রাজশাহীর পান দীর্ঘদিন ধরেই স্বাদ, ঘ্রাণ ও গুণগত মানের জন্য দেশের বাজারে আলাদা পরিচিতি ধরে রেখেছে। জিআই পণ্য হিসেবে স্বীকৃত এই পান শুধু কৃষি ঐতিহ্যের অংশ নয়, জেলার অর্থনীতি ও গ্রামীণ জীবিকারও গুরুত্বপূর্ণ উৎস।
চলতি মৌসুমে আবাদ ও উৎপাদন বাড়ায় পানের সম্ভাবনা আরও বাড়লেও হাটে অতিরিক্ত সরবরাহ বাজারমূল্যের ওপর চাপ তৈরি করেছে। ফলে পানের বাজার জমজমাট হলেও দাম নিয়ে চিন্তায় পড়েছেন স্থানীয় চাষিরা।
কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে রাজশাহীতে পানের আবাদ বেড়েছে ৫১০ হেক্টর। উৎপাদনও গত বছরের তুলনায় প্রায় ১০ হাজার মেট্রিক টন বেশি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। আবাদ ও উৎপাদন বাড়ায় জেলার বিভিন্ন পানের হাটে সরবরাহ বেড়েছে। এতে হাটে কেনাবেচা জমজমাট হলেও দাম নিয়ে কিছুটা চিন্তায় পড়েছেন চাষিরা।
রাজশাহীর মোহনপুর উপজেলার মৌগাছি, কেশরহাট, পাকুড়িয়া, কুঠিবাড়ি ও সবচেয়ে বড় একদিলতলা পানের হাট ঘুরে দেখা যায়, ভোর থেকেই পান নিয়ে হাটে আসছেন চাষিরা। কেউ মাথায়, কেউ ভ্যান বা সাইকেলে করে পান নিয়ে আসেন। হাটে পাইকার, খুচরা ব্যবসায়ী ও চাষিদের দরদামে মুখর হয়ে ওঠে পুরো এলাকা।
প্রতি বিড়া উন্নত মানের পান ১০০ টাকা, বড় পান ৩৫ টাকা, মাঝারি সাইজের পান ২০ টাকা এবং ছোট সাইজের পান ৬ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে।
পানের বাজারমূল্য সম্পর্কে সিনিয়র কৃষি বিপণন কর্মকর্তা মো. সানোয়ার হোসেন জানান, ৬৪টি পানে এক বিড়া এবং ৩২ বিড়ায় এক পোয়া পান হয়। সেই হিসেবে এক পোয়ায় ২ হাজার ৪৮টি পান থাকে। বর্তমানে পানের হাটে প্রতি পোয়া ছোট সাইজের পান ২০০ থেকে ২৫০ টাকা, মাঝারি পান ৬০০ থেকে ৮০০ টাকা, বড় পান ১ হাজার থেকে ১,২০০ টাকা এবং উন্নত মানের পান ২,৫০০ থেকে ৩০০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
মোহনপুর উপজেলার হরিদাগাছি গ্রামের পানচাষি বদের উদ্দিন বলেন, “আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় এ বছর পানের উৎপাদন বেশি হয়েছে। হাটে ১০ বিড়া বড় পান ৩৫০ টাকায় বিক্রি করেছি।” উৎপাদন বেশি হলেও দাম কম থাকায় লাভ নিয়ে কিছুটা দুশ্চিন্তায় আছেন বলে জানান তিনি।
মোহনপুর উপজেলার পানচাষি গোলাম মোস্তফা বলেন, “সার, কীটনাশক, শ্রমিক ও বরজ পরিচর্যার খরচ আগের তুলনায় বেড়েছে। দাম আরেকটু ভালো হলে চাষিরা লাভবান হতো।”
কৃষি কর্মকর্তারা বলছেন, উৎপাদন বৃদ্ধি ইতিবাচক। তবে বাজারে অতিরিক্ত সরবরাহ দামের ওপর চাপ তৈরি করতে পারে। তাই পান সংরক্ষণ, পরিবহন, পাইকারি বাজার ব্যবস্থাপনা এবং বাইরের জেলায় সরবরাহ বাড়ানোর বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর রাজশাহীর উপ-পরিচালক মোহাম্মদ নাসির উদ্দিন বলেন, “চলতি মৌসুমে রাজশাহীতে পানের আবাদ ও উৎপাদন দুটোই বেড়েছে। কৃষকদের মানসম্মত পান উৎপাদন, রোগবালাই ব্যবস্থাপনা ও বাজারমুখী চাষাবাদে পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। উৎপাদিত পান যেন ন্যায্য দামে বিক্রি হয়, সে জন্য বাজার পরিস্থিতিও পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।”
মোহনপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কামরুল ইসলাম বলেন, “মোহনপুর উপজেলায় পান প্রধান কৃষিপণ্য। এ বছর উপজেলায় ১ হাজার ৯০০ হেক্টর জমিতে পান চাষ হয়েছে। প্রতিবছর মোহনপুর উপজেলার বিভিন্ন হাটবাজারে প্রায় সাড়ে ৬০০ কোটি টাকার পান কেনাবেচা হয়।”



