গাজীপুরের বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব সাফারী পার্কে গত জানুয়ারি মাসে ২৭ দিনের ব্যবধানে ১১টি জেব্রা মৃত্যুর ঘটনায় তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন অনুযায়ী দায়ীদের বিরুদ্ধে ফৌজদারী মামলা দায়েরের সিদ্ধান্ত নিয়েছে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু মন্ত্রণালয়। একইসঙ্গে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থাগ্রহণের জন্য বিভাগীয় মামলাও দায়ের করা হবে। এছাড়াও পার্কে প্রাণী মৃত্যুর ঘটনায় মন্ত্রণালয়ের গঠিত তদন্ত কমিটির সুপারিশে স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদী ২৪টি সুপারিশ পর্যায়ক্রমে বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
মঙ্গলবার (২২ ফেব্রুয়ারি) পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী শাহাব উদ্দিনের সভাপতিত্বে মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে অনুষ্ঠিত তদন্ত প্রতিবেদন পর্যালোচনা সভায় এ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। ওইদিনই রাতে পরিবেশ, বন ও জলবায় পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র তথ্য অফিসার, দীপংকর বর এসব তথ্য জানিয়েছেন।
তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ঘাসে অতিরিক্ত নাইট্রেটের প্রভাব ও মিশ্র ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণে সকল জেব্রার মৃত্যু ঘটেছে। এরমধ্যে প্রথম দিকের অর্থাৎ ২ ও ৩ জানুয়ারি তিনটি জেব্রার মৃত্যু ধামাচাপা দেওয়া এবং আঘাতে মারা গেছে তারা, এরকম দেখাতে জেব্রাগুলোর পেটে ধারালো কিছু দিয়ে কাটা হয়। এটিও উঠে এসেছে ওই প্রতিবেদনে। তবে কে বা কারা মৃত তিনটি জেব্রার পেট কেটেছে তা বের করতে আরও তদন্ত প্রয়োজন বলে জানায় ওই কমিটি।
প্রসঙ্গত, নাইট্রেট হলো, নাইট্রিক এসিডের অনুবন্ধী ক্ষারক, যা সাধারণত সার এবং বিস্ফোরকের উপাদান হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
প্রতিবেদনে আরও উঠে এসেছে, জেব্রাগুলোর মৃত্যুর পর জরুরিভিত্তিতে মেডিক্যাল বোর্ডের সভা আহ্বান করা হয়নি। এমনকি কোন প্রাণীর অস্বাভাবিক মৃত্যুর ঘটনায় জিডি করার প্রচলন থাকলেও কোনো জিডি করা হয়নি।
গত ২২ জানুয়ারি পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের সচিব সাফারি পার্ক পরিদর্শন করেন। এরমধ্যে ৮টি জেব্রা মারা গেলেও প্রকল্প পরিচালক, ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা, ভেটেরিনারি কর্মকর্তা বা কর্মরত অন্য কেউ জেব্রার মৃত্যুর ঘটনাটি সচিবকে জানানো হয়নি।
এছাড়াও, গাজীপুরের বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব সাফারী পার্কের প্রাণী মৃত্যুরোধ ও ব্যবস্থাপনা উন্নয়নের জন্য করণীয় বিষয়ে তদন্ত কমিটির সুপারিশে ১১টি স্বল্পমেয়াদী, ৪টি মধ্যমেয়াদী এবং ৯টি দীর্ঘমেয়াদী সুপারিশ পর্যায়ক্রমে বাস্তবায়নের সিদ্ধান্তগ্রহণ করেছে মন্ত্রণালয়।
গত ২ জানুয়ারি থেকে ২৮ জানুয়ারি পর্যন্ত গাজীপুরে শ্রীপুরের বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব সাফারী পার্কে ২৭ দিনের ব্যবধানে এ পার্কের ১১টি জেব্রা, একটি বাঘ ও একটি সিংহী মারা যায়। পার্ক প্রতিষ্ঠার পর এ বছরই সবচেয়ে বেশি প্রাণীর মৃত্যুর এ ঘটনা ঘটেছে। জেব্রা মৃত্যুর প্রকৃত কারণ উদঘাটন এবং দায়িত্বে অবহেলাকারীদের শনাক্তকরণের লক্ষ্যে গত ২৬ জানুয়ারি গঠন করা হয় পরিবেশ, বন ও জলবায়ু মন্ত্রণালয়ের পাঁচ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি।
এ কমিটিতে মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব সঞ্জয় কুমার ভৌমিককে আহ্বায়ক এবং এবং পরিবেশ-২ শাখার উপসচিব মোহাম্মদ আব্দুল ওয়াদুদ চৌধুরীকে সদস্য-সচিব করা হয়।
তদন্ত কমিটির অন্য সদস্যরা হলেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান ড. মোহাম্মদ মনিরুল হাসান খান, বন্য প্রাণী ও প্রকৃতি সংরক্ষণ অঞ্চল, বন ভবন, ঢাকার বন সংরক্ষক এবং কেন্দ্রীয় পশু হাসপাতালের প্রাক্তন চিফ ভেটেরিনারি কর্মকর্তা ডা. এ বি এম শহীদুল্লাহ, কেন্দ্রীয় রোগ নির্ণয় ল্যাবে (সিডিআইএল) কর্মরত মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মো. আজম চৌধুরী, ময়মনসিংহের বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্যাথলজি ল্যাব প্রধান অধ্যাপক নুর আলী হাদী খান এবং জেলা প্রশাসকের প্রতিনিধি অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (শিক্ষা ও আইসটি) অঞ্জন কুমার সরকার।
আট সদস্যের তদন্ত কমিটি এবং তিন সদস্যের সহায়ক প্রতিনিধিগণের সমন্বয়ে একাধিকবার সরেজমিনে গিয়ে তদন্ত করেন। এসময় তারা সংশ্লিষ্টদের সাক্ষ্যগ্রহণ করেন। সর্বশেষ ১৯ ফেব্রুয়ারি ঢাকায় তদন্ত কমিটির সভা অনুষ্ঠিত হয়। তদন্তের স্বার্থে কমিটি বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্যাথলজি বিভাগ ও ফার্মাকোলজি বিভাগ, ঢাকার কেন্দ্রীয় রোগ অনুসন্ধান গবেষনাগার (সিডিআইএল), মহাখালীসহ রোগতত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনিষ্টিউিট (আইইডিসিআর), বাংলাদেশ পুলিশের সিআইডি’র কেমিক্যাল ল্যাব এবং খামার বাড়ির মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউটে (এসআরডিআই) রাসায়নিক পরীক্ষা সম্পন্ন করে। সার্বিক তদন্ত শেষে তদন্ত কমিটি নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই ২০ ফেব্রুয়ারি তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেয়।



