Tuesday, July 07, 2026

সেকশন

English
Dhaka Tribune

কক্সবাজারে ভারী বর্ষণে পাহাড় ধসে ২দিনে ১০জনের মৃত্যু

ঢলের পানিতে তলিয়ে গেছে জেলার বিভিন্ন গ্রামীণ সড়ক ও উপসড়ক

আপডেট : ০৭ জুলাই ২০২৬, ০৭:১৫ পিএম

কক্সবাজারে টানা ভারী বর্ষণে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে জনজীবন। সোমবার (৬ জুলাই) ফের পাহাড় ধসে এক নারীসহ দুইদিনে পাহাড় ধসে নারী ও শিশুসহ ১০জনের প্রাণহানি হয়েছে।

দুইদিন ধরে টানা ভারী বৃষ্টি অব্যাহত থাকায় পাহাড়িঢল আর জোয়ারের পানিতে প্লাবিত হয়েছে জেলার নিম্নাঞ্চল। ঢলের পানিতে তলিয়ে গেছে জেলার বিভিন্ন গ্রামীণ সড়ক ও উপসড়ক। ভারী বর্ষণে রেল লাইনের উপর পানি উঠে যাওয়ায় চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রেল চলাচল সাময়িক বন্ধ রয়েছে। একইভাবে দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার কারণে টেকনাফ-সেন্টমার্টিন নৌ-রুটে  নৌযান চলাচল বন্ধ রয়েছে। কক্সবাজার জেলার বিভিন্ন গ্রামীন জনপদের সড়ক-উপসড়ক পানির নিচে তলিয়ে গেছে। বিশেষ করে ভারী বর্ষণ অব্যাহত থাকায় পাহাড় ধসের ঝুঁকি ও জলাবদ্ধতা সহ নানা কারণে মামুষের স্বাভাবিক জীবমযাত্রা ব্যাহত হচ্ছে।

টানা ভারী বর্ষণে কক্সবাজারে পাহাড় ধসের ঝুঁকি আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। কয়েকদিনের অবিরাম বৃষ্টিতে জেলার বিভিন্ন পাহাড়ি এলাকার মাটি নরম হয়ে পড়েছে। এতে কক্সবাজার সদর, উখিয়া, টেকনাফ, রামু, ঈদগাঁও, চকরিয়া, মহেশখালী ও পেকুয়ার পাহাড়ঘেঁষা বসতিতে বসবাসকারী লাখো মানুষ উদ্বেগ-উৎকণ্ঠার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে উখিয়া ও টেকনাফের রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবির। পাহাড়ের ঢালে নির্মিত আশ্রয়গুলোতে অতিবৃষ্টির কারণে ধসের আশঙ্কা বেড়েছে। একই সঙ্গে কক্সবাজার শহরের বিভিন্ন পাহাড়সংলগ্ন এলাকায়ও প্রশাসন সতর্কতা জোরদার করেছে।
জেলা প্রশাসন, ফায়ার সার্ভিস, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তর এবং বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন সম্ভাব্য দুর্যোগ মোকাবিলায় প্রস্তুত রয়েছে। ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় মাইকিং, আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত এবং উদ্ধার সরঞ্জাম প্রস্তুত রাখার কাজ চলছে।

কক্সবাজারের উখিয়ার জালিয়াপালং ইউনিয়নের সোনারপাড়ার স্থানীয় বাসিন্দা মোজাহের আলম, আব্বাস ও রহিম জানান, রাতভর বৃষ্টি হলে আমাদের চোখে ঘুম থাকে না। ছোট ছোট সন্তানদের নিয়ে সবসময় আতঙ্কে থাকি। প্রশাসন যদি আগে থেকেই নিরাপদ আশ্রয়ের ব্যবস্থা করে, তাহলে অনেক মানুষ রক্ষা পাবে।

কক্সবাজার শহরের দরিয়ানগর এলাকার  জাহানারা আক্তার নামে এক নারী বলেন, "একটানা বৃষ্টি হলেই ভয় লাগে। আজকেও আমাদের এলাকায় পাহাড় ধসের ঘটনা ঘটেছে। এতে এক নারী মারাগেছে। আমরা চাই প্রশাসন ঝুঁকিপূর্ণ পরিবারগুলোকে দ্রুত নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিক।"

উখিয়ার কুতুপালংয়ের স্থানীয় ইউপি সদস্য ইঞ্জিনিয়ার হেলাল উদ্দিন জানান, শুধু রোহিঙ্গা ক্যাম্প নয়, জেলার নিভিন্ন ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় করে প্রতিটি ওয়ার্ড ও গ্রামে মানুষকে সচেতন করা দরকার। অনেক পরিবার ইতোমধ্যে নিরাপদ স্থানে চলে গেছে। কেউ যেন ঝুঁকি নিয়ে পাহাড়ের ঢালে অবস্থান না করেন, সে বিষয়ে সবাইকে অনুরোধ জানাচ্ছি।

কক্সবাজার বন ও পরিবেশ সংরক্ষণ পরিষদের সভাপতি দীপক শর্মা দীপু জানান, কক্সবাজার জেলায় রোহিঙ্গা বাদ দিলে অন্তত ২ লাখ মানুষ পাহাড় ধসের ঝুঁকিতে আছে। পাহাড় কাটা, বন উজাড় এবং অপরিকল্পিত বসতি নির্মাণের কারণেই প্রতিবছর কক্সবাজারে পাহাড় ধসের ঝুঁকি বাড়ছে। শুধু দুর্যোগের সময় নয়, সারা বছর পাহাড় সংরক্ষণে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ছাড়া এই ঝুঁকি কমানো সম্ভব নয়।

কক্সবাজার আবহাওয়া অফিসের প্রধান আবহাওয়াবিদ আব্দুল হান্নান বলেছেন, "মৌসুমি বায়ু সক্রিয় থাকায় আগামী কয়েকদিন ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা রয়েছে। অতিবৃষ্টির ফলে পাহাড় ধস, পাহাড়ি ঢল এবং জলাবদ্ধতার ঝুঁকি বাড়তে পারে। সর্বশেষ আবহাওয়ার পূর্বাভাস অনুসরণ করে সবাইকে সতর্ক থাকার অনুরোধ করছি।"

কক্সবাজার জেলা প্রশাসকের কার্যালয় সুত্র জানিয়েছেন, কক্সবাজারে ভারী বর্ষণের কারণে পাহাড় ধসের ঝুঁকি বেড়েছে। জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে সব উপজেলা প্রশাসনকে সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থায় থাকতে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ের পাদদেশ ও ঢালে বসবাসকারী পরিবারগুলোকে নিরাপদ আশ্রয়ে সরে যাওয়ার আহ্বান জানানো হচ্ছে। আশ্রয়কেন্দ্র, শুকনো খাবার, বিশুদ্ধ পানি এবং জরুরি চিকিৎসাসেবার ব্যবস্থা প্রস্তুত রয়েছে।

কক্সবাজার সদর উপজেলার ইউএনও তাহমিনা আক্তার বলেছেন, “টানা ভারী বর্ষণের কারণে বিভিন্ন পাহাড়ি এলাকায় ভূমিধসের ঝুঁকি এখনও বেশি। ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ের পাদদেশে বসবাসকারীদের দ্রুত নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে। পাশাপাশি পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রশাসন, ফায়ার সার্ভিস ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থায় রাখা হয়েছে।“

কক্সবাজার ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স স্টেশনের উপসহকারী পরিচালক সৈয়দ মুহাম্মদ মোরশেদ হোসেন জানিয়েছেন, ফায়ার সার্ভিসের উদ্ধারকারী দল সার্বক্ষণিক প্রস্তুত রয়েছে। যেকোনো পাহাড় ধস, জলাবদ্ধতা বা জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত উদ্ধার অভিযান পরিচালনা করা হবে। আমরা সবাইকে অনুরোধ করবো, ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় অবস্থান না করে নিরাপদ স্থানে চলে যান এবং জরুরি প্রয়োজনে দ্রুত আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করুন।

কক্সবাজার শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার মো: মিজানুর রহমান জানিয়েছেন, রোহিঙ্গা ক্যাম্পের ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলো নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। ক্যাম্প ব্যবস্থাপনা, জাতিসংঘের সংস্থা এবং সহযোগী মানবিক সংগঠনগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করে প্রয়োজন হলে ঝুঁকিপূর্ণ আশ্রয়ে থাকা পরিবারগুলোকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হবে। দুর্যোগ মোকাবিলায় সব ধরনের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে।

আবহাওয়ার পূর্বাভাস অনুযায়ী আরও বৃষ্টির সম্ভাবনা থাকায় পাহাড় ধসের ঝুঁকি এখনো কাটেনি। তাই সংশ্লিষ্ট সব সংস্থা সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থায় রয়েছে। প্রশাসন জনগণকে গুজবে কান না দিয়ে সরকারি নির্দেশনা অনুসরণ এবং প্রয়োজনে দ্রুত নিরাপদ আশ্রয়ে সরে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছে।

   

About

Popular Links

x