Sunday, August 30, 2026

সেকশন

English
Dhaka Tribune

নিষেধাজ্ঞা শেষে খুলছে সুন্দরবন, নতুন আতঙ্কে বনজীবীরা

এই সময়টাতে সব ধরনের আয়-রোজগার বন্ধ থাকায় উপকূলীয় জীবনযাত্রা চরম সংকটে পড়ে

আপডেট : ৩০ আগস্ট ২০২৬, ০৬:১০ পিএম

দীর্ঘ তিন মাসের আইনি নিষেধাজ্ঞা কাটিয়ে আগামী ১ সেপ্টেম্বর থেকে খুলে দেওয়া হচ্ছে বিশ্ব ঐতিহ্য সুন্দরবনের দুয়ার। বন বিভাগের পক্ষ থেকে পাস (অনুমতিপত্র) ইস্যু শুরু হতে চলায় উপকূলীয় এলাকায় জেলে, বাওয়ালি ও পর্যটন ব্যবসায়ীদের মাঝে আগাম প্রস্তুতি ও তুমুল ব্যস্ততা দেখা দিয়েছে। তবে এই দীর্ঘ বিরতি শেষে বনাঞ্চলে ফেরার স্বস্তির পেছনেই সাতক্ষীরার শ্যামনগরসহ পুরো উপকূলজুড়ে বিরাজ করছে গভীর শঙ্কা ও উদ্বেগ। টানা তিন মাস আয় বন্ধ থাকায় জমানো ঋণের ভার এবং ১ আগস্ট-পরবর্তী প্রেক্ষাপটে বনাঞ্চলে নতুন করে মাথাচাড়া দিয়ে ওঠা বনদস্যুদের চাঁদা ও ডাকাত আতঙ্কে দিন কাটছে বনজীবীদের।

জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ ও সামুদ্রিক প্রাণীর প্রজনন মৌসুম বিবেচনায় প্রতিবছরের মতো জুন, জুলাই ও আগস্ট- এই তিন মাস সুন্দরবনে সর্বসাধারণের প্রবেশে সর্বাত্মক নিষেধাজ্ঞা জারি করে আসছে বন বিভাগ। এই সময়টাতে সব ধরনের আয়-রোজগার বন্ধ থাকায় উপকূলীয় জনগোষ্ঠীর জীবনযাত্রা চরম সংকটে পড়ে।

শ্যামনগরের দাতিনাখালী গ্রামের জেলে লতিফ গাজী বর্তমানে স্ত্রীকে নিয়ে ট্রলার মেরামতের কাজ করছেন। নিষেধাজ্ঞাকালীন জীবনের কষ্ট প্রকাশ করে তিনি বলেন, "সুন্দরবন বন্ধ থাকায় মহাজন ও এনজিওর কাছ থেকে প্রায় ৬০ হাজার টাকা ধারদেনা করে পরিবার চালাতে হয়েছে। সামনে বন খুলছে ঠিকই, কিন্তু মূল ভয় এখন বনদস্যুদের নিয়ে। বনে রওনা হওয়ার আগেই আতঙ্কে রাত কাটছে, না জানি কখন ডাকাতের কবলে পড়তে হয়!"

একই উদ্বেগের কথা জানান গাবুরা এলাকার জহিরুল ইসলাম। তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, "আগে বনে ঢুকতে মূল ভয় ছিল বাঘের, আর এখন প্রধান আতঙ্ক বনদস্যু। গত ৫ আগস্টের পর থেকে সুন্দরবনের সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির চরম অবনতি ঘটেছে। বর্তমানে বন বিভাগের অফিশিয়াল পাস নেওয়ার পাশাপাশি দস্যু বাহিনীকেও মাসিক চাঁদা দিয়ে বিশেষ 'স্লিপ' নিতে হয়। চাঁদা দিতে না পারলে জেলেদের জিম্মি করে অমানুষিক নির্যাতন চালানো হয় এবং পরিবারের কাছে মোটা অঙ্কের মুক্তিপণ দাবি করা হয়।"

স্থানীয় জেলেদের অভিযোগ, সরকারের পক্ষ থেকে দস্যু দমনে বিভিন্ন সময় নানা আশ্বাসের কথা বলা হলেও বাস্তবে কার্যকর কোনো উদ্ধার অভিযান বা যৌথ তৎপরতা দেখা যায় না। এর সুযোগ নিয়ে ডাকাত দলের দৌরাত্ম্য দিন দিন বেড়েই চলেছে। এছাড়া নিষেধাজ্ঞার তিন মাসে অসাধু চক্র বনের অভয়ারণ্যে ঢুকে বিষ দিয়ে মাছ ধরা এবং ফাঁদ পেতে হরিণ শিকারের মতো মারাত্মক অপরাধে লিপ্ত ছিল বলেও অভিযোগ তুলেছেন তারা।

কেবল জেলেই নন, নিষেধাজ্ঞার কারণে চরম আর্থিক সংকটে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে স্থানীয় পর্যটন খাতও। মুন্সিগঞ্জের পর্যটকবাহী ট্রলার মালিক সমিতির কর্মকর্তা সিরাজুল ইসলাম জানান, তিন মাস ট্রলার অলস বসে থাকায় নোনা জলে কাঠের কাঠামোর ক্ষতি হয়েছে। নতুন করে সমিতি থেকে ঋণ নিয়ে ট্রলার মেরামত ও আলকাতরা লাগাতে বিপুল অর্থ ব্যয় করতে হয়েছে। পাস চালুর পর উপার্জিত অর্থ দিয়ে ঋণের কিস্তি শোধ করবেন, নাকি পরিবারের জীবিকা নির্বাহ করবেন, তা নিয়ে ঘোর অনিশ্চয়তায় দিন পার করছেন তারা।

সার্বিক বিষয়ে সুন্দরবন বন বিভাগের বুড়িগোয়ালিনী স্টেশন কর্মকর্তা ইরফান হোসেন জানান, প্রজনন ও সংরক্ষণ মেয়াদের আইনি বাধ্যবাধকতা শেষে আগামী ১ সেপ্টেম্বর থেকে নিয়ম অনুযায়ী জেলে, বাওয়ালি ও পর্যটকদের বনে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হবে। একই সঙ্গে বনাঞ্চলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষা ও বনজীবীদের সার্বিক সুরক্ষায় যৌথ পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে বলেও জানান তিনি।

   

About

Popular Links

x