দেশে মধু উৎপাদনের অন্যতম প্রধান ক্ষেত্র হচ্ছে সুন্দরবন। ১৮৬০ সাল থেকে শুরু হয় সুন্দরবনে মধু সংগ্রহ। বনসংলগ্ন একটি ক্ষুদ্র গোষ্ঠী বংশ পরম্পরায় মধু সংগ্রহ করে আসছে। আর তাদেরকেই বলা হয় মৌয়াল। সুন্দরবনের সবচেয়ে ভালো মানের মধু খোলসী ফুলের “পদ্ম মধু”। মানের দিক থেকে এরপরেই গরান ও গর্জন ফুলের “বালিহার মধু”। মৌসুমের একেবারে শেষে আসা কেওড়া ও গেওয়া ফুলের মধু অপেক্ষাকৃত কম সুস্বাদু।
অন্যান্য বছর ১ এপ্রিল থেকে সুন্দরবনে মধু ও মোম সংগ্রহ শুরু করেন মৌয়ালরা। কিন্তু গত বছর করোনাকালে মধু সংগ্রহ বেড়ে যাওয়ায় এবার ১৫ মার্চ থেকেই শুরু হচ্ছে মধু আহরণ।
মধু সংগ্রহের জন্য প্রতি বছরের ১ এপ্রিল থেকে তিন মাসের (এপ্রিল, মে ও জুন) জন্য মৌয়ালদের অনুমতিপত্র দেয় বন বিভাগ।
মধু সংগ্রহে যাওয়ার আগে বিশেষ প্রার্থনা করেন মৌয়ালরা। তারা আগে সনাতন পদ্ধতিতে মধু সংগ্রহ করতেন। এখন সনাতন পদ্ধতির পাশাপাশি হাইজেনিক পদ্ধতিতেও সুন্দরবন থেকে মধু ও মোম সংগ্রহ করেন। ফলে মধু ও মোম সংগ্রহের পরিমাণ দিন দিন বাড়ছে।
পরিচ্ছন্নভাবে মধু সংগ্রহ এবং এর গুণগত মানও বজায় রাখার জন্য বেসরকারি সংগঠনগুলো মৌয়ালদের যন্ত্রপাতি বিতরণ করছে।
সুন্দরবনের মধু শক্তি প্রদায়ী, হজমে সহায়তা, কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করে, ফুসফুসের যাবতীয় রোগ ও শ্বাসকষ্ট নিরাময় করে। মধুতে রয়েছে ভিটামিন যা অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট হিসাবে কাজ করে। মধুতে প্রায় ৪৫টি খাদ্য উপাদান থাকে।
সুন্দরবন বিভাগের তথ্যে জানা গেছে, ২০২০-২১ অর্থবছরে এক হাজার ২০৪টি পাস নিয়ে সাত হাজার ৭১ জন মৌয়াল বনে মধু আহরণে যান। তা থেকে ৪৩ লাখ ১১ হাজার ৫৬৩ টাকার রাজস্ব আসে। এর মধ্যে মধু থেকে ৩০ লাখ ৭৯ হাজার ৬১৩ টাকা ও মোম থেকে ১২ লাখ ৩১ হাজার ৯৫০ টাকা আসে। গত মৌসুমে সুন্দরবন থেকে ৪১০৬.১৫ কুইন্টাল মধু ও ১২৩১.৯৫ কুইন্টাল মোম আহরিত হয়।
সুন্দরবন পশ্চিম বিভাগের তথ্য মতে, ২০২০-২১ অর্থবছরে মধু ও মোম আহরণের জন্য এক হাজার ১২টি পাশের আওতায় ছয় হাজার ৭৯৭ জন মৌয়াল সুন্দরবনে প্রবেশ করেন। তারা ৩৪১৯.১৫ কুইন্টাল মধু ও ১০২৫.৮৫ কুইন্টাল মোম আহরণ করে। আর মধু থেকে ২৫ লাখ ৬৪ হাজার ৩৬৩ টাকা ও মোম থেকে ১০ লাখ ২৫ হাজার ৮৫০ টাকা রাজস্ব আসে।
২০১৯-২০ অর্থবছরে মধু ও মোম আহরণের জন্য ৯৭৩টি পাশের আওতায় পাঁচ হাজার ৪৫৫ জন মৌয়াল সুন্দরবনে প্রবেশ করেন। তারা ৩২২৭.৫০ কুইন্টাল মধু ও ৯৬৮.২৫ কুইন্টাল মোম আহরণ করেন। আর মধু থেকে ২৪ লাখ ২০ হাজার ৬২৫ টাকা ও মোম থেকে ৯ লাখ ৬৮ হাজার ২৫০ টাকা রাজস্ব আসে।
২০১৮-১৯ অর্থবছরে মধু ও মোম আহরণের জন্য ৬৭০টি পাশের আওতায় চার হাজার ৫১৫ জন মৌয়াল সুন্দরবনে প্রবেশ করেন। তারা ২২৭৮.৮৫ কুইন্টাল মধু ও ৬৭০.৭০ কুইন্টাল মোম আহরণ করেন। আর মধু থেকে ১৭ লাখ ৬২ হাজার ৫০৩ টাকা ও মোম থেকে ৬ লাখ ৭০ হাজার ৭০০ টাকা রাজস্ব আসে।
সুন্দরবন পূর্ব বিভাগের তথ্য মতে, ২০২০-২১ অর্থবছরে মধু ও মোম আহরণের জন্য ১৯২টি পাশের আওতায় এক হাজার ৩৭৪ জন মৌয়াল সুন্দরবনে প্রবেশ করেন। তারা ৬৮৭ কুইন্টাল মধু ও ২০৬.১০ কুইন্টাল মোম আহরণ করেন। আর মধু থেকে ৫ লাখ ১৫ হাজার ২৫০ টাকা ও মোম থেকে ২ লাখ ৬ হাজার ১০০ টাকা রাজস্ব আসে।
২০১৯-২০ অর্থবছরে ১২২০.৫০ কুইন্টাল মধু ও ৩৬৬.১৫ কুইন্টাল মোম আহরণ করা হয়। আর মধু থেকে ৯ লাখ ১৫ হাজার ৩৭৫ টাকা ও মোম থেকে ৩ লাখ ৬৬ হাজার ১৫০ টাকা রাজস্ব আসে।
২০১৮-১৯ অর্থ বছরে ৭৪২.৫০ কুইন্টাল মধু ও ২২৯.৫০ কুইন্টাল মোম আহরণ করে। আর মধু থেকে ৫ লাখ ৫৬ হাজার ৮৭৫ টাকা ও মোম থেকে ২ লাখ ২৯ হাজার ৬০০ টাকা রাজস্ব আসে।
সুন্দরবন পশ্চিম বন-বিভাগের বিভাগীয় বন-কর্মকর্তা ড. আবু নাসের মোহসিন হোসেন জানান, আগে মৌয়ালদের পাশ-পারমিট দেওয়া হতো। কিন্তু কিছু মৌয়াল পাশ-পারমিট না নিয়ে অবৈধভাবে আগেই বনে ঢুকে মধু আহরণ শুরু করে। ফলে পাশ-পারমিট নিয়ে বনে যাওয়া মৌয়ালরা তাদের কাঙ্ক্ষিত মধু আহরণ করতে পারেন না। বনের মৌচাকগুলোতে ১৫ মার্চ থেকেই মধু পাওয়া যায়। সে কারণে এ বছর ১৫ মার্চ থেকে মধু সংগ্রহের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
খুলনা সার্কেলের বনসংরক্ষক মিহির কুমার দো বলেন, “গত বছর সুন্দরবন থেকে মৌয়ালরা ৪ লাখ ৪৬ হাজার ৩১৫ কেজি মধু ও ১ লাখ ৩৩ হাজার ৯০৫ কেজি মোম আহরণ করেছিলেন। এ বছর এর পরিমাণ আরও বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে।”



