Tuesday, September 08, 2026

সেকশন

English
Dhaka Tribune

হাম-উপসর্গে মৃত্যু: ৪০ লাখ পথশিশু টিকার বাইরে  

এ পর্যন্ত হাম ও হামের উপসর্গে আক্রান্ত শিশুর সংখ্যা ১ লাখ ৮৫ হাজার ৬০ 

আপডেট : ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৫:২৬ পিএম

প্রায় ছয় মাস পেরিয়ে গেলেও বাংলাদেশে হামে আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা কমছে না। প্রাণহানির সংখ্যা হাজার ছুঁই ছুঁই। এ পর্যন্ত হাম ও হামের উপসর্গে আক্রান্ত শিশুর সংখ্যা ১ লাখ ৮৫ হাজার ৬০। 

মহামারি বিশেষজ্ঞ মাহমুদুর রহমান বলছেন, ‘‘হাম এখন সরকারের অগ্রাধিকার তালিকা থেকে অনেকটাই হারিয়ে গেছে।’’ 

তবে একমত নন প্রধানমন্ত্রীর স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় বিষয়ক বিশেষ সহকারী ড. এস এম জিয়াউদ্দিন হায়দার। 

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এখন প্রায় সববয়সি শিশুর মধ্যে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়েছে। তাই প্রমাণভিত্তিকভাবে টিকাদানের বয়সসীমা অন্তত ১৫ বছর পর্যন্ত বাড়ানো, মাঠপর্যায়ে মাইক্রোপ্ল্যানিং জোরদার এবং কমিউনিটি পর্যায়ে নজরদারি ছাড়া এ প্রাদুর্ভাব থামানো সম্ভব নয় বলে মনে করছেন তারা। 

সোমবার (৭ সে) সকাল ৮টা পর্যন্ত আগের ২৪ ঘণ্টায় হাম ও হামসদৃশ উপসর্গে আরও তিন শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এতে দেশে নিশ্চিত ও সন্দেহভাজন হাম-সংশ্লিষ্ট মোট মৃত্যুর সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৯৯৭ জন। 

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. লেলিন চৌধুরী বলেন, ‘‘প্রথমত, বিপুল সংখ্যক শিশু আমাদের টিকাদানের বাইরে থেকে গেছে। ফলে তাদের শরীরে হার্ড ইউমিনিটি তৈরি হয়নি। দ্বিতীয়ত, আমরা দেখছি, ৬ মাসের কম বয়সি শিশুও হামে আক্রান্ত হচ্ছে। তারা কেন আক্রান্ত হচ্ছে? কারণ তাদের মা হামের টিকা পায়নি। ফলে শিশুর শরীরেও হামের ইউমিনিটি তৈরি হয়নি। তারাও আক্রান্ত হচ্ছে। এটা একটা দিক। আরেকটা দিক হচ্ছে, আমাদের ৪০ লাখের মতো পথশিশু রয়েছে। তারা হামের টিকা পায়নি। আপনি যদি ৯৫ শতাংশ শিশুকে টিকার আওতায় না আনতে পারেন তাহলে শিশুদের আক্রান্ত হওয়া বা মৃত্যু ঠেকানো সম্ভব নয়।’’ 

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. মোহাম্মদ মুশতাক হোসেন বলেন, ‘‘হাম নিয়ন্ত্রণের কৌশল হাসপাতাল বা আইসিইউকেন্দ্রিক না হয়ে কমিউনিটি পর্যায়ে হতে হবে। কমিউনিটির সম্পৃক্ততা ছাড়া রোগী শনাক্ত, প্রতিরোধ ও আইসোলেশন কার্যকরভাবে করা সম্ভব নয়। রোগী আইসিইউতে পৌঁছানোর পর মৃত্যু কমানোর সুযোগও সীমিত হয়ে যায়। জরুরি পরিস্থিতিতে বাড়ি বাড়ি গিয়ে টিকা দেওয়া ঠিক হলেও দীর্ঘমেয়াদে ইপিআইয়ের প্রচলিত মাইক্রোপ্ল্যানিং পদ্ধতিতে ফিরতে হবে। অর্থাৎ প্রতিটি শিশুর তালিকা তৈরি করতে হবে, কে টিকা পাবে তা নির্ধারণ করতে হবে এবং তাদের বাড়ির কাছের টিকাকেন্দ্রের তথ্য আগে থেকেই জানিয়ে দিতে হবে। ছিটেফোঁটা টিকা দিয়ে কখনোই ৯৫ শতাংশ কভারেজ হবে না।’’ 

জাতীয় হাম ও রুবেলা নির্মূল যাচাই কমিটির চেয়ারম্যান ও মহামারি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক মাহমুদুর রহমান বলেন, ‘‘বর্তমান পরিস্থিতিতে হাম কমার কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। কারণ সংক্রমণ এখন প্রায় সব বয়সি শিশুর মধ্যেই রয়েছে। ছয় থেকে নয় মাস, নয় মাস থেকে এক বছর এবং এক থেকে পাঁচ বছর সব বয়সি শিশুর মধ্যেই সংক্রমণ রয়েছে। কোথাও কোথাও সামান্য কমলেও তা উল্লেখযোগ্য নয়। এতে বোঝা যায়, ঘোষিত টিকাদান কভারেজ বাস্তবে কার্যকরভাবে প্রতিফলিত হয়নি। ১০৩ শতাংশ কাভারেজের দাবি বাস্তবতার সঙ্গে মেলে না৷ লক্ষ্য নির্ধারণেই অসঙ্গতি থাকলে কাভারেজের হিসাবও বিভ্রান্তিকর হতে পারে। শুধু টিকা সরবরাহ করলেই হবে না। মায়েদের শিশুদের টিকাকেন্দ্রে নিয়ে আসতে উদ্বুদ্ধ করতে ব্যাপক জনসচেতনতা প্রয়োজন। বিশেষ করে ছয় মাসের কম বয়সি শিশুদের জ্বর হলে দ্রুত শনাক্ত ও আলাদা রাখার বিষয়েও গুরুত্ব দিতে হবে। হাম এখন সরকারের অগ্রাধিকার তালিকা থেকে অনেকটাই হারিয়ে গেছে।’’ 

তবে সরকার সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে বিষয়টি দেখছে বলে জানান প্রধানমন্ত্রীর স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় বিষয়ক বিশেষ সহকারী ড. এস এম জিয়াউদ্দিন হায়দার। 

তিনি বলেন, ‘‘এখন যেসব শিশুর শরীরে ইউমিনিটি নেই, অনেকে আবার একেবারে শেষ পর্যায়ে হাসপাতালে আসছে, ফলে মৃত্যুর সংখ্যা কমছে না। আমরাতো টিকা দিয়েছি। এখন কেউ প্রশ্ন করতে পারে টিকার কার্যকারিতা নিয়ে। এটা নিয়েও কাজ হচ্ছে। যারা টিকা পেয়েছে তাদের থেকে রক্ত সংগ্রহ করে পরীক্ষা করা হচ্ছে। এই রিপোর্ট পেতে কিছুদিন সময় লাগবে। আমরা প্রতিটি উপজেলায় টিকা মজুত করেছি যাতে যে কেউ চাইলেই টিকা দিতে পারে। সব মিলিয়ে সরকারের চেষ্টায় ঘাটতি নেই।’’ 

মার্চের প্রথম দিকে হামের প্রাদুর্ভাব শুরুর পর গত এপ্রিলে সরকার ৬ মাস থেকে ৫ বছর বয়সি শিশুদের হামের টিকাদানে বিশেষ ক্যাম্পেইন শুরু করেছিল। সেই সময় সারা দেশের অন্তত এক কোটি ৮০ লাখ ১৫ হাজার শিশুকে টিকার আওতায় আনার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল। 

এরপর জুন মাসে একই বয়সসীমার শিশুদের ভিটামিন ‘এ’ খাওয়ানোর কর্মসূচি শুরু হয়। তখন দেখা যায়, শিশুর সংখ্যা ছিল ২ কোটি ২৬ লাখ। 

এরপরই প্রশ্ন ওঠে, তাহলে ৪৬ লাখ শিশু হামের টিকা থেকে বাদ পড়লো কিনা।  যদিও প্রধানমন্ত্রীর স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় বিষয়ক বিশেষ সহকারী ড. এস এম জিয়াউদ্দিন হায়দার এই ৪৬ লাখ শিশু আদৌ বাদ পড়েছে কিনা সেই প্রশ্ন তুলেছেন। 

তিনি বলেন, ‘‘ভিটামিন ‘এ’ ক্যাম্পেইনে যে বেশি শিশু এসেছে তাদের সবার বয়স যে ৫ বছরের নিচে সেটাও তো নিশ্চিত নয়। এমনও তো হতে পারে ৫ বছরের বেশি বয়সি অনেক শিশু ভিটামিন ‘এ’ ক্যাম্পেইনের আওতায় এসেছে। আসলে এসব ব্যাপারে নিশ্চিত তথ্য পেতে হলে জরিপ করা প্রয়োজন।’’ 

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ডাব্লিউএইচও বলছে, সংক্রমণের শৃঙ্খল ভাঙতে অন্তত ৯৫ শতাংশ শিশুকে দুই ডোজ টিকার আওতায় আনতে হয়। তখন কোনো এলাকায় অল্পসংখ্যক টিকা না পেলেও সংক্রমণ সহজে ছড়াতে পারে না। এবার বাংলাদেশে যে বড় প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে, সেটিও মূলত এই ইমিউনিটি গ্যাপের ফল বলে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো মনে করেছে। 

 

   

About

Popular Links

x