পরিবারের সচ্ছলতা ফেরাতে এবং সুন্দর ভবিষ্যতের আশায় সৌদি আরবে পাড়ি জমিয়েছিলেন নওগাঁর আত্রাই উপজেলার ১২ প্রবাসী। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে তাদের সাতজন ফিরলেন নিথর দেহ হয়ে। সৌদি আরবের রিয়াদে একটি সোফা কারখানায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে নিহত বাংলাদেশিদের মধ্যে আত্রাইয়ের সাতজনের মরদেহ শুক্রবার নিজ নিজ গ্রামের বাড়িতে পৌঁছেছে।
মরদেহ বাড়িতে পৌঁছানোর পর স্বজনদের আহাজারিতে ভারী হয়ে ওঠে উপজেলার গণ্ডগোহালী, উদনপৈ ও ডুবাই গ্রামের পরিবেশ। দীর্ঘদিন অপেক্ষার পর প্রিয়জনকে ফিরে পেলেও সেই ফিরে আসা যে এভাবে হবে, তা মেনে নিতে পারছেন না স্বজনেরা।
শুক্রবার সকাল সাড়ে ১০টার দিকে আত্রাই উপজেলার মোল্লা আজাদ মেমোরিয়াল সরকারি কলেজ মাঠে সাতজনের একসঙ্গে জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। জানাজায় স্থানীয় সংসদ সদস্য, নওগাঁর জেলা প্রশাসক, উপজেলা প্রশাসনের কর্মকর্তা, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ অংশ নেন। জানাজা শেষে মরদেহ স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হলে তারা নিজ নিজ গ্রামের বাড়িতে নিয়ে যান।
এর আগে বৃহস্পতিবার রাতে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছায় সৌদি অগ্নিকাণ্ডে নিহত পরিচয় শনাক্ত হওয়া নয় বাংলাদেশির মরদেহ। বিমানবন্দরের আনুষ্ঠানিকতা শেষে প্রশাসনের সহায়তায় রাত দেড়টার দিকে আত্রাইয়ের সাতজনের মরদেহ উপজেলার এলাকায় পৌঁছে।
আত্রাইয়ের নিহত সাতজন হলেন উদনপৈ গ্রামের মো. ফরিদ, গণ্ডগোহালী গ্রামের রুবেল প্রামাণিক, একই গ্রামের মোহন আলী ও সুমন আলী এবং কলিমউদ্দিন, ডুবাই গ্রামের সোহেল রানা এবং পারকাসুন্দা গ্রামের আব্দুল জলিল সরদার।
গণ্ডগোহালী, উদনপৈ ও ডুবাই গ্রামে লাশবাহী অ্যাম্বুলেন্স প্রবেশ করতেই কান্নার রোল পড়ে যায়। স্বজনদের কেউ সন্তানকে শেষবারের মতো ডাকছিলেন, কেউ দুই হাত তুলে প্রিয়জনের জন্য দোয়া করছিলেন। কেউ আবার নির্বাক হয়ে তাকিয়ে ছিলেন মরদেহের দিকে।
গণ্ডগোহালী গ্রামের সুমন ও মোহনের মা ময়না খাতুন কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, “ঘটনা ঘটছে কতদিন হয়া গেল, আর লাশ পাঠাইলো আজকা! এতগুলো দিন আমি ঘুমাইতে পারি নাই। আগুনে আমার ছেলে দুটাকে একবারে কয়লা বানায়া দিছে। নিজের চোখটারে বিশ্বাস করতে পারতেছি না যে এরা আমার সেই সোনা বাজান। আল্লাহ, তুমি আমারে এত বড় কষ্ট কেন দিলা?”
ছেলেদের সঙ্গে শেষ কথোপকথনের স্মৃতিচারণ করে তিনি বলেন, “আমার দুই ছেলে বলতো, মা, আর কয়েকদিন পরেই দেশে ফিরব। দেশে এসে বাড়ির কাজ শেষ করব। তোমাকে নিয়ে একসঙ্গে সুখে থাকব। সেই স্বপ্ন আর পূরণ হলো না।”
ময়না খাতুন আরও বলেন, “আমার দুনিয়া থেকে সবকিছুই চলে গেল। আমার আর কিছু থাকল না। আমার স্বামীও প্রতিবন্ধী। তাকে নিয়ে কীভাবে সংসার চালাব, বুঝতে পারছি না। সরকারের কাছে অনুরোধ, সরকার যেন আমাদের পাশে এসে দাঁড়ায়।”
নিহত কলিমউদ্দিনের বাবা বজলুর রহমান বলেন, “বিদেশে গেল আমাগো ভাগ্যের চাকা ঘুরাইতে, আর আমরা পাইলাম ওর লাশ! কয়দিন পর পর শুনি আগুনে কত মা-বাপের কোল খালি হয়। ওখানকার ফ্যাক্টরিতে কোনো নিরাপত্তা আছিল না কেন? আমার ছেলের মতো আর কোনো বাবা-মায়ের কোল যেন খালি না হয়।”
স্থানীয় বাসিন্দা আনোয়ার হোসেন জানান, একসঙ্গে এতগুলো মরদেহ এর আগে তারা কখনো দেখেননি। এই ঘটনায় পুরো এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে। নিহতদের বেশির ভাগই ছিলেন পরিবারের প্রধান উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। তাদের মৃত্যুতে পরিবারগুলো মানসিক ও আর্থযা দুই দিক থেকেই বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে।
উদনপৈ গ্রামের নিহত ফরিদের মা সাফিয়া খাতুন বলেন, “ছেলেটাই আছিল আমাদের একমাত্র ভরসা। পেটের টানেই তোরে পাঠাইছিলাম দেশের বাইরে। আগুনে সব শেষ হয়া গেল রে! এখন আমি এই সংসার নিয়া কই যামু? আমার বুকের মানিকরে তো আর কেউ ফিরায়া দিতে পারবো না।”
ডুবাই গ্রামের নিহত সোহেল রানার বাবা বাদল তরফদার বলেন, “একটা সুন্দর ভবিষ্যতের আশায় দেশের বাইরে পাঠায়ছিলাম। এখন আমার তো আর কেউ নাই রে বাবা! তোরে বুকে ধইরা কষ্ট কইরা মানুষ করছিলাম। তুই ছাড়া এই দুনিয়ায় আমার আর কে আছিল?”
এদিকে আত্রাইয়ের আরও পাঁচ প্রবাসীর মরদেহের পরিচয় এখনো নিশ্চিত না হওয়ায় তাদের দেশে ফেরানো নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। স্বজনেরা দ্রুত ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে পরিচয় শনাক্ত করে মরদেহ দেশে ফেরানোর দাবি জানিয়েছেন।
মধ্যবোয়ালী গ্রামের নিহত মিনহাজের মা পারুল বিবি বলেন, “কতদিন ধইরা ছেলের মুখটা দেখার জন্য ব্যাকুল হইয়া আছি। হামার ছাওয়ালের মরদেহ নাকি শনাক্ত হয়নি, এ জন্য পরে আসবে। শেষবার একটু ছোঁয়াও পাব না? সরকারের কাছে আবদার, হামার ছেলের লাশ যেনো দ্রুত নিয়ে আসে।”
স্থানীয় সংসদ সদস্য শেখ মো. রেজাউল ইসলাম বলেন, “সৌদিতে কারখানায় অগ্নিকাণ্ডে একসঙ্গে আত্রাইয়ের ১২ জনের মৃত্যু অত্যন্ত দুঃখজনক। সরকারের পক্ষ থেকে নিহতদের পরিবারকে আর্থিক সহযোগিতা করা হয়েছে এবং ভবিষ্যতেও সহযোগিতা অব্যাহত রাখার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে।”
তিনি বলেন, “বাকি মরদেহগুলো দেশে ফেরানোর প্রক্রিয়া চলছে। ডিএনএ পরীক্ষায় পরিচয় নিশ্চিত হলেই দ্রুত তাদের মরদেহ দেশে ফেরানোর ব্যবস্থা করা হবে।”



