চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) ও চিটাগাং কনটেইনার টার্মিনাল (সিসিটি) বিদেশি প্রতিষ্ঠানের কাছে ইজারা দেওয়ার প্রক্রিয়া বন্ধের সুস্পষ্ট ঘোষণার দাবিতে চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাব চত্বরে প্রতীকী গণঅনশন কর্মসূচি পালন করেছে বন্দর রক্ষা কমিটি, চট্টগ্রাম।
শনিবার (১৮ জুলাই) সকাল ১১টা থেকে বিকেল ৩টা পর্যন্ত অনুষ্ঠিত এই কর্মসূচিতে বিভিন্ন রাজনৈতিক, শ্রমিক, পেশাজীবী, সাংস্কৃতিক ও সামাজিক সংগঠনের নেতৃবৃন্দ সংহতি প্রকাশ করে অংশগ্রহণ করেন।
গণঅনশন উপলক্ষে আয়োজিত সমাবেশে সভাপতিত্ব করেন বন্দর রক্ষা কমিটির আহ্বায়ক প্রকৌশলী দেলোয়ার মজুমদার এবং সঞ্চালনা করেন সদস্য সচিব ফজলুল কবির মিন্টু।
বিকেল ৩টায় বিশিষ্ট কবি, প্রাবন্ধিক ও সাংবাদিক আবুল মোমেন অংশগ্রহণকারীদের শরবত পান করিয়ে প্রতীকী গণঅনশন ভঙ্গ করান।
অনশন কর্মসূচি শেষে বন্দর রক্ষা কমিটির আহ্বায়ক প্রকৌশলী দেলোয়ার মজুমদার আগামী ২২ জুলাই (বুধবার) সন্ধ্যা ৬টায় চেরাগী পাহাড় মোড় থেকে নিউ মার্কেট পর্যন্ত মশাল মিছিল কর্মসূচির ঘোষণা দেন। তিনি জানান, এই কর্মসূচির মাধ্যমে সরকারের কাছে আবারও জাতীয় সম্পদ রক্ষার দাবিতে জনগণের দৃঢ় অবস্থান তুলে ধরা হবে।
সমাবেশ শেষে বন্দর রক্ষা কমিটির পক্ষ থেকে জানানো হয়, দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত শান্তিপূর্ণ ও গণতান্ত্রিক কর্মসূচি ধারাবাহিকভাবে অব্যাহত থাকবে এবং দেশের সর্বস্তরের মানুষকে এই আন্দোলনে সম্পৃক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হবে।
গণঅনশন ভঙ্গের পূর্বে সংক্ষিপ্ত বক্তব্যে কবি ও সাংবাদিক আবুল মোমেন বলেন, “চট্টগ্রাম বন্দর কেবল একটি বন্দর নয়, এটি বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রাণকেন্দ্র। দেশের আমদানি-রপ্তানির সিংহভাগ এই বন্দরের মাধ্যমে পরিচালিত হয়। তাই এই বন্দরের গুরুত্বপূর্ণ টার্মিনাল বিদেশি প্রতিষ্ঠানের হাতে দীর্ঘমেয়াদে তুলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত অর্থনৈতিক ও কৌশলগত উভয় দিক থেকেই অত্যন্ত সংবেদনশীল। জাতীয় স্বার্থ সংশ্লিষ্ট এমন সিদ্ধান্ত গ্রহণের আগে জনগণের মতামত, বিশেষজ্ঞদের অভিমত এবং সংসদীয় আলোচনার প্রয়োজন ছিল। জনগণকে অন্ধকারে রেখে এমন সিদ্ধান্ত গ্রহণ কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।”
তিনি আরও বলেন, “চট্টগ্রাম বন্দর আমাদের জাতীয় গৌরবের প্রতীক। এই বন্দরের সক্ষমতা ও দক্ষতা আরও বৃদ্ধি করতে হলে নিজস্ব জনবল, প্রযুক্তি ও ব্যবস্থাপনার উন্নয়নে বিনিয়োগ করতে হবে। বিদেশি প্রতিষ্ঠানের কাছে দীর্ঘমেয়াদি ইজারা দিয়ে সমস্যার সমাধান হবে না; বরং ভবিষ্যতে জাতীয় স্বার্থ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হবে। জনগণের শান্তিপূর্ণ এই প্রতিবাদের প্রতি সরকারকে সম্মান জানিয়ে অবিলম্বে এনসিটি ও সিসিটি ইজারার প্রক্রিয়া বন্ধের সুস্পষ্ট ঘোষণা দিতে হবে।”
সিপিবির সাবেক সভাপতি কমরেড মোহাম্মদ শাহ আলম বলেন, “রাষ্ট্রের কৌশলগত ও লাভজনক সম্পদ জনগণের সম্পদ। জনগণের সম্পদ বিদেশি কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানের হাতে তুলে দেওয়ার যে প্রবণতা দেখা যাচ্ছে, তা দেশের অর্থনৈতিক স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের জন্য শুভ নয়। অতীতের বিভিন্ন অভিজ্ঞতা আমাদের শিক্ষা দেয়, জাতীয় স্বার্থবিরোধী চুক্তির পরিণতি দীর্ঘমেয়াদে দেশের জনগণকেই বহন করতে হয়।”
তিনি বলেন, “চট্টগ্রাম বন্দর পরিচালনার সক্ষমতা বাংলাদেশের রয়েছে। দক্ষ জনবল, অভিজ্ঞ কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং দীর্ঘদিনের পরিচালনাগত অভিজ্ঞতা থাকা সত্ত্বেও বিদেশি প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভরশীল হওয়ার কোনো যৌক্তিকতা নেই। সরকার যদি জনগণের মতামতকে উপেক্ষা করে এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের পথে এগোয়, তবে গণতান্ত্রিক ও শান্তিপূর্ণ আন্দোলন আরও বিস্তৃত হবে। জাতীয় সম্পদ রক্ষার সংগ্রামে দেশের সর্বস্তরের মানুষকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে।”
টিইউসি চট্টগ্রাম জেলা কমিটির সভাপতি তপন দত্ত বলেন, “চট্টগ্রাম বন্দর শুধু ব্যবসায়ীদের নয়, হাজার হাজার শ্রমিকের জীবিকা এবং দেশের অর্থনীতির অন্যতম ভিত্তি। এই বন্দরের ভবিষ্যৎ নিয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে শ্রমিকদের মতামত সম্পূর্ণ উপেক্ষা করা হয়েছে। এটি অত্যন্ত দুঃখজনক।”
চট্টগ্রাম বন্দরের সাবেক সিবিএর সাধারণ সম্পাদক কাজী শেখ নুরুল্লাহ বাহার বলেন, “চট্টগ্রাম বন্দর গড়ে উঠেছে এ দেশের শ্রমিক, কর্মকর্তা-কর্মচারী ও জনগণের দীর্ঘদিনের শ্রম, দক্ষতা এবং ত্যাগের ওপর ভিত্তি করে। এই বন্দরের সক্ষমতা নিয়ে কোনো প্রশ্ন নেই। অতীতে নানা সংকটেও বন্দর নিজস্ব জনবল ও অভিজ্ঞতার মাধ্যমে সফলভাবে কার্যক্রম পরিচালনা করেছে। তাই লাভজনক এনসিটি ও সিসিটি বিদেশি প্রতিষ্ঠানের হাতে তুলে দেওয়ার কোনো যৌক্তিকতা নেই।”
অন্যান্য বক্তারা বলেন, চট্টগ্রাম বন্দর বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রধান প্রবেশদ্বার এবং জাতীয় নিরাপত্তার একটি গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো। দেশের জনগণের মতামত উপেক্ষা করে কোনো বিদেশি প্রতিষ্ঠানের কাছে লাভজনক টার্মিনাল ইজারা দেওয়া হলে তা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের স্বার্থকেও ক্ষতিগ্রস্ত করবে। তারা অবিলম্বে এনসিটি ও সিসিটি ইজারার সব ধরনের উদ্যোগ বাতিলের সুস্পষ্ট ঘোষণা দেওয়ার আহ্বান জানান।
সমাবেশে সংহতি প্রকাশ করে বক্তব্য দেন বিভিন্ন রাজনৈতিক, শ্রমিক ও নাগরিক সংগঠনের নেতৃবৃন্দ।



