Sunday, June 21, 2026

সেকশন

English
Dhaka Tribune

যে হাসপাতালে রোগীরা নিজেরাই নিজেদের ‘ডাক্তার’

২০ শয্যা হাসপাতালের বেহাল দশা, দুই দশকেও চালু হয়নি পূর্ণাঙ্গ সেবা

আপডেট : ০১ মে ২০২৬, ১১:১৪ এএম

হাসপাতালের গেটের সামনে রোগীদের দীর্ঘ লাইন। ভেতরে নেই কোনো চিকিৎসক। জানালার গ্রিল ধরে দাঁড়িয়ে রোগীরা নিজেরাই বলে দিচ্ছেন কার কী ওষুধ লাগবে-কারও প্যারাসিটামল, কারও ব্যথার বড়ি বা ডায়রিয়ার স্যালাইন। আর সেই চাহিদা অনুযায়ী হাত বাড়িয়ে ওষুধ তুলে দিচ্ছেন হাসপাতালের আয়া বা ওয়ার্ড বয়রা। ময়মনসিংহের ‘চরাঞ্চল ২০ শয্যা হাসপাতাল’-এ চিকিৎসাসেবার নামে চলছে এমনই এক অদ্ভুত ও ঝুঁকিপূর্ণ কার্যক্রম।

ময়মনসিংহ শহর থেকে প্রায় ২৮ কিলোমিটার দূরে চরাঞ্চলের লাখো মানুষের স্বাস্থ্যসেবার ভরসাস্থল হিসেবে ২০০৬ সালে হাসপাতালটি নির্মিত হলেও প্রায় দুই দশকেও এখানে পূর্ণাঙ্গ সেবা চালু হয়নি।

সম্প্রতি সরেজমিনে দেখা যায়, হাসপাতালের বহির্বিভাগে কোনো চিকিৎসক নেই। রোগীরা লাইনে দাঁড়িয়ে নাম লেখানোর পর পাশের জানালায় গিয়ে নিজেদের সমস্যার কথা বলছেন। মাস্টার রোলে কর্মরত আয়া শাহিনা আক্তার সেই অনুযায়ী ওষুধ দিয়ে দিচ্ছেন। অথচ নিয়ম অনুযায়ী, চিকিৎসক রোগী দেখে ব্যবস্থাপত্র দেবেন এবং ফার্মাসিস্ট সেই অনুযায়ী ওষুধ বিতরণ করবেন। ছাতিয়ানতলা গ্রামের জান্নাত আক্তার নামের এক রোগী বলেন, “ডাক্তার দেহাইছি না। কইছি ওষুধ দিত, ওষুধ দিয়া দিছে।” একইভাবে মুর্শিদা বেগম নামের আরেক নারী জানান, বড় ডাক্তার তিনি আসতেই দেখেন না, যা চান তা-ই দেওয়া হয়।

হাসপাতালের ফার্মাসিস্ট মিন্টু চন্দ্র দে স্বীকার করেন যে, প্রতিদিন ২৫০ থেকে ৩০০ রোগী এভাবেই ওষুধ নিয়ে যান। তিনি বলেন, “আমি যোগদানের পর থেকে এভাবেই ওষুধ দেওয়া হয় দেখেছি। রোগীরা প্রেসক্রিপশনের জন্য আসেন না, নিজেদের সমস্যার কথা বলে ওষুধ নিয়ে যান।”

চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া এভাবে ওষুধ বিতরণকে জনস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক হুমকি হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা। ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজের কমিউনিটি মেডিসিন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মোহাম্মদ কামরুজ্জামান খান বলেন, “চিকিৎসক ছাড়া ওষুধ দেওয়াটা অপরাধের শামিল। এতে রোগী সঠিক ওষুধ না-ও পেতে পারেন অথবা ওষুধের পূর্ণাঙ্গ ডোজ মিস হতে পারে, যা দীর্ঘমেয়াদে শরীরের জন্য ক্ষতিকর।”

তিন একর জমির ওপর নির্মিত দ্বিতল এই হাসপাতালে নারী ও পুরুষের জন্য ২০টি শয্যা এবং অপারেশন থিয়েটার থাকলেও সবই এখন ধুলার নিচে। ওটি-র যন্ত্রপাতি বাক্সবন্দী অবস্থায় নষ্ট হচ্ছে। ভবনের পেছনের চারটি আবাসিক কোয়ার্টার এখন পরিত্যক্ত ও ভুতুড়ে বাড়িতে পরিণত হয়েছে। সেখানে মানুষের বদলে গাছপালা জন্মেছে। অন্তর্বিভাগ চালু না থাকায় দায়িত্বরত নার্সদেরও কোনো কাজ নেই। নবনিযুক্ত নার্স সাইফুর রহমান আক্ষেপ করে বলেন, “ভালো কাজ করার স্বপ্ন ছিল, কিন্তু এখানে সে সুযোগ নেই।”

হাসপাতালটিতে ৫ জন চিকিৎসকের পদ থাকলেও কাগজে-কলমে আছেন মাত্র ২ জন। তবে পরিদর্শনের দিন কাউকেই পাওয়া যায়নি। ময়মনসিংহের ভারপ্রাপ্ত সিভিল সার্জন ফয়সল আহমেদ রোগীদের চাওয়া অনুযায়ী ওষুধ দেওয়ার বিষয়টিকে ‘দুঃখজনক ও অপরাধ’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেন, “জনবল কাঠামো অনুমোদনের বিষয়টি মন্ত্রণালয়ে আছে। অনুমোদন পেলে দ্রুত অন্তর্বিভাগ চালু করে হাসপাতালটিকে পূর্ণাঙ্গ রূপ দেওয়া হবে।”

স্থানীয়দের দান করা জমিতে নির্মিত এই হাসপাতালটি এখন কেবল ‘নামেমাত্র’ টিকে আছে। চরাঞ্চলের দরিদ্র মানুষ বাধ্য হয়ে হাতুড়ে চিকিৎসার ওপর নির্ভর করছে অথবা দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে শহরে যাচ্ছে। এলাকাবাসীর দাবি, দ্রুত চিকিৎসক নিয়োগ দিয়ে এই ‘ভুতুড়ে’ হাসপাতালটিকে সচল করা হোক।

   

About

Popular Links

x