মিরপুরের রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনায় বিএনপির সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টির বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ তদন্তে প্রাথমিকভাবে প্রমাণিত হলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ।
বৃহস্পতিবার (১ অক্টোবর) সচিবালয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি এ কথা বলেন। একই সঙ্গে মিষ্টি সংসদ সদস্য পদ থেকে পদত্যাগ করেছেন কি না, সে বিষয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, বিষয়টি তার এখতিয়ারের নয় এবং এ বিষয়ে স্পিকার জানাতে পারবেন।
মিষ্টিকে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে পদত্যাগ করতে বলা হয়েছে, বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত এমন খবরের বিষয়ে জানতে চাইলে সালাহউদ্দিন বলেন, "আমি দলীয় প্রধানও নই, আমি স্পিকারও নই। একটা বিষয়ে মাননীয় স্পিকার বলতে পারবেন, জমা দিয়েছেন কি না। দলীয় বিষয়টা দলের প্রধান বলতে পারবেন। তো একটু ধৈর্য ধরার জন্য অনুরোধ করছি।"
রাড্ডার ঘটনায় মিষ্টির বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়া সম্পর্কে জানতে চাইলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, "আইনি ব্যবস্থা হচ্ছে, অভিযোগের তদন্তে যদি সে অভিযুক্ত বলে প্রাথমিকভাবে প্রমাণিত হয়, প্রাথমিকভাবে তার বিরুদ্ধে চার্জশিট হবে।"
দলীয় ব্যবস্থা ও আইনি ব্যবস্থা আলাদা বলেও মন্তব্য করেন তিনি। সালাহউদ্দিন বলেন, "দলীয় ব্যবস্থা হবে দলের পক্ষ থেকে। এটা আইনের বাইরে সাংগঠনিক ব্যবস্থা। আর আইনি ব্যবস্থা হচ্ছে, যদি চার্জশিটেড হয়, তাহলে তাকে আদালতের এখতিয়ারে যেতে হবে, আইনের আওতায় আসবে।"
তবে অভিযোগ তদন্তে প্রমাণিত হওয়ার আগে কোনো সংসদ সদস্যকে নিয়ে মন্তব্য করা ঠিক নয় বলেও সতর্ক করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি বলেন, "অভিযোগ তদন্তের মাধ্যমে প্রমাণিত হওয়ার আগে একজন সংসদ সদস্যের বিষয়ে মন্তব্য করা ঠিক নয়।"
১৯৭৪ সাল থেকে মিরপুরের গরিব ও অসহায় মা ও শিশুদের বিনামূল্যে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা, প্রসূতি সেবা ও পরিবার পরিকল্পনা সেবা দিয়ে আসছে রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টার। গত ২৪ সেপ্টেম্বর গভীর রাতে সেখানে হামলা, লুটপাট ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে।
প্রায় ২০০ লোক দেশীয় অস্ত্র ও ভারী যন্ত্রপাতি নিয়ে সেখানে ঢুকে একটি টিনশেড ও তিনটি সেমিপাকা ভবন গুঁড়িয়ে দেয়। পাকা ভবনের আল্ট্রাসাউন্ড কক্ষ, টিকা কক্ষ, ল্যাবরেটরিসহ পাঁচটি কক্ষের জানালা-দরজাও ভেঙে ফেলা হয়।
ভবন থেকে আসবাবপত্র, ওষুধসামগ্রী, আল্ট্রাসোনোগ্রাম মেশিন, জেনারেটর, কম্পিউটার, প্রিন্টার, ফ্রিজ, এসি ও আলমারিসহ বিভিন্ন সামগ্রী নিয়ে যায় হামলাকারীরা। সব মিলিয়ে পুরো স্থাপনায় কোটি টাকার বেশি ক্ষতি হয়েছে বলে রাড্ডা কর্তৃপক্ষের অভিযোগ।
ভাঙচুর ও লুটপাটের পর সেখানে "সমমনা দোকানদার সমিতি লিমিটেড"-এর সাইনবোর্ড লাগিয়ে দিয়ে যায় হামলাকারীরা। এ ঘটনায় শাহ আলী থানায় করা মামলায় স্থানীয় বিএনপি নেতা হানিফ মিয়াসহ ২০০-২৫০ জনকে আসামি করা হয়। হানিফ মিয়া এ ঘটনায় নিজের সম্পৃক্ততার কথা অস্বীকার করেছেন।
হানিফ মিয়াসহ স্থানীয় বিএনপি ও সহযোগী সংগঠনের কয়েকজন নেতার নামও এ ঘটনায় আসে, যারা ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টির ঘনিষ্ঠ হিসেবে এলাকায় পরিচিত। সমমনা দোকানদার সমবায় সমিতি লিমিটেডের সঙ্গেও স্থানীয় বিএনপির কয়েকজনের সম্পৃক্ততার তথ্য এসেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
২০০৬ সালে শাহ আলী থানার ৮ নম্বর ওয়ার্ডের কমিশনার থাকাকালে ওই সমিতির সভাপতি ছিলেন মিষ্টি। রাড্ডা সেন্টারের জমি ওই সমিতির নামে বরাদ্দ দেওয়ার জন্য তখন গৃহায়ণ ও গণপূর্ত কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন করা হয়েছিল। ওই আবেদনে সভাপতি হিসেবে মিষ্টির সই ছিল।
ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টি ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক ছিলেন। তিনি প্রয়াত বিএনপি নেতা নাসিরউদ্দিন আহমেদ পিন্টুর ছোট বোন। তার স্বামী প্রয়াত সাইদুর রহমান নিউটনও বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং ঢাকার একটি ওয়ার্ডের কাউন্সিলর ছিলেন। স্বামীর মৃত্যুর পর মিষ্টি ওই ওয়ার্ডের কাউন্সিলর নির্বাচিত হন।
রাড্ডায় হামলা-ভাঙচুরের পর মিষ্টি দাবি করেন, ওই সমিতির সঙ্গে এখন তার কোনো সম্পৃক্ততা নেই। হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনাতেও তার কোনো হাত নেই।
এর আগে বুধবার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাংবাদিকদের জানিয়েছিলেন, রাড্ডার কার্যালয় গুঁড়িয়ে দেওয়ার ঘটনায় মিষ্টির বিরুদ্ধে তদন্ত চলছে। ওই ঘটনায় বিএনপির কারও সম্পৃক্ততা পাওয়া গেলে কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না বলেও জানিয়েছিলেন তিনি।
এরপর বৃহস্পতিবার দুপুরে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে মিষ্টিকে সংসদ সদস্য পদ থেকে পদত্যাগের নির্দেশ দেওয়ার খবর আসে। প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব আবু আব্দুল্লাহ এম ছালেহ বিষয়টি নিশ্চিত করেন বলে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম জানিয়েছে।
এদিকে বুধবার রাতে ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির ৫১ সদস্যের আহ্বায়ক কমিটি বিলুপ্ত করা হয়। পাশাপাশি ঢাকা মহানগর উত্তর যুবদল ও ঢাকা মহানগর পশ্চিম ছাত্রদলের কমিটিও বিলুপ্ত করা হয়। এছাড়া বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের বিভিন্ন পর্যায়ের ১৪ জনকে বহিষ্কারের ঘোষণা আসে।



