সাতক্ষীরা সদর ও আশাশুনির দুই পরিবারের জীবনে নেমে এসেছে গভীর শোকের ছায়া। লেবাননের নাবাতিয়েহ এলাকায় ইসরায়েলি ড্রোন হামলায় প্রাণ হারিয়েছেন শফিকুল ইসলাম (৩৮) ও নাহিদুল ইসলাম (২৬)। জীবিকার তাগিদে মাত্র কয়েক সপ্তাহ আগে ঋণের বোঝা মাথায় নিয়ে তারা পাড়ি জমিয়েছিলেন বিদেশে। কিন্তু সেই আশা আর ঘুরে দাঁড়ানোর স্বপ্ন পরিণত হয়েছে এক নিঃশেষ দুঃসংবাদে।
স্থানীয় সূত্র ও বৈরুতের বাংলাদেশ দূতাবাসের তথ্য অনুযায়ী, নাবাতিয়েহ প্রদেশের জেবদিন গ্রামের একটি আবাসিক ভবনে হঠাৎ ড্রোন হামলা চালায় ইসরায়েলি বাহিনী। মুহূর্তেই ধসে পড়ে ভবনটি। ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে ঘটনাস্থলেই নিহত হন শফিকুল ও নাহিদুলসহ আরও একজন সিরীয় নাগরিক। একই এলাকার আরেকটি স্থানে আলাদা হামলায় কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে আরও প্রাণহানির ঘটনা ঘটে।
শফিকুল ইসলামের বাড়ি সাতক্ষীরার সদর উপজেলার একটি গ্রামে। দুই কন্যাসন্তান নিয়ে তার পরিবারে ছিল দারিদ্র্য ও ঋণের ভার। দশ লাখ টাকা ঋণ করে তিনি বিদেশে গিয়েছিলেন সংসারের হাল ফেরানোর আশায়। কিন্তু সেই ঋণ এখন সুদে-আসলে বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ১২ লাখ টাকায়। তার মৃত্যুতে পরিবারের ভবিষ্যৎ এখন অনিশ্চয়তার মুখে।
বড় মেয়ে এইচএসসি প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী তামান্না আক্তার বাবার স্মৃতি আঁকড়ে ধরে বারবার কান্নায় ভেঙে পড়ছেন। ছোট মেয়ে অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থী তন্নি আক্তার এখন পুরোপুরি দিশেহারা। বাবার প্রতিশ্রুতি ছিল ঈদে নতুন জামা পাঠাবেন সেই কথা মনে করে তাদের কান্না থামছে না।
শফিকুলের স্ত্রী রুমা খাতুন শোকে পাথর হয়ে গেছেন। বারবার জ্ঞান হারাচ্ছেন তিনি, আর জ্ঞান ফিরলেই বিলাপ করছেন “আমাদের কী হবে? মেয়েগুলোর ভবিষ্যৎ কে দেখবে?”
অন্যদিকে আশাশুনির কাদাকাটি গ্রামের নাহিদুল ইসলামের পরিবারেও একই করুণ দৃশ্য। ২৬ বছর বয়সী নাহিদুল ছিলেন পরিবারের বড় ছেলে। ঋণ করে তাকে বিদেশে পাঠানো হয়েছিল সংসারের স্বচ্ছলতার আশায়। এখন তার নিথর দেহের অপেক্ষায় অসহায় বাবা-মা।
স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও প্রতিবেশীরা জানিয়েছেন, দুই পরিবারই এখন চরম অর্থনৈতিক সংকটে। ঋণের চাপ, সন্তান হারানোর শোক এবং ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তা মিলিয়ে তারা সম্পূর্ণভাবে ভেঙে পড়েছে।
এ বিষয়ে সাতক্ষীরা সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা অর্ণব দত্ত জানান, নিহতদের মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনার জন্য প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া চলছে এবং প্রশাসন পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছে।
এলাকাবাসীর দাবি, দ্রুত সরকারি উদ্যোগে মরদেহ ফিরিয়ে আনার পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার দুটিকে আর্থিক সহায়তা দেওয়া হোক, যাতে এই শোকের মাঝেও তারা কোনোভাবে টিকে থাকতে পারে।



