Saturday, June 13, 2026

সেকশন

English
Dhaka Tribune

সীমান্তে ‘পুশ ইন’ বন্ধ করতে বিজিবির আহ্বান

দ্বিপক্ষীয় আইনি ব্যবস্থার ভিত্তিতে বিষয়টি সমাধানের আশ্বাস দিয়েছে বিএসএফ

আপডেট : ১৩ জুন ২০২৬, ০৯:৩৭ এএম

বাংলাদেশি আখ্যা দিয়ে ভারত থেকে জোরপূর্বক ‘পুশ ইন’ বন্ধ করতে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিএসএফ) প্রতি আহ্বান জানিয়েছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)। 

এই ধরনের পদক্ষেপ দুই দেশের বিদ্যমান নীতি ও প্রটোকলের সম্পূর্ণ পরিপন্থী বলেও বিজিবির পক্ষ থেকে স্পষ্ট জানানো হয়েছে।

শুক্রবার (১২ জুন) ভারতের নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত চার দিনব্যাপী বিজিবি-বিএসএফ ৫৭তম মহাপরিচালক (ডিজি) পর্যায়ের সীমান্ত সম্মেলন শেষে বিজিবির পক্ষ থেকে দেওয়া এক বিবৃতিতে এসব তথ্য জানানো হয়।

গত ৮ই জুন শুরু হওয়া এই সম্মেলনে বিজিবির পক্ষে নেতৃত্ব দেন মহাপরিচালক মেজর জেনারেল মোহাম্মদ আশরাফুজ্জামান সিদ্দিকী এবং বিএসএফের পক্ষে নেতৃত্ব দেন মহাপরিচালক প্রবীণ কুমার।

সম্মেলন শেষে বিএসএফ একটি যৌথ সংবাদ বিজ্ঞপ্তি দিলেও সেখানে ‘পুশ ইন’ নিয়ে সরাসরি কিছু বলা হয়নি। তবে বিজিবি জানিয়েছে, ‘পুশ ইন’ এর পরিবর্তে বিদ্যমান দ্বিপক্ষীয় আইনি ব্যবস্থার ভিত্তিতে বিষয়টি সমাধানের আশ্বাস দিয়েছে বিএসএফ।

বিজিবির বিবৃতিতে বলা হয়, বিএসএফ কর্তৃক রোহিঙ্গা, মিয়ানমারের নাগরিক কিংবা ভারতীয় নাগরিকদের বাংলাদেশে ‘পুশ ইন’ এর সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বিজিবি মহাপরিচালক। তিনি উল্লেখ করেন, এই পদক্ষেপ সীমান্তবিষয়ক যৌথ নির্দেশিকা, সমন্বিত সীমান্ত ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা এবং পূর্ববর্তী দ্বিপক্ষীয় সিদ্ধান্তের পরিপন্থী।

বিজিবি মহাপরিচালক স্পষ্ট জানান, ভারতে অবৈধভাবে অবস্থানকারী কেউ যদি পুঙ্খানুপুঙ্খ যাচাইয়ের পর ‘বাংলাদেশি নাগরিক’ হিসেবে প্রমাণিত হন, তবে প্রচলিত দ্বিপক্ষীয় প্রত্যাবাসন ব্যবস্থার মাধ্যমে বাংলাদেশ তাদের গ্রহণ করবে। কিন্তু এর বাইরে জোর করে ‘পুশ ইন’ গ্রহণযোগ্য নয়।

অন্যদিকে, বিএসএফ মহাপরিচালক বাংলাদেশ সরকারের কাছে অনিষ্পন্ন জাতীয়তা যাচাইকরণ প্রক্রিয়া দ্রুত সম্পন্ন করে তাদের নাগরিকদের ফেরত নেওয়ার আহ্বান জানান।

সীমান্ত হত্যা নিয়ে উদ্বেগ

সম্মেলনে ‘পুশ ইন’ ছাড়াও বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে দ্বিপক্ষীয় আলোচনা ও উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে:

সীমান্ত হত্যা: সীমান্তে বিএসএফ ও ভারতীয় নাগরিকদের দ্বারা প্রাণঘাতী অস্ত্রের ব্যবহারে নিরীহ বাংলাদেশিদের মৃত্যুর ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে বিজিবি। মানবাধিকার লঙ্ঘন রোধে সীমান্ত হত্যা শূন্যে নামিয়ে আনতে কার্যকর পদক্ষেপের আহ্বান জানানো হয়।

সীমান্ত অবকাঠামো: পূর্ববর্তী আশ্বাস সত্ত্বেও আন্তর্জাতিক সীমান্তের ১৫০ গজের মধ্যে বিএসএফের নিরাপত্তা বেড়া ও বিভিন্ন অবকাঠামো নির্মাণ অব্যাহত রাখায় উদ্বেগ জানায় বিজিবি। এ ক্ষেত্রে ১৯৭৫ সালের সীমান্ত চুক্তি কঠোরভাবে অনুসরণের আহ্বান জানানো হয়।

সন্ত্রাসবাদ দমন: ভারতের মিজোরাম রাজ্যে বাংলাদেশের পার্বত্য অঞ্চলের সশস্ত্র বিচ্ছিন্নতাবাদী ও সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর অবস্থান নিয়ে বিজিবি উদ্বেগ প্রকাশ করলে, বিএসএফ সব ধরনের সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে তাদের জিরো টলারেন্স নীতি পুনর্ব্যক্ত করে।

মিডিয়া ও সামাজিক মাধ্যমে গুজব: দুই দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক, ধর্মীয় ও সীমান্ত বিষয় নিয়ে কিছু নির্দিষ্ট গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মিথ্যা, বিকৃত তথ্য এবং গুজব ছড়ানোর বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে বাংলাদেশ।

রোহিঙ্গা সংকট: বিএসএফের পক্ষ থেকে রোহিঙ্গাদের ভারতে অনুপ্রবেশের বিষয়টি তোলা হলে বিজিবি জানায়, রোহিঙ্গা সংকট একটি মানবিক বিপর্যয় এবং বাংলাদেশ কখনোই তার ভূখণ্ড ব্যবহার করে রোহিঙ্গাদের অবৈধভাবে ভারতে যেতে দেয় না।

বিএসএফের যৌথ বিজ্ঞপ্তি: শান্তি রক্ষার প্রতিশ্রুতি

এদিকে বিএসএফের পক্ষ থেকে পাঠানো যৌথ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, উভয় পক্ষ ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেছে। আন্তঃসীমান্ত অপরাধী চক্রের বিরুদ্ধে যৌথ প্রচেষ্টা জোরদার, সমন্বিত টহল বৃদ্ধি এবং তাৎক্ষণিক তথ্য আদান-প্রদানে দুই পক্ষ সম্মত হয়েছে।

মাদক, অস্ত্র, জাল টাকা ও স্বর্ণ চোরাচালানসহ মানবপাচার রোধে উভয় বাহিনী জিরো টলারেন্স নীতি বজায় রাখার সংকল্প প্রকাশ করেছে। বিজ্ঞপ্তিতে আরও জানানো হয়, আগামী নভেম্বর মাসে ঢাকায় পরবর্তী মহাপরিচালক পর্যায়ের সম্মেলন আয়োজনের বিষয়ে উভয় পক্ষ প্রাথমিকভাবে সম্মত হয়েছে।

সীমান্তে পুশ-ইনের চেষ্টা প্রতিহত, কড়া পাহারায় বিজিবি ও স্থানীয়রা 

গত মাসখানেক ধরে ভারতের বিভিন্ন সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশে ‘পুশ ইন’ এর চেষ্টা তীব্র হওয়ায় সীমান্তজুড়ে উত্তেজনা চলছে। তবে বিজিবি ও স্থানীয় বাংলাদেশিদের সতর্ক অবস্থানের কারণে এসব চেষ্টা ব্যর্থ হচ্ছে।

গত শুক্রবার ভোরে কুষ্টিয়ার দৌলতপুর উপজেলার প্রাগপুর সীমান্ত দিয়ে নারী ও শিশুসহ মোট ১২ জনকে অবৈধভাবে বাংলাদেশে ‘পুশ ইন’ এর চেষ্টা চালায় বিএসএফ। স্থানীয় বাসিন্দা ও বিজিবির যৌথ প্রতিরোধের মুখে বিএসএফ পিছু হটতে বাধ্য হয়। 

এছাড়া, মহেশপুর সীমান্তে ‘পুশ ইন’ ঠেকাতে বিশেষ টহল, হ্যান্ডমাইকে সতর্কবার্তা এবং ঝোপঝাড়ে অবস্থান নিয়ে তৎপরতা চালাচ্ছে বিজিবি। ৫৮ বিজিবি ব্যাটালিয়নের আওতাধীন যাদবপুর, সামন্তা, মাটিলা ও বাঘাডাঙ্গাসহ অন্তত পাঁচটি ঝুঁকিপূর্ণ বিওপিতে নজরদারি জোরদার করা হয়েছে।

স্থানীয়রা জানান, বিএসএফ অনেক সময় রাতে কাঁটাতারের লাইট বন্ধ করে দিয়ে গেট খুলে ‘পুশ ইন’ এর চেষ্টা করছে। তবে বিজিবি ও এলাকাবাসীর শক্ত অবস্থানের কারণে গত সাত দিনে মহেশপুর সীমান্তে বিএসএফের অন্তত পাঁচটি চেষ্টা সফলভাবে প্রতিহত করা হয়েছে।

   

About

Popular Links

x