সাতক্ষীরার চৌরঙ্গী মোড়ে অবস্থিত বেসরকারি একটি হাসপাতালে ৪২ দিনের ব্যবধানে আবারও অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে।
মঙ্গলবার (১৫ সেপ্টেম্বর) রাত ১১টার দিকে হাসপাতালের অক্সিজেন সিলিন্ডার রাখার স্থান থেকে আগুনের সূত্রপাত হয় বলে জানিয়েছে ফায়ার সার্ভিস।
আগুনের তুলনায় ধোঁয়ায় বেশি আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে রোগী ও স্বজনদের মধ্যে। দ্রুত হাসপাতাল থেকে বের হয়ে কেউ সাতক্ষীরা সদর হাসপাতালে ছুটে যান, কেউ রাস্তার পাশে ভ্যানের ওপর শুয়ে থাকেন। আবার কেউ অসুস্থ অবস্থায় হেঁটেই হাসপাতাল থেকে বের হয়ে আসেন।
আগুন লাগার খবর ছড়িয়ে পড়ার পর হাসপাতালের বিভিন্ন তলায় থাকা রোগী ও স্বজনরা দ্রুত নিচে নামতে শুরু করেন। নার্সরা রোগীদের দ্রুত বের হয়ে যাওয়ার নির্দেশ দেন। এ সময় স্বজনরা অসুস্থ রোগীদের ধরে, কোলে করে কিংবা একাধিকজন মিলে নিচে নামিয়ে আনেন।
রোগীর স্বজন মতিয়ার রহমান বলেন, “আমরা রাতে খাওয়া-দাওয়া শেষে রোগীকে ওষুধ খাওয়ানোর পর বসে ছিলাম। এরই মধ্যে নার্স এসে বললেন, জিনিসপত্র থাক, শুধু মোবাইলটা নেন, দ্রুত বের হয়ে আসেন। ছয়তলায় সমস্যা হয়েছে। আমরা আস্তে আস্তে রোগী নিয়ে বের হয়ে আসলাম। বলা হলো, আগুন লেগেছে। নিচে এসে দেখলাম শুধু ধোঁয়া। আমরা খুব আতঙ্কিত হয়ে পড়েছিলাম।”
আরেক রোগীর স্বজন বলেন, “হাসপাতালে আগের দিনই একজনের সিজার হয়েছিল। রাতে হঠাৎ আগুনের খবর পেয়ে নার্সরা সবাইকে দ্রুত নিচে নেমে আসতে বলেন।”
তিনি বলেন, “যে যেভাবে আছো, নেমে এসো, এমন কথা বলা হচ্ছিল। ৮-১০ জন মিলে রোগী নিচে নিয়ে আসতে আসতে আমাদের জীবন শেষ। সবাই বলছে আগুন লেগেছে, চিৎকার-চেঁচামেচি করছে, নার্সরাও আতঙ্কিত। আমাদের রোগীকে পরে সদর হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়েছে।”
হাসপাতালের পাশের ভবনের বাসিন্দা মো. ইদ্রিস আলী ময়না বলেন, “রাত ১১টার দিকে তিনি এক বন্ধুর সঙ্গে বাসার সামনে দাঁড়িয়ে কথা বলছিলেন। হঠাৎ জোরে শব্দ শুনে হাসপাতালের দিকে তাকিয়ে দেখেন, নিচের অংশ ধোঁয়ায় ভরে গেছে।”
তিনি বলেন, “আমার বাসা হাসপাতালের পাশে। কয়েকদিন আগে এখান থেকে এমন একটি ঘটনা ঘটেছে। আমরা তো পরিবার নিয়ে নিরাপত্তাহীনতায় আছি। এটা কীভাবে সমাধান হয়, সমাধানের পথ বের করতে হবে, যাতে আমরা ছেলেমেয়ে নিয়ে নিরাপদে বসবাস করতে পারি। এখানে কয়েক দিন পরপরই এমন পরিস্থিতি হচ্ছে। এটা নিয়ে আমরা আতঙ্কিত।”
সাতক্ষীরা ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স স্টেশনের ওয়্যারহাউস ইন্সপেক্টর মো. নুরুল ইসলাম বলেন, “খবর পাওয়ার পরপরই তারা ঘটনাস্থলে পৌঁছান। সেখানে গিয়ে দেখা যায়, আগে যেখানে অক্সিজেন সিলিন্ডার রাখা হতো, সেখান থেকেই আগুনের সূত্রপাত হয়েছে।”
আগের অগ্নিকাণ্ডেও একই স্থান থেকে আগুনের সূত্রপাত হয়েছিল বলে জানান তিনি।
নুরুল ইসলাম বলেন, “আমরা সংবাদ পাই, ব্লিস হাসপাতালে আবারও আগুন লেগেছে। সংবাদ পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে এখানে আসি। উপস্থিত হয়ে দেখি, যেখানটায় অক্সিজেন সিলিন্ডার ছিল, ওই জায়গা থেকেই আগুনের সূত্রপাত হয়েছে। গতবার যেখানে সূত্রপাত হয়েছিল, এবারও একই জায়গায়। প্রথমে আমরা নিচে ঢুকে দেখি ধোঁয়ায় ভরা। পরে ভেতরে গিয়ে আগুন দেখতে পাই। আগুন নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসা হয়েছে।”
তিনি বলেন, “ধোঁয়ার কারণে রোগী ও স্বজনরা ভীত হয়ে তাড়াহুড়া করে নিচে নামছিলেন। আগুনের বড় ধরনের ঝুঁকি না থাকায় পরে তাদের শান্ত থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়। একসঙ্গে অনেক রোগী নিচে নামতে গেলে হুড়োহুড়িতে আহত হওয়ার আশঙ্কাও ছিল।”
একই হাসপাতালে বারবার অগ্নিকাণ্ডের বিষয়ে ফায়ার সার্ভিসের এই কর্মকর্তা বলেন, “হাসপাতালটি বড় এবং প্রতিটি ফ্লোরে অক্সিজেনের লাইন রয়েছে। ভবনের নিচে থাকা সিলিন্ডার থেকেই পুরো ব্যবস্থাটি নিয়ন্ত্রণ করা হয়।”
তার ধারণা, কারিগরি ত্রুটির কারণে অক্সিজেনের চাপ নিয়ন্ত্রণে সমস্যা হয়ে পাইপ ফেটে আগুনের সূত্রপাত হয়ে থাকতে পারে। তবে এটি প্রাথমিক ধারণা এবং তদন্তের মাধ্যমে অগ্নিকাণ্ডের প্রকৃত কারণ নিশ্চিত হওয়া যাবে।
এদিকে অগ্নিকাণ্ডের খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে সংবাদ সংগ্রহ করতে গেলে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ সাংবাদিকদের প্রথমে ভেতরে প্রবেশে বাধা দেন। এ নিয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের উত্তেজনাকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়।
এর আগে গত ৪ আগস্ট একই হাসপাতালে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। ওই ঘটনায় নারী, শিশু ও বয়স্ক রোগীসহ বেশ কয়েকজন আহত হন। আগুন নিয়ন্ত্রণ ও উদ্ধারকাজে ফায়ার সার্ভিসের চারটি ইউনিট অংশ নেয়।



