Friday, June 05, 2026

সেকশন

English
Dhaka Tribune

বিএমডিএ'র সেচ ও খাল খননে বদলে গেছে চাঁপাইনবাবগঞ্জের কৃষি

২৩৪টি স্থাপনার মাধ্যমে প্রায় ২ লাখ মানুষের জন্য সুপেয় পানি নিশ্চিত করা হয়েছে

আপডেট : ২৮ এপ্রিল ২০২৬, ০৭:৩০ পিএম

এক সময়কার শুষ্ক ও মরুপ্রায় বরেন্দ্র জনপদ এখন দেশের অন্যতম শস্য ভান্ডার। বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিএমডিএ) আধুনিক সেচ ব্যবস্থা, বিশেষ করে খাল খনন ও ভূ-উপরিস্থ পানির সর্বোত্তম ব্যবহারের ফলে চাঁপাইনবাবগঞ্জের কৃষি ও অর্থনীতিতে এসেছে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন।

সদর উপজেলার প্রবীণ কৃষক জুবাইয়ের হোসেন (৬৫) বলেন, “বিএমডিএ আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে পানি সরবরাহ করায় আমাদের কৃষিতে বিপ্লব ঘটছে। খাল খনন করে নদী থেকে পানি আনা এবং পুকুর সংস্কার করে ওপরের পানির ব্যবহার বাড়ায় চাষাবাদ সহজ হয়েছে। এমন কি নিচের পানির স্তরটাও ঠিক থাকছে, যা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটা বড় আশার আলো। গাছ রোপণ ও খাল খননে বিএমডিএ-র যে দক্ষতা, তাতে তাদের আরও বড় দায়িত্ব দিলে এই অঞ্চলের চেহারা পাল্টে যাবে।”   

একই এলাকার বাসিন্দা আব্দুল মাতিন (৫০) স্মৃতিচারণ করে বলেন, “১৯৯১-৯২ সালে বিএমডিএ প্রতিষ্ঠার পর থেকে এই অঞ্চলের পরিবেশগত বিবর্তন শুরু হয়। এক সময়ের অনুপযোগী জমি এখন ফসলে ভরা।”

তিনি আরও বলেন, “প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের খাল খনন ও চারা রোপণের যে দূরদর্শী পদক্ষেপ, তা আজ বিএমডিএ-র মাধ্যমে বাস্তবায়িত হয়ে কৃষকের ভাগ্যোন্নয়ন ঘটাচ্ছে।”

চাঁপাইনবাবগঞ্জ রিজিয়ন কার্যালয়ের তথ্যমতে, বিএমডিএ-র কার্যক্রম এই জেলায় ব্যাপক ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। যেমন ১,৬৩৯টি ফোর্স মোড পাম্পের মাধ্যমে ৬২,০০০ হেক্টর জমিতে বছরে তিনটি ফসল চাষ হচ্ছে, যা আগে ছিল মাত্র একটি। এতে উপকৃত হচ্ছে ১,৩২,০০০ কৃষক পরিবার।

এছাড়া মহানন্দা ও পুনর্ভবা নদী থেকে ১০০ টি এলএলপি পাম্পের মাধ্যমে ৪,০০০ হেক্টর জমিতে সেচ দেওয়া হচ্ছে। প্রতি বছর প্রায় ৬.৫০ লাখ মেট্রিক টন ফসল উৎপাদিত হচ্ছে, যার বাজারমূল্য প্রায় ১,৬২৫ কোটি টাকা। পাশাপাশি পানির অপচয় রোধে ২০০৩ সালে চালু করা হয়েছে স্মার্ট কার্ড ভিত্তিক প্রিপেইড মিটার ব্যবস্থা।

শুধুমাত্র সেচ নয়, পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় বিএমডিএ এ পর্যন্ত ১.৫০ কোটি ফলজ, বনজ ও ঔষধি গাছ রোপণ করেছে। এছাড়া বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের জন্য ২৩০ কিলোমিটার খাল এবং ১,০৯১টি পুকুর পুনঃখনন করা হয়েছে, যা ভূ-গর্ভস্থ পানির স্তরের ওপর চাপ কমিয়েছে। 

গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়নেও বিএমডিএ-র ভূমিকা অনন্য। ২৩৪টি স্থাপনার মাধ্যমে প্রায় ২,০০,০০০ মানুষের জন্য সুপেয় পানি নিশ্চিত করা হয়েছে। ১,৪০০ কিলোমিটার বারিড পাইপ (সেচ নালা) এবং ১৮৬ কিলোমিটার সংযোগ সড়ক নির্মাণ করা হয়েছে, যা কৃষিপণ্য বাজারজাতকরণ সহজ করেছে। 

চাঁপাইনবাবগঞ্জ রিজিয়ন কার্যালয়ের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আল মামুনুর রশিদ বলেন, “মহানন্দা নদীর পানি ব্যবহার করে প্রায় ১৮,০০০ হেক্টর তীব্র খরাপ্রবণ এলাকায় সেচ সুবিধা পৌঁছে দিতে কৃষি মন্ত্রণালয়ে দুটি বড় প্রকল্প প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। এর মধ্যে ডাবল লিফটিং পদ্ধতি প্রকল্পে আনুমানিক ব্যয় ৮৩৯ কোটি টাকা এবং জলবায়ু পরিবর্তনজনিত প্রভাব প্রশমন প্রকল্পে আনুমানিক ব্যয় ৫৮৭ কোটি টাকা।”

এই প্রকল্পগুলোর আওতায় ২১০ কিলোমিটার খাল ও ১৫০টি পুকুর পুনঃখননসহ ৫.৫০ লক্ষ বৃক্ষরোপণ এবং সোলার সেচ যন্ত্র স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে। বর্তমানে আরও ৬ কিলোমিটার খাল ও দুটি বড় বিল (চুড়ইল ও কালন) পুনঃখনন প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। 

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. ফারহাত তাসনীম জানান, নির্দিষ্ট কাজে অভিজ্ঞ প্রতিষ্ঠানকে সেই দায়িত্ব দিলে রাষ্ট্রের উন্নয়ন ত্বরান্বিত হয়। বিএমডিএ যেহেতু কৃষি ও সেচ ব্যবস্থাপনায় অত্যন্ত দক্ষ, তাই তাদের এই কাজে আরও বেশি সম্পৃক্ত করা হলে বরেন্দ্র অঞ্চলের আর্থ-সামাজিক অবস্থার দ্রুত উন্নতি ঘটবে।

আধুনিক প্রযুক্তি আর প্রাকৃতিক সম্পদের সমন্বয়ে বিএমডিএ যেভাবে কাজ করে যাচ্ছে, তাতে শুধু চাঁপাইনবাবগঞ্জ নয়, বরং সারা দেশের খাদ্য নিরাপত্তায় এটি একটি মডেল হিসেবে দাঁড়িয়েছে। সরকারের পর্যাপ্ত পৃষ্ঠপোষকতা পেলে এই প্রতিষ্ঠানটি বরেন্দ্র অঞ্চলের চেহারা পুরোপুরি বদলে দিতে সক্ষম হবে।

   

About

Popular Links

x