অসহায় ও আশ্রয়হীন প্রবীণদের শেষ আশ্রয়স্থল হওয়ার কথা ছিল ভবনটির। থাকার কথা ছিল ২৫ জন প্রবীণের। স্বাস্থ্যসেবা, লিফট, বিনোদন, শরীরচর্চা, প্রার্থনা ও প্রশিক্ষণের ব্যবস্থাও রাখা হয়েছিল। এজন্য ব্যয় হয়েছে প্রায় ৯ কোটি টাকা। তিন বছর আগে আনুষ্ঠানিক উদ্বোধনও হয়েছে।
কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। উদ্বোধনের তিন বছর পরও একজন প্রবীণও সেখানে আশ্রয় পাননি। প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগের অর্গানোগ্রামই তৈরি হয়নি। ফলে কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত রাজশাহীর পবা উপজেলার বায়া এলাকার এখন পড়ে আছে অচল অবস্থায়। সম্প্রতি সেই ভবনের কক্ষেই চলছে সিনেমার শুটিং।
শুক্রবার (২ অক্টোবর) সকালে সরেজমিনে দেখা যায়, শান্তিনিবাসের নিচতলার দুটি কক্ষে সিনেমার শুটিং চলছে। একটি কক্ষ সাজানো হয়েছে থানার ডিউটি অফিসারের কক্ষের আদলে। পাশের কক্ষে রাখা হয়েছে দুটি শয্যা। আরেকটি বড় কক্ষে শুটিং দলের সদস্যদের বসা ও খাবারের ব্যবস্থা করা হয়েছে।
অথচ ভবনটি নির্মাণ করা হয়েছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন উদ্দেশ্যে-পরিত্যক্ত, দাবিদারহীন, দুর্দশাগ্রস্ত ও অবহেলিত প্রবীণদের নিরাপদ আবাসনের জন্য।
সমাজসেবা অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ৬০ বছরের বেশি বয়সী এসব প্রবীণের নিরাপদ আবাসন, পরিচর্যা ও জীবনমান উন্নয়নের লক্ষ্যেই ‘শান্তিনিবাস’ কার্যক্রম নেওয়া হয়। ২০২০ সালে দেশের আট বিভাগে সরকারি শিশু পরিবারের প্রাঙ্গণে ২৫ শয্যার শান্তিনিবাস নির্মাণের প্রকল্প নেওয়া হয়।
রাজশাহীতে পবা সরকারি শিশু পরিবার (বালক) প্রাঙ্গণের পশ্চিম পাশে পাঁচতলা ভিত্তির ওপর নির্মাণ করা হয় তিনতলা ভবন। ১,৬২১ বর্গমিটার আয়তনের ভবনটিতে ২৫ জন প্রবীণের থাকার ব্যবস্থা রয়েছে। রয়েছে লিফট, অভ্যর্থনা ও দর্শনার্থী কক্ষ, স্বাস্থ্যসেবা কর্নার, বসার স্থান, বিনোদন ও শরীরচর্চার সরঞ্জাম, প্রার্থনাকক্ষ, প্রশিক্ষণ কর্নার, উৎপাদন ইউনিট ও কফি কর্নার। কাগজে-কলমে সবই প্রস্তুত। শুধু নেই প্রবীণদের থাকার ব্যবস্থা।
দীর্ঘদিন ব্যবহার না হওয়ায় ভবনের বিভিন্ন স্থানে ধুলার আস্তরণ পড়েছে। কোথাও দেয়ালে শেওলা ধরেছে। পড়ে থাকা আসবাব ও সরঞ্জামও নষ্ট হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। ফলে প্রশ্ন উঠেছে-যে ভবন প্রবীণদের জন্য নির্মাণ করা হলো, সেটি চালু করার আগেই কেন জনবল ও পরিচালন কাঠামোর ব্যবস্থা করা হলো না?
রাজশাহী সমাজসেবা অধিদফতরের উপপরিচালক মনিরা খাতুন বলেন, “শান্তিনিবাস পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় জনবল নেই। এমনকি জনবল নিয়োগের জন্য অর্গানোগ্রামও তৈরি হয়নি। এ কারণে এখন পর্যন্ত কোনো প্রবীণকে সেখানে ভর্তি করা সম্ভব হয়নি।”
অর্থাৎ প্রায় ৯ কোটি টাকা ব্যয়ে অবকাঠামো নির্মাণ শেষ হলেও প্রকল্পটির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ-পরিচালনা ও সেবা কার্যক্রম-থেকে গেছে অনিশ্চয়তায়।
শান্তিনিবাস নির্মাণ প্রকল্পের পরিচালক ছিলেন সমাজসেবা অধিদপ্তরের তৎকালীন উপপরিচালক সাদিকুল হক। বর্তমানে তিনি অধিদপ্তরের অতিরিক্ত পরিচালক হিসেবে কর্মরত বলে জানা গেছে। তার বক্তব্য জানতে কয়েক দিন ধরে মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও সাড়া পাওয়া যায়নি।
সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) রাজশাহী জেলার সভাপতি সফিউদ্দিন আহমেদ বলেন, “শুধু প্রকল্প গ্রহণ ও ভবন নির্মাণ করলেই দায়িত্ব শেষ হয় না। প্রকল্প চালুর জন্য প্রয়োজনীয় জনবল ও অর্থের সংস্থান নিশ্চিত করাও পরিকল্পনার অংশ। এসব না থাকলে সরকারি অর্থ ব্যয়ে নির্মিত অবকাঠামো অকার্যকর হয়ে পড়ে।”
প্রবীণদের জন্য নিরাপদ আবাসনের প্রয়োজনীয়তা যখন বাড়ছে, তখন সেই উদ্দেশ্যে নির্মিত কোটি টাকার ভবন তিন বছর ধরে পড়ে থাকা শুধু প্রশাসনিক অদক্ষতার প্রশ্ন নয়; এটি সরকারি অর্থের ব্যবহার ও প্রকল্প পরিকল্পনার কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন তুলছে।



