Thursday, July 09, 2026

সেকশন

English
Dhaka Tribune

নতুন পে-স্কেল: বেতন বাড়লে যেভাবে চাপ পড়তে পারে আপনার পকেটেও

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, বাজার পরিস্থিতি এবং সার্বিক মূল্যস্ফীতিতে নতুন করে বড় চাপ তৈরি হতে পারে 

আপডেট : ০৯ জুলাই ২০২৬, ১১:৫১ এএম

দীর্ঘ ১১ বছর পর সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য নতুন বেতন কাঠামো বা পে-স্কেল ঘোষণা করতে যাচ্ছে সরকার। চলতি জুলাই মাসেই এ সংক্রান্ত গেজেট প্রকাশের সম্ভাবনা রয়েছে। তবে সরকারের এই উদ্যোগকে বিশ্লেষকরা যৌক্তিক বললেও, বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে এটি মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধি, বাজার অস্থিতিশীলতা, তারল্য সংকট এবং সামাজিক বৈষম্য আরও বাড়িয়ে দিতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন অর্থনীতিবিদরা।

বেতন কাঠামোতে বড় পরিবর্তনের সুপারিশ

সর্বশেষ ২০১৫ সালে জাতীয় বেতন স্কেল ঘোষণার পর ২০২৫ সালে সাবেক অন্তর্বর্তী সরকার নতুন একটি বেতন কমিশন গঠন করে। সাবেক অর্থ সচিব জাকির আহমেদ খানের নেতৃত্বে গঠিত এই কমিশন গত জানুয়ারি মাসে সরকারের কাছে প্রতিবেদন জমা দেয়।

কমিশনের সুপারিশ

সরকারি কর্মচারীদের বেতন-ভাতা ১০০ থেকে ১৪০% পর্যন্ত বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। বিদ্যমান সর্বনিম্ন মূল বেতন ৮,২৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২০,০০০ টাকা এবং সর্বোচ্চ বেতন ৭৮,০০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১,৬০,০০০ টাকা করার কথা বলা হয়েছে। বৈশাখী ভাতা ২০% থেকে বাড়িয়ে ৫০% করাসহ যাতায়াত ভাতাও বৃদ্ধির সুপারিশ রয়েছে।

বর্তমান সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনির নেতৃত্বে গঠিত উচ্চপর্যায়ের কমিটি এই সুপারিশগুলো পর্যালোচনা করে একটি খসড়া রূপরেখা তৈরি করেছে। এতে ১১ থেকে ২০তম গ্রেডের কর্মচারীদের মূল বেতন সর্বোচ্চ ১০০% পর্যন্ত বৃদ্ধির ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে, যা চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য দ্রুতই মন্ত্রিসভায় পাঠানো হবে।

অর্থনীতিবিদদের উদ্বেগ

এই সিদ্ধান্ত দেশের সাড়ে ১৪ লাখ সরকারি কর্মচারী ও পেনশনভোগীদের স্বস্তি দিলেও, দেশের বৃহৎ অংশ অর্থাৎ প্রায় ৬ কোটি ৯৭ লাখ বেসরকারি খাতের কর্মজীবী ও সাধারণ মানুষের মধ্যে তীব্র উদ্বেগ তৈরি করেছে। অর্থনীতিবিদরা এই উদ্যোগের ফলে চারটি প্রধান ঝুঁকির কথা উল্লেখ করেছেন:

মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধি: সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিংয়ের (সানেম) নির্বাহী পরিচালক ড. সেলিম রায়হান জানান, নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়নে অতিরিক্ত প্রায় ১ লাখ ৬ হাজার কোটি টাকার প্রয়োজন হবে। এই বাড়তি অর্থ জোগাতে সরকারকে ঋণ নিতে হবে বা নতুন টাকা ছাপাতে হবে, যা বর্তমান ৯%-এর ওপর থাকা উচ্চ মূল্যস্ফীতিকে আরও উস্কে দেবে।

বাজার অস্থিতিশীলতা: বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের (বিস) গবেষণা পরিচালক ড. মাহফুজ কবীর উল্লেখ করেন, সরকারি কর্মচারীদের ক্রয়ক্ষমতা বাড়ার সুযোগ নিয়ে ব্যবসায়ীদের একটি অংশ বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি করে পণ্যের দাম বাড়িয়ে দিতে পারে, যা নিয়ন্ত্রণে রাখা সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।

আয় বৈষম্য ও দারিদ্র্য: দেশের মোট শ্রমশক্তির ৯৫% বেসরকারি খাতে কর্মরত। তাদের আয় না বাড়িয়ে কেবল সরকারি খাতের বেতন বাড়ালে সামাজিক বৈষম্য তীব্র হবে। বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালে দেশে দারিদ্র্যের হার ১৮.৭% থাকলেও ২০২৫ সালে তা বেড়ে ২১.৪% দাঁড়িয়েছে। এই পদক্ষেপ দারিদ্র্যের হার আরও বাড়াতে পারে।

তারল্য সংকট: ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে জনপ্রশাসন খাতে বরাদ্দ উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানো হয়েছে। বাজেটে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন ও ভাতা বাবদ প্রায় ৮৯ হাজার ৮৩৬ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। পেনশন ও গ্রাচুইটিসহ যা এক লাখ ৪১ হাজার ৪৩৪ কোটি টাকা।

বাজেটের জনপ্রশাসন-নিট খাতে চলতি অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটের তুলনায় ৫৪ হাজার ৫৭২ কোটি টাকা বেশি বরাদ্দ রাখা হয়েছে।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, এই অতিরিক্ত অর্থের অন্তত ৪৪ হাজার কোটি টাকা রাখা হয়েছে মূলত সরকারি কর্মচারী, এমপিওভুক্ত শিক্ষক এবং পেনশনভোগীদের জন্য নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়নের জন্য। কিন্তু বাড়তি এই ব্যয়ের বিপরীতে সরকার আয় সেভাবে না বাড়ায় নতুন বাজেটে বিপুল আর্থের ঘাটতি দেখা যাচ্ছে।

এই ঘাটতি মেটাতে সরকার যদি অভ্যন্তরীণ ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে অতিরিক্ত ঋণ নেয়, তবে দেশের ব্যাংকিং খাতে তীব্র তারল্য সংকট দেখা দিতে পারে।

ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের কৌশল সরকারের

চলমান অর্থনৈতিক সংকট ও ঝুঁকির কথা স্বীকার করে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় বিষয়ক উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর জানিয়েছেন, নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী এই পে-স্কেল ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন করা হবে। প্রথম ধাপে মূলত মূল বেতন (বেসিক) বাড়ানো হবে।

এর আগে সংসদে বাজেট বক্তৃতায় অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী ঘোষণা দেন, ১ জুলাই ২০২৬ থেকে নতুন বেতন কাঠামো ধাপে ধাপে কার্যকর করা হবে। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, প্রথম দুই অর্থবছরে মূল বেতন ৫০ শতাংশ হারে বৃদ্ধি এবং তৃতীয় বছরে অন্যান্য ভাতা কার্যকর করা হতে পারে, যাতে সামষ্টিক অর্থনীতির ওপর চাপ সহনীয় থাকে।

   

About

Popular Links

x