Friday, June 05, 2026

সেকশন

English
Dhaka Tribune

ময়মনসিংহে ২৬৩ বছরের ঐতিহ্যবাহী “হুমগুটি” খেলায় মানুষের ঢল

৪০ কেজি ওজনের পিতলের তৈরি বলের মতো দেখতে একটি বস্তুর নাম ‘গুটি’। এটি দিয়েই হয় হুমগুটি খেলা। এই খেলায় নেই কোনো নিয়ম কানুন, থাকেনা কোনো রেফারি কিংবা বিচারক

আপডেট : ১৫ জানুয়ারি ২০২২, ০৬:৪৭ পিএম

হুমগুটি খেলাটি অনেকের অজানা হলেও ময়মনসিংহবাসীর কাছে খুবই পরিচিত এক নাম। ৪০ কেজি ওজনের পিতলের তৈরি বলের মতো দেখতে একটি বস্তুর নাম “গুটি”। এটি দিয়েই হয় হুমগুটি খেলা। এই খেলায় নেই কোনো নিয়ম কানুন, থাকেনা কোনো রেফারি কিংবা বিচারক। খেলোয়াড়েরও কোনো নির্দিষ্ট সংখ্যাও নেই। গুটি টানাটানিই হলো খেলা। টেনে হিঁচড়ে কাড়াকাড়ি করে যে বা যারা এই গুটি গুম করে ফেলতে পারবে তারাই বিজয়ী।

২৬৩ বছরের ঐতিহ্যবাহী “হুমগুটি” খেলা উপভোগ করতে করোনাভাইরাসের বিধিনিষেধ উপেক্ষা করেই জমায়েত হয়েছিলো হাজার হাজার মানুষ।

হুমগুটি খেলায় অংশ নিতে শুক্রবার (১৪ জানুয়ারি) সকাল থেকেই ফুলবাড়িয়ার লক্ষ্মীপুর গ্রামের বড়ই আটা বন্দে মানুষজন আস্তে শুরু করেন। বিকেলে খেলা শুরুর আগেই খেলাস্থল পরিণত হয় জনসমুদ্রে। পৌষ মাসের শেষ দিনকে ময়মনসিংহের ফুলবাড়িয়ায় আঞ্চলিক ভাষায় বলা হয় পুহুরা। এ দিনে একই সময়ে একই স্থানে যুগ যুগ ধরে অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে এই হুমগুটি খেলা।

এলাকাভিত্তিক একেকটি দলে শতশত খেলোয়াড়ের অংশগ্রহণে চলে গুটি দখলের শক্তির লড়াই। এ খেলাকে কেন্দ্র করে লক্ষ্মীপুর, দেওখোলাসহ পার্শ্ববর্তী গ্রামগুলোতে চলে উৎসবের আমেজ। এদিকে হুমগুটি খেলাকে ঘিরে বসা গ্রামীণ মেলায় শিশুদের খেলনা ও খাবারের দোকানেও ছিল উপচেপড়া ভিড়। খেলা দেখতে সপরিবারে এসেছিলেন অনেকে। 

জানা যায়, ১৭৫৮ সালে মুক্তাগাছার জমিদার রাজা শশিকান্তের সঙ্গে ত্রিশাল উপজেলার বৈলরের হেমচন্দ্র রায় জমিদারের জমির পরিমাপ নিয়ে বিরোধ সৃষ্টি হয়। জমিদার আমলের শুরু থেকেই তালুকের প্রতি কাঠা জমির পরিমাপ ছিল ১০ শতাংশে। পরগনার প্রতি কাঠা জমির পরিমাপ ছিল সাড়ে ৬ শতাংশে। একই জমিদারের ভূখণ্ডে দুই নীতির বিরুদ্ধে গড়ে ওঠে প্রতিবাদী আন্দোলন।

জমির পরিমাপ নিয়ে সৃষ্ট বিরোধ মীমাংসা করতে লক্ষ্মীপুর গ্রামের বড়ই আটা নামক স্থানে “তালুক-পরগনার সীমানায়” এ গুটি খেলার আয়োজন করা হয়। গুটি খেলার শর্ত ছিল গুটি গুমকারী এলাকাকে “তালুক” এবং পরাজিত অংশের নাম হবে “পরগনা”। 

জমিদার আমলের সেই গুটি খেলায় মুক্তাগাছা জমিদারের প্রজারা বিজয়ী হয়। এভাবেই তালুক পরগনার সীমান্তের জিরো পয়েন্টে ব্রিটিশ আমলে জমিদারী এই খেলার গোড়াপত্তন। জমিদার ও জমিদারি প্রথা না থাকলেও সেই হুমগুটি খেলাটির ঐতিহ্য ধরে রেখেছে এলাকাবাসী। খেলায় মুক্তাগাছা, ত্রিশাল, ময়মনসিংহ সদর ও ফুলবাড়িয়া উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়ন থেকে চেয়ারম্যানের নেতৃত্বে দল বেঁধে শতশত খেলোয়াড় ও উৎসুক জনতা আসে খেলাটি দেখতে। 

এ খেলায় একেক এলাকার একেকটি নিশানা থাকে। ওই নিশানা দেখে বোঝা যায় কারা কোন পক্ষের লোক। “গুটি” কোন দিকে যাচ্ছে তা মূলত চিহ্নিত করা হয় নিশানা দেখেই। নিজেদের দখলে নিতে বিভিন্ন কৌশল অবলম্বন করা হয় খেলায়। এভাবে গুটি “গুম” না হওয়া পর্যন্ত চলে খেলা। 

হুমগুটি সাংস্কৃতিক ফোরামের পরিচালক এবি ছিদ্দিক বলেন, “জমিদার আমল থেকে হুমগুটি খেলা হয়ে আসছে। বংশপরম্পরায় আমার পূর্বপুরুষরা ঐতিহ্যবাহী খেলাটির আয়োজন করেছে। এখন আমরা করছি, এরপর পরবর্তী প্রজন্ম করবে। এভাবে যুগযুগ চলতেই থাকবে।”

দেওখোলা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. তাজুল ইসলাম জানান, হুমগুটি একটি ঐতিহ্যবাহী প্রাচীন খেলা। খেলাকে ঘিরে এলাকায় উৎসবের আমেজ বিরাজ করছে। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকেও খেলাটি দেখতে মানুষ জড়ো হয়ে থাকে।

   

About

Popular Links

x