Thursday, June 18, 2026

সেকশন

English
Dhaka Tribune

সংরক্ষিত নারী আসনের এমপিদের ৬৫% কোটিপতি

মনোনীতদের হলফনামায় প্রদত্ত তথ্য বিশ্লেষণ করে টিআইবি এসব তথ্য জানিয়েছে

আপডেট : ৩০ এপ্রিল ২০২৬, ০৮:৫২ পিএম

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত নারী আসনের প্রার্থীদের হলফনামা বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, মনোনীতদের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশই উচ্চশিক্ষিত ও কোটিপতি। মনোনীতদের মধ্যে প্রায় ৬৫% কোটিপতি এবং ৬৩% বেশি প্রার্থী স্নাতকোত্তর বা তদূর্ধ্ব শিক্ষাগত যোগ্যতাসম্পন্ন।

নির্বাচন কমিশনে জমা দেওয়া ৪৯ জন মনোনীত প্রার্থীর হলফনামার তথ্য বিশ্লেষণ করে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)  এই চিত্র তুলে ধরে।

বিত্তবান ও কোটিপতি প্রার্থীদের চিত্র

বিশ্লেষণ অনুযায়ী, সংরক্ষিত আসনের প্রার্থীদের বড় অংশই সম্পদশালী। মোট ৪৯ জন প্রার্থীর মধ্যে ৩২ জনই (৬৫.৩১%) স্থাবর ও অস্থাবর সম্পত্তির মোট মূল্যমান অনুযায়ী কোটিপতি। এদের মধ্যে আবার আলাদাভাবে অস্থাবর সম্পত্তির ভিত্তিতে কোটিপতি ২৫ জন এবং স্থাবর সম্পত্তির ভিত্তিতে কোটিপতি ১৪ জন।  দলীয়ভিত্তিতে কোটিপতি প্রার্থীর সংখ্যা বিশ্লেষণে দেখা যায়, বিএনপির ৩৬ জন প্রার্থীর মধ্যে ২৬ জন (৭২.২২%) এবং জামায়াতে ইসলামীর ৯ জন প্রার্থীর মধ্যে ৫ জন (৫৬%) কোটিপতি। এছাড়া জাগপার একমাত্র প্রার্থীও কোটিপতি। আর গড় বার্ষিক আয় ১০ লাখ টাকার উপরে এমন প্রার্থীর হার ৩৮.৭৮%(১৯ জন), সরাসরি ভোটে সাধারণ আসনে নির্বাচিত সংসদ সদস্যের মধ্যে এই হার ৬৭.৯%। তবে সার্বিকভাবে ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে সরাসরি ভোটে নির্বাচিত ও সংরক্ষিত নারী আসনসহ সকল সদস্যের মধ্যে মোট কোটিপতির সংখ্যা ২৬৯ জন, যা শতকরা হিসেবে ৭৭.৩%।

শিক্ষাগত যোগ্যতা: সাধারণ আসনের চেয়ে এগিয়ে

সংরক্ষিত নারী আসনের প্রার্থীরা শিক্ষাগত যোগ্যতায় সরাসরি নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে এগিয়ে আছেন। এই আসনে স্নাতকোত্তর ও তদূর্ধ্ব ডিগ্রিধারী প্রার্থীর হার ৬৩.৩%, যেখানে নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের ক্ষেত্রে এই হার ৫০.৭%। সার্বিকভাবে সরাসরি ভোটে নির্বাচিত ও সংরক্ষিত নারী আসনসহ সকল সদস্যের মধ্যে ৫২.৬৩%-ই স্নাতকোত্তর ও তদূর্ধ্ব ডিগ্রিধারী। সংরক্ষিত নারী আসনের প্রার্থীদের মধ্যে ২৭% স্নাতক এবং ৪.১% উচ্চমাধ্যমিক পাস। স্বশিক্ষিত প্রার্থীর হার ৪.১% এবং মাধ্যমিক পাস প্রার্থীর হার ২.১%।

পেশাগত চিত্র: শীর্ষে আইনজীবীরা

হলফনামার তথ্য অনুযায়ী, সংরক্ষিত আসনের নারী প্রার্থীদের মধ্যে আইনজীবীর সংখ্যা সবচেয়ে বেশি‒২৬.৫%, যা নির্বাচিত সাধারণ আসনের সংসদ সদস্যদের (১১%) তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ পেশা হিসেবে রয়েছে ব্যবসা (২২.৫%)। এছাড়া গৃহিণী ১২.২%, শিক্ষক ১০.২%, এবং সরাসরি রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ৮.২% প্রার্থী এই নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেন। চিকিৎসকদের হার ৪.১% এবং অন্যান্য পেশাজীবীদের হার ৪.১%। তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, সার্বিকভাবে সরাসরি ভোটে নির্বাচিত ও সংরক্ষিত নারী আসনসহ সকল সদস্যের মধ্যে ৫৫.১৭%-ই ব্যবসায়ী।

সম্পদ ও ঋণ

সংরক্ষিত আসনের কোটিপতি প্রার্থীদের মোট সম্পদের পরিমাণ বিশ্লেষণে দেখা যায়, তাদের কোটি টাকার বেশি স্থাবর সম্পদের মোট পরিমাণ ৬৬ কোটি টাকা এবং অস্থাবর সম্পদের মোট পরিমাণ ৭৮ কোটি টাকা। তবে তাদের স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদ আলাদাভাবে যোগ করলে সর্বমোট সম্পদের পরিমাণ দাঁড়ায় ১৫২ কোটি টাকা। উল্লেখযোগ্যভাবে লক্ষণীয় যে, নারী আসনের প্রার্থীদের মধ্যে নিজ নামে কিংবা স্বামী-স্ত্রীর যৌথ নামে ১০০ ভরির বেশি স্বর্ণালংকার আছে অন্তত তিনজন প্রার্থীর‒যাদের একজন প্রার্থীর নিজের নামেই ৫০২ ভরি স্বর্ণালঙ্কারের তথ্য পাওয়া গেছে। ব্যক্তিগত  বিপুল এই সম্পদের পাশাপাশি সংরক্ষিত আসনের প্রার্থীদের ঋণগ্রস্ততার চিত্রও বিশ্লেষণে উঠে এসেছে, যেখানে দেখা যায় ২০.৪১% প্রার্থীই কোনো না কোনোভাবে দায় বা ঋণগ্রস্ত। দলীয়ভাবে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থীদের মধ্যে ঋণগ্রস্ততার হার সমান ২২.২২%। তবে সংরক্ষিত আসনের প্রার্থীদের (২০.৪১%) তুলনায় সরাসরি ভোটে নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের (৫০.৮৪%) ঋণগ্রস্ততার পরিমাণ ২.৪৯ গুণ বেশি।

বয়স ও দলীয় বণ্টন

সংরক্ষিত আসনে প্রার্থীদের গড় বয়স ৫২.১৭ বছর। বয়সসীমা হিসেবে ৪৫-৫৪ বছর বয়সের প্রার্থীর সংখ্যা সর্বোচ্চ (১৬ জন বা ৩২.৭৪%)। এরপর ৩৫-৪৪ বছর বয়সী ৯ জন এবং ৫৫-৬৫ বছর বয়সী প্রার্থীর সংখ্যা ১২ জন। দল হিসেবে বিএনপির ৩৬ জন প্রার্থীর মধ্যে ১৩ জনের বয়সসীমা ৪৫-৫৪ বছর, ১০ জনের ৫৫-৬৫ বছর এবং ৬৫ বছরের উর্ধ্বে আছেন পাঁচজন। অন্যদিকে জামায়াতের ৯ জন প্রার্থীর মধ্যে ৩৫-৪৪ বছরের বয়সসীমায় একজন, ৪৫-৫৪ বছরের ৩ জন, ৫৫-৬৫ বছরের দুইজন এবং ৬৫ বছরের উর্ধ্বে তিনজন। বিএনপির দুইজন প্রার্থীর বয়সসীমা ২৫-৩৪ এর মধ্যে হলেও জামায়াতের একজনও এই বয়সসীমায় প্রার্থী হননি। তবে সার্বিকভাবে ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে সরাসরি ভোটে নির্বাচিত ও সংরক্ষিত নারী আসনসহ সকল সদস্যের গড় বয়স ৫৮.৫ বছর।

সংরক্ষিত নারী আসন বণ্টনের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক দলভিত্তিক হিসেবে দেখা যায়, ৫০টি সংরক্ষিত আসনের মধ্যে বিএনপির মনোনীত প্রার্থীর সংখ্যা সর্বোচ্চ ৩৬ জন। দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে জামায়াতে ইসলামী (৯ জন)। এছাড়া জাগপা, এনসিপি, খেলাফত মজলিস ও স্বতন্ত্র হিসেবে একজন করে প্রার্থী মনোনীত হয়েছেন। এবার ২০.৪% নারী প্রার্থী ইসলামী দলের এবং ৭৯.৬% প্রার্থী স্বতন্ত্রসহ অন্যান্য দলের।

হলফনামার তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায় সংরক্ষিত নারী আসনের প্রার্থীদের মধ্যে পাঁচজন প্রার্থীর স্বামীর তুলনায় নিজের দালান বা ফ্ল্যাটের সংখ্যা কম। একইভাবে জমির পরিমাণ কম আছে সাতজনের এবং ১৪ জনের অস্থাবর সম্পদ তাদের স্বামীর তুলনায় কম। সংরক্ষিত আসনের নারী প্রার্থীদের অধিকাংশের সম্পদের পরিমাণই তাদের স্বামীদের তুলনায় বেশি থাকায় বাংলাদেশের জনমিতি ও সম্পদ অর্জনের প্রেক্ষাপট বিবেচনায়, এতে বিশেষ দৃষ্টি আকর্ষণের সুযোগ তৈরি হয়েছে।

টিআইবি মনে করে, সংরক্ষিত নারী আসনে উচ্চশিক্ষিত এবং আইনজীবীসহ বিভিন্ন পেশাজীবীদের অংশগ্রহণ ইতিবাচক হলেও সাধারণ আসনের মতো এখানেও সম্পদের প্রভাব এবং নির্দিষ্ট কিছু পেশার আধিপত্য লক্ষণীয়, যার প্রভাব সুদূরপ্রসারী হতে পারে।

   

About

Popular Links

x