টানা ভারী বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে সৃষ্ট বন্যায় চট্টগ্রামের বিভিন্ন উপজেলায় দেখা দিয়েছে সাপের তীব্র উপদ্রব। একইসঙ্গে বানভাসি এলাকায় ডায়রিয়াসহ নানা পানিবাহিত রোগের প্রকোপ আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে। গত সাত দিনে জেলার বন্যাকবলিত এলাকাগুলোতে সাপের কামড়ে অন্তত ৮৬ জন আক্রান্ত হয়েছেন এবং ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসা নিয়েছেন আরও শতাধিক মানুষ, যাদের ৭০ শতাংশই শিশু।
সোমবার (১৩ জুলাই) চট্টগ্রাম জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয় থেকে প্রাপ্ত সর্বশেষ তথ্যে এসব বিষয় নিশ্চিত হওয়া গেছে।
চট্টগ্রাম জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয়ের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, সাপে কাটা ৮৬ জন রোগীর মধ্যে বোয়ালখালী উপজেলায় সর্বোচ্চ ২০ জন চিকিৎসা নিয়েছেন। এছাড়া পটিয়ায় ১৮, বাঁশখালীতে ১২, রাউজানে ৯, হাটহাজারীতে ৮, সাতকানিয়ায় ৬, আনোয়ারায় ৫, রাঙ্গুনিয়ায় ৩, চন্দনাইশে ৩ এবং লোহাগাড়ায় ২ জন আক্রান্ত হয়েছেন।
আক্রান্তদের মধ্যে বোয়ালখালী উপজেলার দুই অধিবাসী বিষধর সাপের দংশনের শিকার হয়েছেন। প্রাথমিক চিকিৎসা ও 'অ্যান্টি-স্নেক ভেনম' প্রযোগের পর তাদের চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়েছে। চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, তারা বর্তমানে চমেক হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকলেও আশঙ্কামুক্ত।
চট্টগ্রাম জেলা সিভিল সার্জন ডা. জাহাঙ্গীর আলম জানান, “বন্যার পানিতে সাপের প্রাকৃতিক আবাসস্থল প্লাবিত ও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় সাপগুলো বাঁচার তাগিদে শুকনো উঁচু স্থান এবং লোকালয় ও বাসাবাড়িতে আশ্রয় নিচ্ছে। এতে সাপে কাটার ঘটনা বেড়েছে।”
পরিস্থিতি মোকাবিলায় জেলার ১৫টি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ৮০০ ভায়াল এবং জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয়ে ৩০০ ভায়ালসহ মোট ১,১০০ ভায়াল অ্যান্টি-স্নেক ভেনম প্রস্তুত রাখা হয়েছে। সিভিল সার্জন কার্যালয় থেকে রাতে চলাচলে টর্চ ব্যবহার, পানিতে নামার আগে লাঠি দিয়ে পরীক্ষা করা এবং সাপে কামড়ালে ঝাড়ফুঁকে সময় নষ্ট না করে সরাসরি হাসপাতালে যাওয়ার অনুরোধ জানানো হয়েছে।
বন্যার কারণে বিশুদ্ধ খাবার পানি ও পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থার চরম সংকট দেখা দেওয়ায় চট্টগ্রামে ডায়রিয়াসহ পানিবাহিত রোগের প্রকোপ বৃদ্ধি পেয়েছে। সিভিল সার্জন কার্যালয় থেকে জানা যায়, গত এক সপ্তাহে বন্যাকবলিত ১৫টি উপজেলায় অন্তত ১০২ জন ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হয়ে সরকারি স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসা নিয়েছেন। এর মধ্যে ৭০ শতাংশই শিশু। এছাড়া গত ২৪ ঘণ্টাতেই সাতকানিয়ায় ৬ জন এবং বাঁশখালীতে ৪ জন নতুন ডায়রিয়া রোগী শনাক্ত হয়েছে।
ডায়রিয়া ও অন্যান্য পানিবাহিত রোগ প্রতিরোধে জেলাজুড়ে স্বাস্থ্য কেন্দ্রগুলোতে ২ লাখ ৩ হাজার ৪০০ প্যাকেট ওরস্যালাইন (ওআরএস) মজুত রাখা হয়েছে। এর মধ্যে বেশি ঝুঁকিতে থাকা সাতকানিয়ায় ৫ হাজার ও বাঁশখালীতে ১৫ হাজার প্যাকেট সংরক্ষিত আছে।
বন্যাকবলিত এলাকাগুলোতে চিকিৎসাসেবা পৌঁছে দিতে কাজ করছে একাধিক মোবাইল মেডিকেল টিম। পাশাপাশি চর্মরোগ ও চোখের সংক্রমণের ওপর কড়া নজরদারি রাখা হচ্ছে।
সিভিল সার্জন ডা. জাহাঙ্গীর আলম জানান, অ্যান্টি-স্নেক ভেনম, পানি বিশুদ্ধকরণ ট্যাবলেট, কলেরা স্যালাইন ও জরুরি ওষুধ প্রতিটি উপজেলায় নিয়মিত সরবরাহ করা হচ্ছে। সম্প্রতি ঢাকার কেন্দ্রীয় মেডিকেল স্টোর (সিএমএসডি) থেকেও নতুন করে ৩০০ ভায়াল অ্যান্টি-স্নেক ভেনম ও ৪০০টি ডেঙ্গু কিট চট্টগ্রামে আনা হয়েছে। সব মিলিয়ে বন্যার স্বাস্থ্যঝুঁকি সামলাতে পর্যাপ্ত ওষুধ ও চিকিৎসা সামগ্রী সরকারের হাতে মজুত রয়েছে।



