলাদেশের উজানে মেঘালয় রাজ্যের প্রায় সকল স্থানে ২৭ এপ্রিল থেকে আগামী ১ মে পর্যন্ত মাঝারি বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা রয়েছে। মেঘালয়ে বৃষ্টিপাত হলে স্বাভাবিকভাবে ভাটির দেশ সুনামগঞ্জের নদনদীতে পানি প্রবাহ বাড়ে।
ম্যাথোলজি অ্যান্ড আর্থ সিস্টেম রিসার্চ কোম্পানির মহাব্যবস্থাপক (এমডি) আবহাওয়াবিদ সাঈদ আহমদ জানান, ২৮ এপ্রিল থেকে ২ মে গড়ে ৬০ থেকে ১৬০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হতে পারে সুনামগঞ্জে।
সিলেট আবহাওয়া অফিসের শাহ সজিব আহমদ জানান, চার দিন সুনামগঞ্জে অস্থায়ীভাবে ধমকা, ঝড়ো হাওয়াসহ বৃষ্টিপাতের পূর্বাভাস আছে।
জেলা প্রশাসক (ডিসি) মোহাম্মদ মিনহাজুর রহমান জানান, কৃষকের সমস্যা নিরসনে কাজ করছে সরকার। ধানকাটার মেশিনের জন্য জ্বালানির সংকট নেই। হাওরাঞ্চলের সাতটি জেলায় ধান কাটা চলছে। তাই শ্রমিকের সংকট রয়েছে।



